ভারতের রাজধানী দিল্লির একেবারে কেন্দ্রস্থলে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে সামান্য দূরের একটি ছোট্ট মসজিদ। পুরোনো মসজিদটির চারপাশে ছড়িয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। তবে মসজিদের ধূসর দেয়াল, খিলান আর উঠানের সাদা–সবুজ টাইলসগুলো এখনো সেভাবেই অক্ষত আছে। শুধু নেই সেসব মানুষেরা, যাঁদের পদচারণে মুখর থাকত মসজিদ প্রাঙ্গণ, বসতি।
তাঁদেরই একজন মোহাম্মদ ওয়াসিম। বয়স ৫০ বছর। পেশায় গাড়িচালক তিনি। মসজিদঘেঁষা ধ্বংসস্তূপের দিকে তিনি আঙুল তুলে দেখালেন, সেখানেই একসময় বসতঘর ছিল ওয়াসিমের। বললেন, ‘এখানে আমার বাবার বিয়ে হয়েছিল। কয়েক দশক পর আমার মেয়ের বিয়েও এখানে হয়েছে।’
পরিবার নিয়ে শুধু ওয়াসিম নন, কয়েক শ মানুষ মসজিদটি ঘিরে বসবাস করতেন। জায়গাটি দিল্লির রেসকোর্স এলাকায়। ভারতের রাজধানীর অন্যতম অভিজাত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা এটি। সেখানে রয়েছে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা, অভিজাত ক্লাব, সারি সারি বিশাল বাংলো। এসবের মাঝে ছোট ছোট কিছু ঘর নিয়ে গড়ে উঠেছিল মুসলিমদের ওই বসতি।
দিল্লির ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে বড় হয়েছেন তাঁরা, এখন উচ্ছেদ হয়ে যেতে হলো ৩১ মাইল দূরে

গত ৭ অক্টোবর সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বাড়ি, দোকান, স্থাপনা; পুরো বসতি। কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকারি জমিতে অবৈধ বসতি গড়ে তোলা হয়েছিল। তাই, অভিযান চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে আনে কর্তৃপক্ষ।
মুসলিমরা কয়েক প্রজন্ম ধরে দিল্লির ওই জায়গাটিতে বসবাস করে আসছিলেন। আশপাশের অভিজাত বাড়িগুলোয় কেউ গাড়িচালক, কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আবার কেউবা মালির কাজ করতেন। উচ্ছেদ করা হয়েছে ৭১৭টি পরিবারকে। তাদের এখন ঠাঁই হয়েছে ‘সাভদা ঘেবরা’ নামের একটি আবাসিক এলাকায়। জায়গাটি দিল্লির উপকণ্ঠে, আগের বসতি থেকে প্রায় ৩১ মাইল দূরে।
সরকারের উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যুক্তি ছিল কর্মস্থল, বিদ্যালয় আর পরিচিত জনপদ থেকে এত দূরে সরিয়ে নেওয়া হলে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। তবে আদালত এসব যুক্তি আমলে নেননি।
গত আগস্টে আদালত তাঁদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেন। সরকার নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল, আদালত তা গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথাও বলেছেন।
ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযানের পর এলাকাটিতে শুধু মসজিদটি আর কাছাকাছি থাকা একটি মন্দির অক্ষত আছে। তবে সেখানকার পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সেখানে যাতায়াতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মুসল্লিদের মসজিদের ফটক থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে অনুরোধ করে কেউ কেউ ভেতরে ঢুকছেন।
উচ্ছেদের পর মসজিদের পানি–বিদ্যুতের সংযোগ আবার চালু করতে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে ওয়াক্ফ বোর্ড। চিঠিতে মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথাও লেখা রয়েছে। সেই সঙ্গে মসজিদটিতে নামাজ আদায়ে বিধিনিষেধ আরোপ এবং ভেঙে ফেলার আশঙ্কা জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন একজন মুসল্লি।মসজিদটি শতাব্দীপ্রাচীন
