Bangladesh · 2026-11-03 16:16:50

গবেষণা হতে হবে দেশীয় উদ্ভাবনের হাতিয়ার: রুয়েট উপ-উপাচার্য

গবেষণা হতে হবে দেশীয় উদ্ভাবনের হাতিয়ার: রুয়েট উপ-উপাচার্য
দীর্ঘ এক যুগ পর রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) পদে নিয়োগ পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন। গত ২৭ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চার বছরের জন্য তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বর্তমানে তিনি পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষা, গবেষণা, আবাসন, অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অগ্রগতি নিয়ে নিজের ভাবনা, পরিকল্পনা ও সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে। গবেষণার ক্ষেত্রে রুয়েটের প্রধান লক্ষ্য পরিমাণ নয়, বরং গুণগত মান নিশ্চিত করা বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দেশীয় প্রযুক্তি, নিজস্ব জ্ঞান ও দক্ষতার মাধ্যমে সেগুলোর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ নয়, বাস্তব প্রয়োগ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম গবেষণায় মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে রুয়েটে ইনকিউবেশন হাব গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ধারণা ও উদ্ভাবনকে পরিচর্যার মাধ্যমে কার্যকর প্রযুক্তি বা পণ্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

শিক্ষক এবং স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় সহজে গবেষণাপত্র তৈরি ও প্রকাশের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের প্রবণতা প্রকৃত গবেষণার বিকল্প হতে পারে না; বরং গভীরে গিয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবনের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

বিদেশ থেকে প্রযুক্তি আমদানির পরিবর্তে দেশে উদ্ভাবন ও উৎপাদন করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তি সহজলভ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী হবে। এতে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি জনগণও সরাসরি উপকৃত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে গবেষণার সম্পর্ক জোরদার করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগু লোর বার্ষিক মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন উপ-উপাচার্য।

তার প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলো বার্ষিক মুনাফার ন্যূনতম ১০ থেকে ২০ শতাংশ এ খাতে ব্যয় করতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সেই অর্থ গবেষণায় ব্যবহার করা যেতে পারে। সিমেন্ট, রড ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ দেশীয় পণ্যের মানোন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং সহজলভ্য করার গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এতে শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী গবেষণার বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমেও অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে। সাধারণ মানুষের কাছে কম দামে উন্নতমানের পণ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশকে শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ভোক্তা নয়, উদ্ভাবক ও উৎপাদক হিসেবেও গড়ে তুলতে গবেষণায় বিনিয়োগ এবং শিল্প-একাডেমিয়া সম্পর্ক বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে রুয়েটে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট কোর্স চালু রয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক আখতার হোসেন বলেন, এ কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়।

এতে উৎপাদন প্রক্রিয়া, কারখানার কার্যক্রম ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে আগ্রহ এবং পণ্য ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। তার মতে, ১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনও কার্যকর ধারণা বা উদ্ভাবন নিয়ে এগিয়ে এলে সেটি বড় অর্জন। সব উদ্যোগ একসঙ্গে সফল না হলেও সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলো জাতীয় পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

শুধু চাকরির ওপর নির্ভর না করে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। একজন উদ্যোক্তা নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আরও পাঁচ বা দশজনের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। এতে বেকারত্ব কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থানে সরকারের ওপর নির্ভরশীলতাও হ্রাস পাবে। এদিকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত মেধাবীদের দেশে ফেরাতে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধার প্রত্যাবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

অধ্যাপক আখতার হোসেন বলেন, দেশের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে টেসলা, নাসা ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন; অনেকে পিএইচডি ও উচ্চতর গবেষণায়ও ভালো করছেন। বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও প্রযুক্তি দেশের কাজে লাগানোই হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও অনুকূল পরিবেশের অভাবে অনেকে দেশে ফিরতে আগ্রহী হন না।

গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগের পাশাপাশি চাকরির নিশ্চয়তা, উপযুক্ত বেতন, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব সুযোগ সমন্বিতভাবে তৈরি করা গেলে মেধাবীরা দেশে ফিরে কাজ করতে আগ্রহী হবেন। রুয়েট সহ দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট রয়েছে। উপ-উপাচার্য বলেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা ও বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় চাইলেই ইচ্ছামতো শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে না। কোন বিভাগে কতজন শিক্ষক প্রয়োজন এবং শিক্ষকস্বল্পতায় কী কী একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, তা তুলে ধরে ইউজিসির সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর নেগোসিয়েশন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিবছর ইউজিসির দেওয়া সুযোগ ও বরাদ্দের মধ্যে থেকে শিক্ষক নিয়োগের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।

