বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য না থাকাকে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বিধিমালা (আরপিও) ১৯৭২-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে নারীদের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করে সেটিকে দলের সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ হিসেবে তুলে ধরাকে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলে অভিহিত করেছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এক বিবৃতিতে এসব কথা জানায় টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, জামায়াতের গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে সেক্রেটারি জেনারেলের দেওয়া বক্তব্য বিভ্রান্তিকর ও সত্যের অপলাপ। তবে গবেষণা প্রতিবেদনটি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করায় দলটিকে সাধুবাদ জানিয়েছে সংস্থাটি।
টিআইবির বিবৃতিতে বলা হয়, আরপিও ১৯৭২-এর ৯০খ(১)(খ)(আ) ধারা অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সব পর্যায়ের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী না থাকা আরপিওর লঙ্ঘন: টিআইবি

টিআইবির গবেষণা অনুযায়ী, জামায়াতের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৩-২৫ মেয়াদের ১৯ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। সংস্থাটির মতে, এটি আরপিওর সংশ্লিষ্ট বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
জামায়াতের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ জন নারী এবং দলের রুকনদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী থাকার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে টিআইবি বলছে, তাদের গবেষণায় কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী পরিষদ ও কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি পর্যালোচনা করা হয়েছে। জাতীয় কাউন্সিল, সম্মেলন কিংবা মজলিসে শুরার সদস্যসংখ্যা এ গবেষণার আওতাভুক্ত ছিল না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আরপিওতে রাজনৈতিক দলের মোট নারী সদস্যসংখ্যা নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা নেই। বরং নারী কর্মীদের মধ্য থেকে বিভিন্ন কমিটিতে কতজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, সেটিই বিবেচ্য। তাই কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিসে শুরায় নারী সদস্য থাকার উদাহরণ দিয়ে গবেষণার তথ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা অপ্রাসঙ্গিক।
জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে টিআইবি জানায়, দলটির গঠনতন্ত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্য পৃথক কমিটি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা রয়েছে। নারী কর্মীদের জন্য পৃথক মজলিসে শুরা ও কর্মপরিষদও রয়েছে। তবে নারীদের জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ নেই এবং মূল কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদেও কোনো নারী সদস্য রাখা হয়নি।
এ ছাড়া আমিরে জামায়াত, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বস্থানীয় পদেও নারীদের অন্তর্ভুক্তির চর্চা নেই বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। টিআইবির মতে, নারীদের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করে তাঁদের নির্দিষ্ট সাংগঠনিক পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রকৃত রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কোনো আসনেই নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি বলেও গবেষণায় উল্লেখ করেছে টিআইবি। অথচ দলটির সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্য থেকে একজনকেও নির্বাচনে মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। তবে জামায়াতের বিবৃতিতে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি বলে জানিয়েছে টিআইবি।
জামায়াতের গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। টিআইবির দাবি, ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে সমাজ গঠন, আল্লাহর বিধানের বাইরে অন্য নিয়মনীতি প্রত্যাখ্যান, ইসলামী আকিদাবিরোধী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা এবং মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকদের সদস্যপদের ক্ষেত্রে পৃথক শর্তসহ কয়েকটি বিধান সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর মধ্যে জনগণের সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যবিরোধী নীতির বিষয় রয়েছে।
টিআইবি বলেছে, এসব বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তাদের গবেষণার তথ্যকে অসত্য বা বিভ্রান্তিকর বলার সুযোগ নেই। বরং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরে দলটির প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে গবেষণার পদ্ধতি সম্পর্কে টিআইবি জানায়, তাদের প্রতিটি গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সমাজবিজ্ঞানে অনুসৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উৎসের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই, একাধিক পর্যায়ে ক্রসচেকিং এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়।
আলোচ্য গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও মনোনীত প্রতিনিধি, নেতা-কর্মী, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক ও গবেষকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ওয়েবসাইট, দলীয় কার্যালয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, গবেষণা প্রবন্ধ ও বই থেকেও তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
সবশেষে রাজনৈতিক দলগুলোকে গবেষণার ফলাফল গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে উত্থাপিত সুপারিশ অনুযায়ী নিজ নিজ দলের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
Source - www.bd24live.com ↗