ভারত সরকার বলছে, মসজিদটি সরকারি জমিতে নির্মিত। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৯৭৭ সালে এটি ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ইসলামি আইন অনুযায়ী, ধর্মীয় বা দাতব্য কাজের জন্য স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করা জমি বা স্থাপনাকে ওয়াক্ফ সম্পত্তি বলা হয়। মসজিদটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবেও তালিকাভুক্ত।
দিল্লি ওয়াক্ফ বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটির বয়স প্রায় ৩০০ বছর। তবে অনেকে বলছেন, এর বয়স ১২৫ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কাজেই মসজিদটিকে শতাব্দীপ্রাচীন বলাই যায়।
উচ্ছেদের পর মসজিদের পানি–বিদ্যুতের সংযোগ আবার চালু করতে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে ওয়াক্ফ বোর্ড। চিঠিতে মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথাও লেখা রয়েছে। সেই সঙ্গে মসজিদটিতে নামাজ আদায়ে বিধিনিষেধ আরোপ এবং ভেঙে ফেলার আশঙ্কা জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন একজন মুসল্লি।
গত ২৯ অক্টোবর সরকার আদালতকে জানায়, ওয়াক্ফ বোর্ডের আপত্তিগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। এ জন্য আগামী চার সপ্তাহ কিছু করা হবে না। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে নামাজ আদায়ের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছে সরকার। তাদের যুক্তি, আশপাশে উচ্ছেদের কাজ চলায় সেখানে নামাজ আদায় করা ঝুঁকিপূর্ণ।
মুসল্লিদের আইনজীবী সরকারের এ যুক্তির বিরোধিতা করেছেন।
সমালোচকদের মতে, দিল্লিতে এমন উচ্ছেদের ঘটনা নতুন নয়। এসব ঘটনা দীর্ঘদিনের সমস্যার অংশ। কাজের সন্ধানে শহরে আসা নিম্ন আয়ের মানুষদের বারবার শহরের দূরবর্তী প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর বড় কারণ তাঁরা সেখানে কয়েক দশক ধরে বসবাস করলেও জমির বৈধ মালিকানার প্রমাণ দেখাতে পারেন না।ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা
আদালত বিষয়টি নিয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে রাজি হননি। আগামী ১৬ ডিসেম্বর শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।
মসজিদটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একসময় যাঁরা মসজিদের আশপাশে বসবাস করতেন, তাঁদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন—সেখানকার জীবনের কতটুকু আর ফিরে পাওয়া যাবে?
এখন ওয়াসিম সময় পেলেই মসজিদটিতে নামাজ আদায় করতে যান। কখনো কখনো নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। আবার কখনো অনুমতি মেলে। চার–পাঁচজন মিলে নামাজ আদায় করেন। বাইরে বড়সড় একটি জেনারেটর বসানো হয়েছে। উচ্চশব্দে চলছে সেটি। সেখান থেকেই বিদ্যুৎ সবরাহ করা হচ্ছে।
ওয়াসিম বলেন, ‘আমাদের পুরো জীবন এ জায়গাটি ঘিরে। শৈশবে এখানে খেলাধুলা করে বেড়ে উঠেছি। আমরা এখন কীভাবে জায়গাটি ছেড়ে যেতে পারি।’
মসজিদের সামনে ও আশপাশে বেশ কিছু স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব জায়গায় মুসলিম পরিবারগুলো বসবাস করতরেখা নামে এক বিধবা নারী সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন। পাশের একটি বাসায় ধোয়ামোছার কাজ করতেন। সেই বেতন দিয়ে পরিবার চলত। পাশাপাশি স্থানীয় একটি মন্দিরে সেবায়েতের কাজেও যুক্ত ছিলেন। বাড়ি থেকে উচ্ছেদের কারণে এখন অকূলপাথারে পড়েছেন রেখা।
অসহায় কণ্ঠে রেখা বলেন, ‘বেশ কয়েক দশক এখানে ছিলাম। এখন উচ্ছেদ করা হলো। বহুদিনের গোছানো সংসার ফেলে এখন নতুন জায়গায় গিয়ে আবার কীভাবে সব গড়ে তুলব?’