পরীক্ষার ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং শিক্ষার্থীদের দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন অধ্যাপক আখতার হোসেন। পুরকৌশল বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের ব্যাকলগ পরীক্ষা ও ২৫ সিরিজের ফল প্রকাশে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চাকরির আবেদনের বিষয়টি বিবেচনায় ছুটির আগেই উত্তরপত্র যাচাইয়ের কাজ শেষ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে পাঁচ থেকে ছয় সাইকেলের মধ্যে ফল প্রকাশের প্রত্যাশা তার। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সহযোগিতা অপরিহার্য। বিভাগীয় প্রধান তাগাদা দিতে পারলেও উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও নম্বর জমা দেওয়ার দায়িত্ব পরীক্ষক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদেরও পালন করতে হবে। কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলে শিক্ষার্থীদের তিন বছর আট মাসের মধ্যে স্নাতক সম্পন্ন করানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এতে শিক্ষার্থীরা দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশ, অভিজ্ঞতা অর্জন এবং চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বেশি সুযোগ পাবেন। পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোডিং পদ্ধতির প্রতি শতভাগ সমর্থন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনিক দায়িত্বে না থাকাকালীনও এ পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন। চাকরিজীবনের শুরু থেকেই তিনি শিক্ষার্থীদের রোল নম্বর না দেখে উত্তরপত্র মূল্যায়নের চেষ্টা করেন।

খাতা হাতে পাওয়ার পর প্রথমে রোল নম্বরের পৃষ্ঠা উল্টে রেখে উত্তর মূল্যায়ন করেন এবং সব উত্তর দেখা ও নম্বর দেওয়ার পর নম্বরপত্রে ফলাফল তোলার সময় রোল নম্বর দেখেন। এমনকি মূল্যায়নের আগে রোল নম্বর অনুযায়ী খাতা সাজান না। তার মতে, কোডিং পদ্ধতি চালু হলে মূল্যায়নে আরও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এ পদ্ধতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতেও তিনি প্রস্তুত।

ছাত্ররাজনীতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ছাত্ররাজনীতি একটি মৌলিক অধিকার। তবে প্রশ্ন হলো, তা কোথায় ও কীভাবে পরিচালিত হবে। রুয়েটে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রয়েছে। তার মতে, প্রকাশ্যে রাজনীতির সুযোগ না থাকলে গোপনে তা গড়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। গোপন রাজনীতিতে জবাবদিহির সুযোগ তুলনামূলক কম।

অতীতে হল ও ডাইনিং দখল এবং র‍্যাগিংয়ের ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ছাত্ররাজনীতি মানে লেজুড়বৃত্তি, ক্ষমতা প্রদর্শন, হল-ডাইনিং দখল বা চাঁদাবাজি নয়; বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সমস্যা নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য সীমিত পরিসরে ছাত্ররাজনীতি প্রয়োজন মনে করলে প্রশাসন বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তবে রাজনীতি চালু হবে কি না, হলে কতটুকু পরিসরে হবে এবং এর সীমারেখা কী হবে, তা শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও মতামতের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। আবাসন সুবিধার ক্ষেত্রে রুয়েট দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে বলে জানান উপ-উপাচার্য।

নারী শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন নিশ্চিত হয়েছে এবং মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা আসন পাচ্ছেন। বর্তমানে আনুমানিক ৭০-৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধার আওতায় রয়েছেন। নতুন চারটি ১০ তলা আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়েছে। এ ধরনের আরও দুই থেকে তিনটি হল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণে আগ্রহী তিনি। বাকি শিক্ষার্থীদের জন্যও আবাসন নিশ্চিত করা গেলে রুয়েটকে শতভাগ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় বলা সম্ভব হবে।

কেউ ব্যক্তিগত কারণে হলে থাকতে না চাইলে সেটি ভিন্ন বিষয়; তবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য আবাসনের সুযোগ তৈরি করা ইতিবাচক অর্জন হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সহযোগিতা আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনা ও নেগোসিয়েশন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। একাডেমিক কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে শেষ করার বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি দিনও অতিরিক্ত অবস্থান না করেন, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা।

সম্প্রতি ২২ সিরিজের শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট শীতকালীন ছুটিতে আয়োজনের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে এবং সভায় আলোচনার পর তা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের খেয়ালখুশি মতো ক্লাস বন্ধ রাখার সমালোচনা করেন তিনি। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ডিন কিংবা বিভাগীয় প্রধান কারও এককভাবে ইচ্ছামতো ছুটি দেওয়ার এখতিয়ার নেই; এ জন্য একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন।

নিয়মের বাইরে ক্লাস বন্ধ রাখলে একাডেমিক শৃঙ্খলা ব্যাহত হয় এবং ব্যাচের কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও পারিবারিক বাস্তবতা বিবেচনার কথাও বলেন তিনি। অনেক শিক্ষার্থী টিউশনি করে নিজের খরচ চালান, আবার কারও পরিবার ঋণ করে পড়াশোনার ব্যয় বহন করে। অতিরিক্ত কয়েক দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা তাঁদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

