যুক্তরাষ্ট্রের পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী সংবাদমাধ্যম ইনসাইড ক্লাইমেট নিউজ-এ এ বছর ইন্টার্নশিপের জন্য দুটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম। আমার প্রথম সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ সম্পাদক মাইকেল কোডাস। তিনি পুলিৎজার জয়ী সাংবাদিক দলের সদস্য। দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ইনসাইড ক্লাইমেট নিউজ এর নির্বাহী সম্পাদক ভার্নন লোয়েব।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, দ্য ফিলাডেলফিয়া ইনকোয়ারার ও হিউস্টন ক্রনিকল-এ দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা ও সম্পাদক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। কাজ করেছেন দ্য আটলান্টিকেও।
সাক্ষাৎকারের সময় আমি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানায় পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিকতা নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছিলাম। আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি সংবাদমাধ্যমে কাজের সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড কিংবা কলম্বিয়ার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে নিজের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করছিলাম। আমার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার বড় অংশই যে বাংলাদেশের একটি বাংলা সংবাদপত্র।
বাংলাদেশের সংবাদপত্র, বিশ্বজুড়ে যার প্রতিধ্বনি

স্বাধীন সাংবাদিকতায় অবিচল থাকবে প্রথম আলোযখন যারা ক্ষমতাবান, তাদের কাছে অপছন্দ প্রথম আলোসাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হয়। বাংলাদেশের একটি জাতীয় সংবাদপত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক, সেটিও ছিল আলোচনার বিষয়। আমি তাঁদের প্রথম আলোর কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদপত্রগুলোর একটি প্রথম আলো। তবে এটি শুধু একটি জাতীয় বাংলা দৈনিক নয়। এর সাংবাদিকতা, সামাজিক উদ্যোগ এবং সম্পাদক মতিউর রহমানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে।
এরপর বলেছিলাম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রথম আলোর উপস্থিতির কথা। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, বার্তা সংস্থা রয়টার্স, যুক্তরাজ্যের বিবিসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি নিউজ এর মতো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এসব আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের আলোচনায় প্রথম আলোর প্রকাশিত তথ্য, এর সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর আক্রমণের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এমন সহযোগিতা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখানে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শুধু তথ্যের স্থানীয় উৎস হিসেবে কাজ করেনি, আন্তর্জাতিক একটি অনুসন্ধানে সক্রিয় অংশীদার হয়েছে।বাংলাদেশের একটি বাংলা সংবাদপত্র কীভাবে বিশ্বের বড় সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় জায়গা করে নিতে পারে, সেটিই তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। উদাহরণ হিসেবে বলেছিলাম প্রথম আলোর অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তারের কথা।
২০২১ সালের ১৭ মে তাঁকে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়। ২০২৩ সালে প্রথম আলোর সাভার প্রতিনিধি শামসুজ্জামান শামসকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
আমি প্রথম আলোর আন্তর্জাতিক যৌথ অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছিলাম। বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্র শুধু বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশ করে না, বরং আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানের জন্য নিজস্ব তথ্য, উৎস ও সাংবাদিকতার দক্ষতা দিয়েও অবদান রাখতে পারে।
সাক্ষাৎকারের পর আমি ইনসাইড ক্লাইমেট নিউজ ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাই। সেখানে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ হয়েছে। নিয়োগের পেছনে কোন অভিজ্ঞতাটি কতটা ভূমিকা রেখেছে, সেটি নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রথম আলোর পরিচয় ও কাজের গুরুত্ব তুলে ধরতে পেরেছিলাম, সেটি আমার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
দণ্ডবিধি ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামপ্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এসে সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়েছে। ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলোর যাত্রা শুরু। এরপর প্রায় তিন দশকে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের জগতে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
সংবাদ পড়ার ধরন বদলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার ঘটেছে, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব বেড়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রথম আলো দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদপত্র হিসেবে অবস্থান তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের গণমাধ্যমবিষয়ক জনমত জরিপ অনুযায়ী, দেশের সংবাদপত্র পাঠকদের ৫৭ শতাংশের বেশি প্রথম আলো পড়েন। জরিপে ৬১টি জেলায় এটি সবচেয়ে অধিক পঠিত সংবাদপত্র হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে একটি সংবাদপত্রের প্রভাব কেবল পাঠকসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। এর সাংবাদিকতা কতটা জনস্বার্থ রক্ষা করেছে, ক্ষমতাকে কতটা জবাবদিহির মুখে ফেলেছে, আন্তর্জাতিক পরিসরে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে এবং সংকটের সময় পাঠকের কাছে কতটা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