নতুন জায়গায় যেতে হওয়ায় আগের কাজটি হারিয়েছেন রেখা। তাঁর ১৯ বছরের ছেলে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন। তিনতলায় একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট দেওয়া হয়েছে রেখাকে। অস্ত্রোপচার হয়েছিল, পায়ে একটি লোহার পাত পরানো রয়েছে রেখার। তাই সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় ওঠানামা করতে ভীষণ কষ্ট হয় তাঁর।
ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভোগা রেখা বলেন, ‘আমাকে একটা বাসা দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার বাড়িটি কেড়ে নিয়েছে।’
‘জীবিকা চলে যায়, আয় কমে’
সমালোচকদের মতে, দিল্লিতে এমন উচ্ছেদের ঘটনা নতুন নয়। এসব ঘটনা দীর্ঘদিনের সমস্যার অংশ। কাজের সন্ধানে শহরে আসা নিম্ন আয়ের মানুষদের বারবার শহরের দূরবর্তী প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর বড় কারণ তাঁরা সেখানে কয়েক দশক ধরে বসবাস করলেও জমির বৈধ মালিকানার প্রমাণ দেখাতে পারেন না।
নগর গবেষক মুক্তা নায়েক বিবিসিকে বলেন, উচ্ছেদের ফলে এসব মানুষ কর্মস্থল ও পরিচিত সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা—দুটো থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এতে তাঁদের জীবিকা চলে যায়, আয় কমে।
পুরোনো জায়গায় পরিবারগুলো দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাস করায় একে অপরের সহায় হয়ে ওঠেন। একটি পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। নতুন জায়গায় সেই নেটওয়ার্ক আবার গড়ে তোলাটি বেশ কঠিন। মুক্তা বলেন, ‘নতুন জায়গায় পরিবারগুলোকে একাই নিজেদের সবকিছু সামলাতে হয়।’
রেখা, ভুক্তভোগী নারী।‘বেশ কয়েক দশক এখানে ছিলাম। এখন উচ্ছেদ করা হলো। বহুদিনের গোছানো সংসার ফেলে এখন নতুন জায়গায় গিয়ে আবার কীভাবে সব গড়ে তুলব?বিদ্যুৎ ও পানি বন্ধ, উচ্ছেদ-আতঙ্কের মধ্যেই দিল্লির শতবর্ষী মসজিদে জুমার নামাজ পড়লেন মুসল্লিরাদিল্লির রাজ্য সরকারের আবাসন সংস্থা, স্থানীয় পৌর কাউন্সিল এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমি দপ্তরের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়েছিল বিবিসি। জবাব পাওয়া যায়নি।
সাভদা ঘেবরা জায়গাটি দিল্লি–হরিয়ানার সীমান্তঘেঁষা। ২০০৬ সালে সেখানে বিস্তৃর্ণ কৃষিজমিতে এটা গড়ে তোলা হয়েছিল। শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য এ আবাসিক এলাকা তৈরি করা হয়েছিল।
শুরুর দিকে এখানে যাঁরা বসতি গড়তে এসেছিলেন, তাঁরা পেয়েছিলেন খালি জমি। সড়ক, পানির ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ—কিছুই ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা নিজেদের ঘরবাড়ি বানান, দোকানপাট গড়ে তোলেন। তাঁদের মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো আদায়ের জন্য লড়াই করতে হয়েছে।
আসামের পর দিল্লিতে ৭০০ মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, মসজিদ ভেঙে দেওয়ার নোটিশ জারিনিত্যদিনের যাতায়াতে সমস্যা
চলতি শতকের শুরুর দশকে সাভদা ঘেবরায় হাজার পঞ্চাশেক মানুষ বসবাস করতেন। তাঁদের অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তাঁরা ধীরে ধীরে জায়গাটিকে একটি জনপদে পরিণত করেন। এখন রেসকোর্স থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো সেখানে একইভাবে নতুন করে জীবন গড়ার কঠিন ও দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছে।
