Bangladesh · 2026-11-04 12:05:32

অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত চলনবিল, অবাধ শিকারে বাড়ছে শঙ্কা

অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত চলনবিল, অবাধ শিকারে বাড়ছে শঙ্কা
শীতের আগমনে সিরাজগঞ্জের চলনবিল অঞ্চলে বাড়ছে দেশি ও পরিযায়ী পাখির আনাগোনা। বিলের জলাশয়, ধানক্ষেত ও গাছপালায় আশ্রয় নিচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি। কোথাও পাখি রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, আবার কোথাও পাখি ধরতে পেতে রাখা হচ্ছে ফাঁদ।

তাড়াশের উলিপুর গ্রামে পাখির নিরাপদ আবাস গড়ে উঠলেও চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় শিকারিদের দৌরাত্ম্য পাখির নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এ অবস্থায় নিয়মিত নজরদারি, স্থায়ী পাহারাদার নিয়োগ ও শিকার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, তাড়াশ পৌরসভার ঐতিহাসিক হাট ক্ষ্যত উলিপুর গ্রামের শত শত গাছ জুড়ে শামুকখোল,পানকৌড়ি,বক, ও সারসসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বাসা বেঁধেছে।

সকালে খাবারের সন্ধানে আশপাশের জলাশয় ও ফসলের মাঠে ছড়িয়ে পড়ে পাখিগুলো। দিনের শেষে ফিরে আসে গাছের বাসায়। পাখির বিষ্ঠায় বাড়িঘর নোংরা হওয়া এবং দৈনন্দিন কাজে কিছুটা অসুবিধা হলেও গ্রামবাসী তাদের তাড়িয়ে দেন না। বরং পাখির নিরাপত্তায় নিজেরাই পাহারা দেন। উলিপুর গ্রামের ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, প্রথম দিকে কয়েকটি পাখি এসে বাসা বাঁধলে গ্রামবাসী নিজেরাই পাহারা দেওয়া শুরু করেন।

পাখি শিকার করতে আসা কয়েকজনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাখির বিষ্ঠায় কিছুটা অসুবিধা হলেও গ্রামের মানুষ পাখিগুলোকে ভালোবাসেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। তবে চলনবিলের সব এলাকায় পাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। কয়েক দিন আগে তাড়াশ উপজেলার পাটগাড়িপাড়া মৌজার একটি ধানখেতে পাখি শিকারের ফাঁদ দেখা যায়।

সেখানে লতাপাতা দিয়ে ঝোপের মতো কাঠামো তৈরি করে তার ওপর জাল পাতা হয়েছিল। ফাঁদের কাছে একটি পাখির পা সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির সাহায্যে গাছের মগডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পাখিটি ডানা ঝাপটে ডাকাডাকি করলে অন্য পাখি কাছে আসে। এ সময় সেগুলো জালে আটকা পড়ে। ওই সময় শিকারি মোতালেব শেখ একই পদ্ধতিতে পাখি ধরার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, শখের বশে তিন-চার বছর ধরে এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে পাখি শিকার করছেন।

এ সময়ে তাকে কেউ বাধা দেননি। চলনবিলে শামুকখোল, ডাহুক, ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির ও লালশিরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায়। শীতকালে জলাশয় ও বিল এলাকায় পাখির আনাগোনা বাড়ে। বিশেষ করে জলাভূমিতে শামুকের প্রাচুর্য শামুকখোলের মতো পাখির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তবে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, খাদ্যসংকট ও শিকারের কারণে এসব পাখির নিরাপদ বিচরণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশে পাখির প্রজাতির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেশে ৭১১ প্রজাতির পাখির উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, পাখির আন্তর্জাতিক তালিকা প্রস্তুতকারী সংস্থা বার্ডস কানাডার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট Avibase-এর তালিকায় বাংলাদেশের ৮৩৫ প্রজাতির পাখির তথ্য রয়েছে। তালিকা ও শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্যের কারণে এ সংখ্যায় ভিন্নতা দেখা যায়।

চলনবিল জীব ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জ-নাটোর সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত পাখি শিকারের ঘটনা ঘটে। তাড়াশের বারুহাসসহ চলনবিলের দুর্গম এলাকাগুলোতে শিকারিরা ‘কেল্লা ফাঁদ’ ব্যবহার করেন। এসব এলাকায় যাতায়াত কঠিন হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষে সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয় না। রাজশাহী বিভাগীয় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, দেশে পাখির মোট সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই।

চলনবিলে দেশি পাখির পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিযায়ী পাখি আসে। তবে নিরাপদ আবাসস্থল না থাকলে পাখির বিচরণ ও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। পাখি শিকার বন্ধে সচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হয়। সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, জনসংখ্যার চাপ, গাছ কাটা, পাখি শিকার ও খাদ্যসংকটের কারণে পাখির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে।

চলনবিলের জলাভূমি ও শামুকের প্রাচুর্য শামুকখোলের মতো পাখির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। পাখি রক্ষায় গাছ ও জলাভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি শিকার বন্ধ করা জরুরি। তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, শীতকালে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আসে। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে উলিপুর গ্রাম পাখির নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পাশাপাশি পাখির নিরাপত্তায় পাহারাদার নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে। পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে উলিপুর গ্রামে পাখির নিরাপদ আবাস গড়ে উঠলেও তা ধরে রাখতে নিয়মিত পাহারা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চলনবিলের দুর্গম এলাকায় শিকারিদের ফাঁদ শনাক্ত, নজরদারি জোরদার এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

পাখির আবাসস্থল রক্ষা ও শিকার বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।

The post অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত চলনবিল, অবাধ শিকারে বাড়ছে শঙ্কা appeared first on Bangladesh Diplomat | বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাট.

Source - bangladeshdiplomat.com ↗