তাই শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই একাডেমিক কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে, সম্ভব হলে তার আগেই শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশ্ববাজার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রুয়েটে আউটকাম বেইজড এডুকেশন (ওবিই) পদ্ধতি অনুসরণ করে পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা হচ্ছে। অধ্যাপক আখতার হোসেন বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের দক্ষতাসম্পন্ন প্রকৌশলী চায় এবং শ্রমবাজারে কোন বিষয়গুলোর চাহিদা বাড়ছে, তা বিবেচনায় নিয়ে কোর্স ও কারিকুলাম পরিমার্জন করা হচ্ছে।

স্নাতক শেষে শিক্ষার্থীরা যেন বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, সেটিই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। সব ক্ষেত্রে শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে পাঠ্যক্রম উন্নয়নের কাজ অব্যাহত থাকবে। ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনে শিক্ষার্থীদের সচেতন ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন উপ-উপাচার্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অংশীজন হিসেবে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও শিক্ষাবান্ধব রাখতে দায়িত্বশীল হতে হবে। পানির বোতল, কলম, টিস্যুসহ ব্যবহৃত সামগ্রী নির্ধারিত স্থানে ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়; রুয়েটে জনবল সংকটও রয়েছে। একজন কর্মীকে অনেকগুলো শ্রেণিকক্ষ ও শৌচাগার পরিষ্কারের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

বর্তমানে নির্মাণকাজ চলায় কিছু সমস্যা থাকলেও কাজ শেষ হলে সড়কগুলো সাজানো, প্রয়োজনীয় স্থানে গাছ লাগানো ও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা রয়েছে। ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে বাইরের মানুষও যেন রুয়েটের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন, সেটিই প্রত্যাশা। প্রকৌশলীদের আইনগত ও ন্যায্য অধিকার এবং পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় কাজ করার আগ্রহের কথাও জানান অধ্যাপক আখতার হোসেন।

আসন্ন আইইবি নির্বাচনে তার স্লোগান, “প্রোটেক্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স রাইট, কমিটেড টু সার্ভ”। প্রকৌশলী অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের বিভিন্ন দাবি ও কর্মসূচি নির্ধারণে পরামর্শ দিয়েছেন এবং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবির পরামর্শক হিসেবে শাহবাগের আন্দোলনেও কাজ করেছেন বলে জানান। ডিপ্লোমা ও বিএসসি প্রকৌশলীদের পেশাগত অবস্থান ও পদোন্নতির কাঠামো প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, কোনো পেশার প্রতিই অবজ্ঞা নেই; তবে দায়িত্বের পরিধি, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক কাঠামো আলাদা হওয়া প্রয়োজন, যাতে দ্বন্দ্ব তৈরি না হয়।

তিনি জানান, ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুই ধারার প্রকৌশলীদের জন্য আলাদা কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও যুক্তিসঙ্গত কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশগুলোর উদাহরণ টেনে তিনি উভয় ধারার প্রকৌশলীদের জন্য প্রশাসনিক কাঠামো আলাদা করার প্রস্তাব দেন।

বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা ও কাজ করার আগ্রহও রয়েছে তার। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এবং নতুন প্রজন্মের আচরণ নিয়েও নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন উপ-উপাচার্য। তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন পর্যন্ত ঐতিহাসিক সংগ্রামগুলোতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ব্যর্থ হয়নি। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সমর্থনে কয়েকজন শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে রুয়েট শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেন তিনি।

নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তি ব্যবহারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে। তবে ২০২৪ সালের পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে সহনশীলতা হ্রাস, আক্রমণাত্মক আচরণ ও অশালীন ভাষার প্রবণতা বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের আরও শালীন ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করেন তিনি। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন, তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নির্দিষ্ট সীমারেখাও বজায় রাখতে হবে।

মানবিকতা, সহনশীলতা, শালীনতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা সাধারণত ৫-৬ ঘণ্টা অবস্থান করেন; বাকি সময় বন্ধুদের সঙ্গে, হলে কিংবা মেসে কাটান। তাই শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, শিক্ষার্থীদের আবাসিক ও সামাজিক পরিবেশও ভালো রাখা জরুরি। সন্তানদের বন্ধু নির্বাচন, চলাফেরা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজখবর রাখার পাশাপাশি তাদের নিজের ভালো-মন্দ বিচার করার মতো করে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

আগামী প্রজন্মের কাছে দায়িত্বশীলতা, শালীনতা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রত্যাশা করেন অধ্যাপক আখতার হোসেন। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের সাহসিকতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও ২০২৪ সালের আন্দোলনে ভূমিকার মতো ইতিবাচক গুণ রয়েছে। আগামী দিনে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, অর্থনীতি ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রা তাদের হাত ধরেই এগোবে। তাই জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অর্জন জরুরি।

সাহসিকতা ও ইতিবাচক উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হবে, তবে সাহস যেন কখনো দুঃসাহসিকতায় পরিণত না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে উন্নত, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

The post গবেষণা হতে হবে দেশীয় উদ্ভাবনের হাতিয়ার: রুয়েট উপ-উপাচার্য appeared first on Bangladesh Diplomat | বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাট.

Source - bangladeshdiplomat.com ↗