কথা হচ্ছিল বাবলুর সঙ্গে। তাঁর সন্তান এখনো দিল্লির মধ্যাঞ্চলের আগের বিদ্যালয় পড়ছে। বাবলু বলেন, সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বেরোতে হয়। এরপর মেট্রোতে চড়ে সন্তানকে দিল্লির ওই বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে তাঁকে তিনবার ট্রেন বদলাতে হয়। বিদ্যালয় চলার পুরো সময়টা তিনি পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষা করেন। পরে একইভাবে ট্রেন বদলে আবার বাড়ি ফেরেন।
বাবলু জানান, তিনি কাজে চলে গেলে সন্তানকে নিয়ে তাঁর স্ত্রীকে এই যুদ্ধটা করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, নতুন বাড়িটা বেশ দূরে। তাই তিনি বা তাঁর স্ত্রীর সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতে বিকেল চারটা বেজে যায়।
রেসকোর্সের একটি ক্লাবে কাজ করতেন বাবলু। এখন দিল্লির উত্তর–পূর্বাঞ্চলের মিরাট শহরে কাজ খুঁজছেন তিনি। বাবলু বলেন, কর্মস্থল আর ছেলেমেয়ের বিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকাগুলোয় চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন অনেকেই।
সরকারের দাবি, রেসকোর্সের কাছাকাছি উপযুক্ত ফ্ল্যাট পাওয়া যায়নি। আদালতে সরকার বলেছে, সাভদা ঘেবরায় চিকিৎসাকেন্দ্র, বিদ্যালয় ও যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। তাই বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর বসবাসের জন্য এলাকাটি বেশ উপযুক্ত।
মুক্তা নায়েক, নগর গবেষক।উচ্ছেদের ফলে এসব মানুষ কর্মস্থল ও পরিচিত সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা—দুটো থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এতে তাঁদের জীবিকা চলে যায়, আয় কমে।আসামের ধুবড়িতে উচ্ছেদ অভিযানে গৃহহীন ৪ হাজার বাঙালি মুসলমাননাগরিক সুবিধার অপ্রতুলতা
কিন্তু এসব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারছেন না ৬৩ বছর বয়সী নাঈম খান। তাঁর দুই নাতি কথা বলতে ও শুনতে পারে না। তাদের বিশেষায়িত চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রয়োজন। নাঈমের দাবি, সাভদা ঘেবরায় এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই।
নাঈম বলেন, স্থানান্তরের কারণে তাঁর পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। এক ছেলে আর বিবাহবিচ্ছিন্ন মেয়ে তাঁর সঙ্গে ছোট্ট এক কক্ষের ফ্ল্যাটে থাকেন। জায়গার অভাবে অন্য দুই ছেলেকে থাকতে হচ্ছে আলাদা জায়গায়। নাঈমের ভাষায়, ‘আমাদের প্রায় ২০ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
এই বাস্তুচ্যুতি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে নারীদের ওপর। নগর গবেষক মুক্তা বলেন, শিশুদের দেখাশোনার দায়িত্ব, যাতায়াতের খরচ ও নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে নারীদের জন্য দূরে গিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আসামে বাঙালি মুসলিমদের বাড়িঘর উচ্ছেদ, মসজিদ ভাঙার অভিযোগরেসকোর্সের আশপাশের ধনী পরিবারগুলোয় কাজ করে আয় করার সুযোগ ছিল। কারও বাসায় থালাবাসন ধোয়া, বাগানের পরিচর্যা করা, ফেলে দেওয়া বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করা—এসব কাজ করে উচ্ছেদ হওয়ার আগে নারীরা উপার্জন করতে পারতেন।
তাঁদেরই একজন আখতারি। স্বামী মারা গেছেন। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পানির বোতল কুড়িয়ে দিনে প্রায় ১০০ রুপি আয় হতো তাঁর। এখন সেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
নতুন বসতির বিষয়ে আখতারি বলেন, ‘এখানে যাঁরা থাকেন সবাইকে একসময় উচ্ছেদ করা হয়েছে। সবাই গরিব, অসহায়। নিজেরা টিকে থাকার লড়াই করছেন। অন্যের বাসায় কাজের জন্য কে আর কাউকে নিয়োগ দেবে?’
