Bangladesh · 2026-11-03 18:53:50

দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পথে বাধা কোথায়?

দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পথে বাধা কোথায়?
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাড়তি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগের ঘাটতি, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও বেসরকারি খাতের আস্থার সংকট।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ২০২৬ সালের মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ৭৭৭ মেগাওয়াট, জলবিদ্যুতের ২৩০ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুতের ৬২ মেগাওয়াট। অন্যদিকে গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা মোটের প্রায় ৯০ শতাংশ।

জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদনেও ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। একই বছরের মে মাসে গ্যাসের অভাবে ৩ হাজার ৮৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। জ্বালানির অভাবে অন্তত ৫২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে ছিল।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানির ব্যবহারে আমদানির অংশ ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে ৮৩ শতাংশ। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে এলএনজি ভর্তুকি বাবদ সরকারের অতিরিক্ত ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। অথচ পুরো অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বিপিডিবির রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।

এই পরিস্থিতিতে আমদানি করা জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাও শক্তিশালী হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬ সালের ৯ জুলাই মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায় ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল। এতে নতুন করে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর বড় অংশ আসবে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৩০ হাজার একর সরকারি জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাটারি ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর ব্যয় বাদে এ পরিকল্পনায় সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা থাকলেও সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিশেষ বিধানের আওতায় অনুমোদন পাওয়া ৩৪টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্মতিপত্র বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার যুক্তিতে নেওয়া এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পগুলো নতুন করে দরপত্রের আওতায় আনা হলেও অনেক ক্ষেত্রে একটি মাত্র দরপত্র জমা পড়ে, আবার কিছু প্রকল্পে কোনো দরপত্রই পাওয়া যায়নি।

বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল জাপানের মারুবেনি ও ডোরিন পাওয়ারের যৌথ উদ্যোগে মংলায় প্রস্তাবিত ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সম্মতিপত্র বাতিলের পর প্রকল্পটি থেকে সরে যায় মারুবেনি। ফ্রান্সের টোটালও ২৫০ মেগাওয়াটের দুটি প্রকল্পের সম্মতিপত্র বাতিল হওয়ার পর বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। এ ছাড়া চীনা অর্থায়নে লামা, মাদারগঞ্জ, ঘোড়াধাপ ও গৌরীপুরে প্রস্তাবিত মোট ৪৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার চারটি প্রকল্পও বাতিল হয়।

বায়ুবিদ্যুৎ খাতেও অগ্রগতি সীমিত। কোপেনহেগেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনার্স ও সামিট গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে কক্সবাজার উপকূলে ৫০০ মেগাওয়াটের একটি অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প ২০২৩ সালের নভেম্বরে নীতিগত অনুমোদন পেলেও এখনো প্রাথমিক উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।

প্রকল্প বাতিলের পাশাপাশি নীতিমালার ঘন ঘন পরিবর্তনও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিকারকদের তিন ধরনের করব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেপ্টেম্বরে সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের জন্য ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৫০ পয়সা মূল্য নির্ধারণ করা হলেও এসব সুবিধার মেয়াদ ২০২৭ সালের শুরুর দিকে শেষ হওয়ার কথা। ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। ঋণদাতারাও এখন বাধ্যতামূলক অর্থায়ন প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক আশ্বাসপত্র দিচ্ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের একমাত্র ক্রেতা বিপিডিবির আর্থিক সংকট।

জ্বালানি অর্থনীতিবিদ ড. ফারহানা ইসলাম মনে করেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অর্থ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তার অভাব বড় বাধা। তাঁর মতে, ২০১০ সালের পর থেকে প্রতিটি সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীল বিদ্যুৎমূল্য ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যায়নি।

দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পরামর্শক তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর মতে, বিনিয়োগকারীরা অর্থ ব্যয়ের পর কোনো প্রকল্পের অনুমোদন বাতিল হলে আন্তর্জাতিক বাজারে নেতিবাচক বার্তা যায়। স্বল্পমেয়াদি কর সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা বিনিয়োগ আকর্ষণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে এস আলম গ্রুপের একটি বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা সামনে আসে। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এসএস পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক গ্রুপটি একই উপকূলীয় এলাকায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের একটি কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। প্রকল্পটির প্রাথমিক পরিকল্পনায় ৫০ শতাংশ সবুজ জ্বালানি ব্যবহারের কথা বলা হয়, যা পর্যায়ক্রমে ১০০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ছিল।

প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের এ প্রকল্পে প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে জিই, সিমেন্স ও মিৎসুবিশিকে যুক্ত করার কথা জানিয়েছিল গ্রুপটি। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সরাসরি প্রায় ৫ হাজার এবং পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল। ২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্পটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

গ্রুপটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও হাইড্রোজেন প্রকল্প স্থাপনের জন্য যৌথ উদ্যোগের ভিত্তিতে তাদের এক হাজার একরের বেশি জমি রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর গ্রুপটির বৃহত্তর ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখে পড়ায় এসব পরিকল্পনায় আর অগ্রগতি হয়নি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্পের জন্য জমি, প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য অংশীদার রয়েছে। তবে কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর দাবি, তাঁরা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; অন্য বিনিয়োগকারীদের মতো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ চান। অবশ্য গ্রুপটির আর্থিক অবস্থা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোর নিষ্পত্তি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আদালতের বিষয়।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী হলেও তা অর্জনে শুধু প্রকল্প ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এবং আর্থিকভাবে সক্ষম ক্রেতা প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানে গ্রিডে থাকা সব সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত সক্ষমতার চেয়েও বড় এস আলম গ্রুপের পরিকল্পিত ৩ হাজার মেগাওয়াটের প্রকল্প। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানির কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। গ্যাস আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো এখন অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন। এ জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।

Source - www.bd24live.com ↗