চট্টগ্রামে সিমেন্টের জাতীয় সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে বেড়েছে পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা। কর্ণফুলী নদীর তীরে এস আলম গ্রুপের সিমেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নির্মাণসামগ্রীর অন্যতম প্রধান উপকরণটির জন্য এখন দূরবর্তী উৎপাদনকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এতে প্রতি বস্তা সিমেন্টে বাড়তি ১৫ থেকে ২০ টাকা পরিবহন ব্যয় যুক্ত হচ্ছে। বড় নির্মাণ প্রকল্পের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণেও এর প্রভাব পড়ছে।
চট্টগ্রামের খুশি ও নাসিরাবাদ এলাকায় তিনটি আবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ পরিচালনা করছেন ফারহান আহমেদ। তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে সিমেন্ট সরবরাহের সময় নির্ধারণ। আগে নির্মাণকাজের জন্য দুই দিন আগে সিমেন্টের অর্ডার দিলেই চলত। এখন সাত থেকে ১০ দিন আগেই অর্ডার দিতে হচ্ছে। ফারহান বলেন, ‘আগে দুই দিন আগে অর্ডার দিলেই হতো। এখন সাত দিন, কখনো কখনো ১০ দিন আগে অর্ডার দিতে হয়। সময়মতো সিমেন্ট না এলে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ পিছিয়ে যায়। তখন ৪০ জন শ্রমিক বসে থাকেন।’
কর্ণফুলীর কারখানা বন্ধ হওয়ায় বিপাকে চট্টগ্রামের নির্মাণ খাত

চট্টগ্রামের নির্মাণ খাতে এই পরিস্থিতির পেছনে বড় কারণ কর্ণফালী নদীর দক্ষিণ তীরে চারপাথরঘাটায় অবস্থিত এস আলম গ্রুপের সিমেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। গত ১ আগস্ট কারখানাটি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি গ্রুপটির আরও ১০টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
২০০০ সালে প্রায় ১৩ কোটি ডলার নিজস্ব বিনিয়োগে কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করেছিল এস আলম গ্রুপ। জার্মান প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়ে নির্মিত কারখানাটিতে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ টন পোর্টল্যান্ড কম্পোজিট সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল। পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় কারখানাটিতে কর্মরত ছিলেন ১ হাজার ৫০০-এর বেশি শ্রমিক ও কর্মচারী। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন আশপাশের এলাকার বাসিন্দা।
কোম্পানির দাবি, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ব্যাংকিং কার্যক্রমে বিধিনিষেধের কারণে কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছিল না তারা। গুদামে থাকা কাঁচামাল দিয়ে কারখানাগুলো চালু রাখা এবং শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ অব্যাহত রাখলেও একপর্যায়ে মজুত শেষ হয়ে যায়। এতে ১১টি কারখানার প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্ধ হয়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ কোটি টাকার মজুরি প্রবাহ।
সিমেন্ট শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ অনেকাংশে পরিবহনব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। ক্লিংকারসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সুবিধার জন্য দেশের অধিকাংশ সিমেন্ট কারখানা বন্দর ও নদীবন্দরসংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে। ফলে কোনো অঞ্চলের কাছাকাছি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প উৎস থেকে সিমেন্ট সরবরাহ করতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ থেকে গত ২০ বছর ধরে ঠিকাদারদের কাছে নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করছেন মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এখন সিমেন্ট আসছে নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল থেকে, মোংলা থেকে, কখনো আরও দূরের এলাকা থেকে। প্রতিটি চালানের সঙ্গে পরিবহন সময় বাড়ছে। ট্রাকভাড়া, ডিজেল ও চালকের রাতযাপনের খরচ শেষ পর্যন্ত সিমেন্টের দামের ওপর যুক্ত হচ্ছে।’
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, দূরবর্তী অঞ্চল থেকে সিমেন্ট পরিবহনে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ টাকা খরচ হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রামের বাজারে প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম ৪৭০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাবে আমদানি করা ক্লিংকার, স্ল্যাগ ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছিল। আগ্রাবাদ ও বহদ্দারহাটের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগস্টের পর চট্টগ্রামে সিমেন্টের সরবরাহমূল্য জাতীয় বাজারের নিম্নসীমা থেকে উচ্চসীমার দিকে চলে গেছে।