বাংলাদেশের নিজস্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক কেন প্রয়োজনশেখ হাসিনার আমলে সাংবাদিকতা ও প্রথম আলোপ্রথম আলোর আন্তর্জাতিক উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সহযোগিতা। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য টাইমস এর সঙ্গে যৌথভাবে ব্রিটিশ রাজনীতিক টিউলিপ সিদ্দিকের বাংলাদেশি নাগরিকত্বসংক্রান্ত নথি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো।
এতে তাঁর বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার নিবন্ধন এবং পাসপোর্টসংক্রান্ত তথ্য উঠে আসে। টিউলিপ সিদ্দিক অবশ্য সংশ্লিষ্ট অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং নথির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এমন সহযোগিতা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখানে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শুধু তথ্যের স্থানীয় উৎস হিসেবে কাজ করেনি, আন্তর্জাতিক একটি অনুসন্ধানে সক্রিয় অংশীদার হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রথম আলোর তথ্যের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম আলোর প্রকাশিত হতাহতের তথ্য উদ্ধৃত করেছিল।
ওই সময় বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের আন্দোলন, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর মাঠপর্যায়ের তথ্য আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথম আলো নিয়ে দ্য ডিসেন্টের লেখার একটি সমালোচনামূলক পাঠপ্রসঙ্গ প্রথম আলো: মারদিয়া মমতাজের প্রতিক্রিয়া ও লেখকের বক্তব্যএটি কেবল প্রথম আলোর জন্য নয়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব প্রতিবেদক থাকলেও স্থানীয় সাংবাদিকদের সংগ্রহ করা তথ্য অনেক সময় আন্তর্জাতিক সংবাদ তৈরির ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও প্রথম আলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল নিউজ মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের (ইনমা) গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে তিনটি পুরস্কার পায় প্রথম আলো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘বেস্ট ইন সাউথ এশিয়া’ স্বীকৃতি। পাঠকের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগের জন্যও প্রথম পুরস্কার অর্জন করে পত্রিকাটি।
একই বছরের অক্টোবরে জার্মানির মিউনিখে ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজ পাবলিশার্স বা ওয়ান-ইফরার আয়োজনে দুটি বিভাগে সর্বোচ্চ পুরস্কার পায় প্রথম আলো। তরুণ পাঠকদের সম্পৃক্ত করা এবং রাজধানীর বাইরের পাঠক ও স্থানীয় বাজারকে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগের জন্য এসব স্বীকৃতি আসে।
এ ধরনের আন্তর্জাতিক পুরস্কারের গুরুত্ব শুধু একটি সংবাদপত্রের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের একটি বাংলা সংবাদপত্রের সাফল্য দেশের সংবাদমাধ্যম শিল্পের সক্ষমতাকেও তুলে ধরে।
সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল নিউজ মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের ‘ইনমা গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’-এ প্রথম আলো পেয়েছে ‘দক্ষিণ এশিয়ার সেরা’র পুরস্কার। ডিজিটাল সাংবাদিকতায় প্রথম আলোর উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এর নিয়মিত পাঠক। ফলে বাংলাদেশের ভেতরে প্রকাশিত একটি সংবাদ দ্রুতই বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যায়।
এই ডিজিটাল পাঠক সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। আন্দোলনের সময় মানুষ সংবাদপত্র ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিনিয়ত খবর খুঁজছিলেন। প্রথম আলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের ৩৬ দিনে এর ওয়েবসাইটে ৩১ কোটি পেজভিউ হয়। আগস্ট মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ কোটিতে।
ওই সময় ওয়েবসাইটের পাঠকদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন তরুণ। ছাপা সংস্করণের প্রচারও প্রায় দেড় লাখ কপি বেড়েছিল বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। সংকটের সময় বিপুল পাঠকের এই উপস্থিতি সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার একটি দিক তুলে ধরে। তবে বিপুল পাঠকসংখ্যা আর নিঃশঙ্ক আস্থা এক বিষয় নয়।
সন্ত্রাসী হামলার পর প্রথম আলো ভবনের দোতলা ও তিনতলায় ভাঙচুর–লুটপাট। প্রথম আলো সময় ও সমাজের দায় কতটুকু পূরণ করতে পারল২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একই রাতে হামলার শিকার হয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারও। ভবনে আটকা পড়েন সংবাদকর্মীরা। পরদিন প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণ প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এই হামলার খবরও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।
রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে আগুনে আটকা পড়া সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা, সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কথা।
এখানে একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে। যে সংবাদপত্র আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়ে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছে, সেই সংবাদপত্রের কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনাও বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে আলোচনায় এনেছে। একটি ঘটনা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অর্জনের পরিচয় দেয়। অন্যটি সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তাহীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট তুলে ধরে।
প্রথম আলো কেন বারবার আক্রোশের শিকারপ্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা এবং পুরোনো রাজনীতির নতুন পোশাকপ্রথম আলোকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নানা মত রয়েছে। কেউ এর সাংবাদিকতার প্রশংসা করেন, কেউ সমালোচনা করেন। সংবাদপত্রটির সম্পাদকীয় অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু মতভিন্নতার কারণে সাংবাদিকদের ভয় দেখানো, গ্রেপ্তার করা কিংবা সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব জনস্বার্থে সত্য প্রকাশ করা। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য যেমন স্বাধীনতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পাঠকের কাছে জবাবদিহি। প্রথম আলোর মতো বড় সংবাদপত্রের জন্য দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলোর সম্পাদক আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত হয়েছেন। সংবাদপত্রটি বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যৌথ অনুসন্ধান করেছে। এর তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদে ব্যবহৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে। আবার এর সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার এবং কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে বিষয়টি নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে। আমি বুঝেছি, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শুধু বাংলাদেশের পাঠকদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা তথ্য, অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতাও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় মূল্যবান হতে পারে।
বাক্স্বাধীনতা, প্রথম আলো ও আমাদের গণতন্ত্রপ্রথম আলো, সমাজ ও রাজনীতিপ্রায় তিন দশক আগে যাত্রা শুরু করা প্রথম আলো আজ শুধু বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের অংশ নয়। এর অর্জন, অনুসন্ধান, পাঠক এবং এর ওপর আঘাতের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি বড় বাস্তবতাকেও তুলে ধরে।
একটি সংবাদপত্রের আন্তর্জাতিক প্রভাব শুধু বিশ্বের কত দেশে তার পাঠক রয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং তার সাংবাদিকতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার তথ্য কতটা দূর পর্যন্ত পৌঁছায়, তার কাজ কতটা স্বীকৃতি পায় এবং তার স্বাধীনতা আক্রান্ত হলে কত দূর পর্যন্ত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে—সেসব দিয়েও বিচার করতে হয়।
প্রথম আলোর ২৮ বছরের পথচলা সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রথম আলো বাংলাদেশের সংবাদপত্র। কিন্তু এর সাংবাদিকতার অর্জন, প্রভাব এবং সংকটের প্রতিধ্বনি বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে পৌঁছেছে।
মোসাব্বের হোসেন সাংবাদিক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ইউনিভার্সিটি অব মন্টানা, যুক্তরাষ্ট্র
*মতামত লেখকের নিজস্ব
এরপর বলেছিলাম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রথম আলোর উপস্থিতির কথা। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, বার্তা সংস্থা রয়টার্স, যুক্তরাজ্যের বিবিসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি নিউজ এর মতো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এসব আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের আলোচনায় প্রথম আলোর প্রকাশিত তথ্য, এর সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর আক্রমণের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এমন সহযোগিতা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখানে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শুধু তথ্যের স্থানীয় উৎস হিসেবে কাজ করেনি, আন্তর্জাতিক একটি অনুসন্ধানে সক্রিয় অংশীদার হয়েছে।বাংলাদেশের একটি বাংলা সংবাদপত্র কীভাবে বিশ্বের বড় সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় জায়গা করে নিতে পারে, সেটিই তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। উদাহরণ হিসেবে বলেছিলাম প্রথম আলোর অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তারের কথা।
২০২১ সালের ১৭ মে তাঁকে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়। ২০২৩ সালে প্রথম আলোর সাভার প্রতিনিধি শামসুজ্জামান শামসকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
আমি প্রথম আলোর আন্তর্জাতিক যৌথ অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছিলাম। বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্র শুধু বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশ করে না, বরং আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানের জন্য নিজস্ব তথ্য, উৎস ও সাংবাদিকতার দক্ষতা দিয়েও অবদান রাখতে পারে।
সাক্ষাৎকারের পর আমি ইনসাইড ক্লাইমেট নিউজ ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাই। সেখানে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ হয়েছে। নিয়োগের পেছনে কোন অভিজ্ঞতাটি কতটা ভূমিকা রেখেছে, সেটি নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রথম আলোর পরিচয় ও কাজের গুরুত্ব তুলে ধরতে পেরেছিলাম, সেটি আমার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
দণ্ডবিধি ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামপ্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এসে সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়েছে। ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলোর যাত্রা শুরু। এরপর প্রায় তিন দশকে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের জগতে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
সংবাদ পড়ার ধরন বদলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার ঘটেছে, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব বেড়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রথম আলো দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদপত্র হিসেবে অবস্থান তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের গণমাধ্যমবিষয়ক জনমত জরিপ অনুযায়ী, দেশের সংবাদপত্র পাঠকদের ৫৭ শতাংশের বেশি প্রথম আলো পড়েন। জরিপে ৬১টি জেলায় এটি সবচেয়ে অধিক পঠিত সংবাদপত্র হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে একটি সংবাদপত্রের প্রভাব কেবল পাঠকসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। এর সাংবাদিকতা কতটা জনস্বার্থ রক্ষা করেছে, ক্ষমতাকে কতটা জবাবদিহির মুখে ফেলেছে, আন্তর্জাতিক পরিসরে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে এবং সংকটের সময় পাঠকের কাছে কতটা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
বাংলাদেশের নিজস্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক কেন প্রয়োজনশেখ হাসিনার আমলে সাংবাদিকতা ও প্রথম আলোপ্রথম আলোর আন্তর্জাতিক উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সহযোগিতা। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য টাইমস এর সঙ্গে যৌথভাবে ব্রিটিশ রাজনীতিক টিউলিপ সিদ্দিকের বাংলাদেশি নাগরিকত্বসংক্রান্ত নথি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো।
এতে তাঁর বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার নিবন্ধন এবং পাসপোর্টসংক্রান্ত তথ্য উঠে আসে। টিউলিপ সিদ্দিক অবশ্য সংশ্লিষ্ট অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং নথির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এমন সহযোগিতা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখানে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শুধু তথ্যের স্থানীয় উৎস হিসেবে কাজ করেনি, আন্তর্জাতিক একটি অনুসন্ধানে সক্রিয় অংশীদার হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রথম আলোর তথ্যের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম আলোর প্রকাশিত হতাহতের তথ্য উদ্ধৃত করেছিল।
ওই সময় বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের আন্দোলন, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর মাঠপর্যায়ের তথ্য আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথম আলো নিয়ে দ্য ডিসেন্টের লেখার একটি সমালোচনামূলক পাঠপ্রসঙ্গ প্রথম আলো: মারদিয়া মমতাজের প্রতিক্রিয়া ও লেখকের বক্তব্যএটি কেবল প্রথম আলোর জন্য নয়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব প্রতিবেদক থাকলেও স্থানীয় সাংবাদিকদের সংগ্রহ করা তথ্য অনেক সময় আন্তর্জাতিক সংবাদ তৈরির ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও প্রথম আলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল নিউজ মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের (ইনমা) গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে তিনটি পুরস্কার পায় প্রথম আলো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘বেস্ট ইন সাউথ এশিয়া’ স্বীকৃতি। পাঠকের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগের জন্যও প্রথম পুরস্কার অর্জন করে পত্রিকাটি।
একই বছরের অক্টোবরে জার্মানির মিউনিখে ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজ পাবলিশার্স বা ওয়ান-ইফরার আয়োজনে দুটি বিভাগে সর্বোচ্চ পুরস্কার পায় প্রথম আলো। তরুণ পাঠকদের সম্পৃক্ত করা এবং রাজধানীর বাইরের পাঠক ও স্থানীয় বাজারকে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগের জন্য এসব স্বীকৃতি আসে।
এ ধরনের আন্তর্জাতিক পুরস্কারের গুরুত্ব শুধু একটি সংবাদপত্রের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের একটি বাংলা সংবাদপত্রের সাফল্য দেশের সংবাদমাধ্যম শিল্পের সক্ষমতাকেও তুলে ধরে।
সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল নিউজ মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের ‘ইনমা গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’-এ প্রথম আলো পেয়েছে ‘দক্ষিণ এশিয়ার সেরা’র পুরস্কার। ডিজিটাল সাংবাদিকতায় প্রথম আলোর উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এর নিয়মিত পাঠক। ফলে বাংলাদেশের ভেতরে প্রকাশিত একটি সংবাদ দ্রুতই বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যায়।