প্রতি বস্তায় ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়তি ব্যয়কে আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও বড় আবাসন প্রকল্পে এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। একটি ১০ তলা ভবন নির্মাণে কয়েক দশ হাজার বস্তা সিমেন্ট প্রয়োজন হয়। ফলে শুধু পরিবহন ব্যয়ের কারণে একটি ভবনেই কয়েক লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
ফারহান আক্তার বলেন, ‘একটি ১০ তলা ভবনে কয়েক দশ হাজার বস্তা সিমেন্ট লাগে। প্রতি বস্তায় ২০ টাকা বাড়তি খরচ হলে একটি ভবনেই কয়েক লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এর সঙ্গে নির্মাণকাজ পিছিয়ে যাওয়ার খরচও রয়েছে। চট্টগ্রামে ফ্ল্যাটের দাম ইতিমধ্যে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার সীমায় পৌঁছেছে। ফলে বাড়তি ব্যয় নির্মাতাদের মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যথায় নির্মাণের ফিনিশিং ও মানের ওপর প্রভাব পড়ছে।’
ছোট নির্মাতাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের মোট সিমেন্টের প্রায় ৬০ শতাংশ কেনেন ব্যক্তিগতভাবে বাড়ি নির্মাণকারী গ্রাহকেরা। তাঁদের অনেকেই সীমিত সঞ্চয় ও ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে বাড়ি নির্মাণ করেন।
কারখানা বন্ধের সময়টি সিমেন্টশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। টানা তিন বছর বিক্রি কমার পর ২০২৫ সালে দেশে সিমেন্টের ব্যবহার প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদনকারীদের সংগঠন আগামী বছরগুলোতে বছরে ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে চাহিদা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে।
দেশে বর্তমানে ৪১টি সিমেন্ট কারখানার সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৮ কোটি ৬০ লাখ টন। ফলে জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি নেই। কিন্তু দেশের অন্য অঞ্চলে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই চট্টগ্রামের বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
চট্টগ্রামের কোনো নির্মাণ প্রকল্পে বৃহস্পতিবার সকালে ৪০০ বস্তা সিমেন্ট প্রয়োজন হলে মুন্সীগঞ্জের কারখানার অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা সেই চাহিদা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করতে পারে না। দূরত্ব, পরিবহন সময় ও ব্যয় এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের সিমেন্ট কারখানাগুলোর অধিকাংশই সরাসরি ক্লিংকার উৎপাদন করে না। বিদেশ থেকে ক্লিংকার আমদানি করে তা গুঁড়া করে সিমেন্ট তৈরি করা হয়। ফলে এই শিল্পের উৎপাদন কার্যক্রম অনেকাংশে আমদানি ও ব্যাংকিং সুবিধার ওপর নির্ভরশীল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ৯২ লাখ টন ক্লিংকার আমদানি হয়েছে। কয়লার পরিমাণের দিক থেকে এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানি পণ্য। একই সময়ে ৮৩ লাখ টন স্ল্যাগ, প্রায় ৬০ লাখ টন চুনাপাথর এবং প্রায় ৫০ লাখ টন ফ্লাই অ্যাশ আমদানি করা হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামালের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আমদানি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র ও বাণিজ্যিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
আঞ্চলিক সিমেন্ট প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করা প্রকৌশলী শফিকুর রহমানের মতে, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাটি পুনরায় চালু করা খুব জটিল হওয়ার কথা নয়। তিনি বলেন, ‘এটি ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা একটি সিমেন্ট গ্রাইন্ডিং মিল। এর পাশেই বড় বাজার এবং মাত্র এক কিলোমিটার দূরে বন্দর। ক্লিংকার পৌঁছালে সিমেন্ট উৎপাদন হবে, আর উৎপাদিত সিমেন্ট বাজারে চলে যাবে। কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কারখানাটি চালু করা সম্ভব।’
Source - www.bd24live.com ↗