এই ডিজিটাল পাঠক সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। আন্দোলনের সময় মানুষ সংবাদপত্র ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিনিয়ত খবর খুঁজছিলেন। প্রথম আলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের ৩৬ দিনে এর ওয়েবসাইটে ৩১ কোটি পেজভিউ হয়। আগস্ট মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ কোটিতে।
ওই সময় ওয়েবসাইটের পাঠকদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন তরুণ। ছাপা সংস্করণের প্রচারও প্রায় দেড় লাখ কপি বেড়েছিল বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। সংকটের সময় বিপুল পাঠকের এই উপস্থিতি সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার একটি দিক তুলে ধরে। তবে বিপুল পাঠকসংখ্যা আর নিঃশঙ্ক আস্থা এক বিষয় নয়।
সন্ত্রাসী হামলার পর প্রথম আলো ভবনের দোতলা ও তিনতলায় ভাঙচুর–লুটপাট। প্রথম আলো সময় ও সমাজের দায় কতটুকু পূরণ করতে পারল২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একই রাতে হামলার শিকার হয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারও। ভবনে আটকা পড়েন সংবাদকর্মীরা। পরদিন প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণ প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এই হামলার খবরও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।
রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে আগুনে আটকা পড়া সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা, সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কথা।
এখানে একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে। যে সংবাদপত্র আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়ে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছে, সেই সংবাদপত্রের কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনাও বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে আলোচনায় এনেছে। একটি ঘটনা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অর্জনের পরিচয় দেয়। অন্যটি সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তাহীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট তুলে ধরে।
প্রথম আলো কেন বারবার আক্রোশের শিকারপ্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা এবং পুরোনো রাজনীতির নতুন পোশাকপ্রথম আলোকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নানা মত রয়েছে। কেউ এর সাংবাদিকতার প্রশংসা করেন, কেউ সমালোচনা করেন। সংবাদপত্রটির সম্পাদকীয় অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু মতভিন্নতার কারণে সাংবাদিকদের ভয় দেখানো, গ্রেপ্তার করা কিংবা সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব জনস্বার্থে সত্য প্রকাশ করা। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য যেমন স্বাধীনতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পাঠকের কাছে জবাবদিহি। প্রথম আলোর মতো বড় সংবাদপত্রের জন্য দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলোর সম্পাদক আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত হয়েছেন। সংবাদপত্রটি বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যৌথ অনুসন্ধান করেছে। এর তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদে ব্যবহৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে। আবার এর সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার এবং কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে বিষয়টি নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে। আমি বুঝেছি, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শুধু বাংলাদেশের পাঠকদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা তথ্য, অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতাও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় মূল্যবান হতে পারে।
বাক্স্বাধীনতা, প্রথম আলো ও আমাদের গণতন্ত্রপ্রথম আলো, সমাজ ও রাজনীতিপ্রায় তিন দশক আগে যাত্রা শুরু করা প্রথম আলো আজ শুধু বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের অংশ নয়। এর অর্জন, অনুসন্ধান, পাঠক এবং এর ওপর আঘাতের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি বড় বাস্তবতাকেও তুলে ধরে।
একটি সংবাদপত্রের আন্তর্জাতিক প্রভাব শুধু বিশ্বের কত দেশে তার পাঠক রয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং তার সাংবাদিকতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার তথ্য কতটা দূর পর্যন্ত পৌঁছায়, তার কাজ কতটা স্বীকৃতি পায় এবং তার স্বাধীনতা আক্রান্ত হলে কত দূর পর্যন্ত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে—সেসব দিয়েও বিচার করতে হয়।
প্রথম আলোর ২৮ বছরের পথচলা সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রথম আলো বাংলাদেশের সংবাদপত্র। কিন্তু এর সাংবাদিকতার অর্জন, প্রভাব এবং সংকটের প্রতিধ্বনি বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে পৌঁছেছে।
মোসাব্বের হোসেন সাংবাদিক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ইউনিভার্সিটি অব মন্টানা, যুক্তরাষ্ট্র
*মতামত লেখকের নিজস্ব
Source - www.prothomalo.com ↗