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কী হবে, এখন সেই চিন্তা তাড়া করছে আখতারিকে। তিনি বলেন, ‘ঘরে মৃত পড়ে থাকলেও কেউ জানতে পারবে না। আশা করি কেউ একদিন দরজা ভেঙে আমাকে (মৃত অবস্থায়) খুঁজে পাবে।’
এবার দিল্লির ১৫০ বছরের পুরোনো মসজিদ উচ্ছেদের নোটিশ
মুসলিমরা কয়েক প্রজন্ম ধরে দিল্লির ওই জায়গাটিতে বসবাস করে আসছিলেন। আশপাশের অভিজাত বাড়িগুলোয় কেউ গাড়িচালক, কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আবার কেউবা মালির কাজ করতেন। উচ্ছেদ করা হয়েছে ৭১৭টি পরিবারকে। তাদের এখন ঠাঁই হয়েছে ‘সাভদা ঘেবরা’ নামের একটি আবাসিক এলাকায়। জায়গাটি দিল্লির উপকণ্ঠে, আগের বসতি থেকে প্রায় ৩১ মাইল দূরে।
সরকারের উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যুক্তি ছিল কর্মস্থল, বিদ্যালয় আর পরিচিত জনপদ থেকে এত দূরে সরিয়ে নেওয়া হলে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। তবে আদালত এসব যুক্তি আমলে নেননি।
গত আগস্টে আদালত তাঁদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেন। সরকার নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল, আদালত তা গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথাও বলেছেন।
ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযানের পর এলাকাটিতে শুধু মসজিদটি আর কাছাকাছি থাকা একটি মন্দির অক্ষত আছে। তবে সেখানকার পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সেখানে যাতায়াতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মুসল্লিদের মসজিদের ফটক থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে অনুরোধ করে কেউ কেউ ভেতরে ঢুকছেন।
উচ্ছেদের পর মসজিদের পানি–বিদ্যুতের সংযোগ আবার চালু করতে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে ওয়াক্ফ বোর্ড। চিঠিতে মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথাও লেখা রয়েছে। সেই সঙ্গে মসজিদটিতে নামাজ আদায়ে বিধিনিষেধ আরোপ এবং ভেঙে ফেলার আশঙ্কা জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন একজন মুসল্লি।মসজিদটি শতাব্দীপ্রাচীন
ভারত সরকার বলছে, মসজিদটি সরকারি জমিতে নির্মিত। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৯৭৭ সালে এটি ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ইসলামি আইন অনুযায়ী, ধর্মীয় বা দাতব্য কাজের জন্য স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করা জমি বা স্থাপনাকে ওয়াক্ফ সম্পত্তি বলা হয়। মসজিদটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবেও তালিকাভুক্ত।
দিল্লি ওয়াক্ফ বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটির বয়স প্রায় ৩০০ বছর। তবে অনেকে বলছেন, এর বয়স ১২৫ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কাজেই মসজিদটিকে শতাব্দীপ্রাচীন বলাই যায়।
উচ্ছেদের পর মসজিদের পানি–বিদ্যুতের সংযোগ আবার চালু করতে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে ওয়াক্ফ বোর্ড। চিঠিতে মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথাও লেখা রয়েছে। সেই সঙ্গে মসজিদটিতে নামাজ আদায়ে বিধিনিষেধ আরোপ এবং ভেঙে ফেলার আশঙ্কা জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন একজন মুসল্লি।
গত ২৯ অক্টোবর সরকার আদালতকে জানায়, ওয়াক্ফ বোর্ডের আপত্তিগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। এ জন্য আগামী চার সপ্তাহ কিছু করা হবে না। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে নামাজ আদায়ের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছে সরকার। তাদের যুক্তি, আশপাশে উচ্ছেদের কাজ চলায় সেখানে নামাজ আদায় করা ঝুঁকিপূর্ণ।
মুসল্লিদের আইনজীবী সরকারের এ যুক্তির বিরোধিতা করেছেন।
সমালোচকদের মতে, দিল্লিতে এমন উচ্ছেদের ঘটনা নতুন নয়। এসব ঘটনা দীর্ঘদিনের সমস্যার অংশ। কাজের সন্ধানে শহরে আসা নিম্ন আয়ের মানুষদের বারবার শহরের দূরবর্তী প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর বড় কারণ তাঁরা সেখানে কয়েক দশক ধরে বসবাস করলেও জমির বৈধ মালিকানার প্রমাণ দেখাতে পারেন না।ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা
আদালত বিষয়টি নিয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে রাজি হননি। আগামী ১৬ ডিসেম্বর শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।
মসজিদটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একসময় যাঁরা মসজিদের আশপাশে বসবাস করতেন, তাঁদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন—সেখানকার জীবনের কতটুকু আর ফিরে পাওয়া যাবে?
এখন ওয়াসিম সময় পেলেই মসজিদটিতে নামাজ আদায় করতে যান। কখনো কখনো নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। আবার কখনো অনুমতি মেলে। চার–পাঁচজন মিলে নামাজ আদায় করেন। বাইরে বড়সড় একটি জেনারেটর বসানো হয়েছে। উচ্চশব্দে চলছে সেটি। সেখান থেকেই বিদ্যুৎ সবরাহ করা হচ্ছে।
ওয়াসিম বলেন, ‘আমাদের পুরো জীবন এ জায়গাটি ঘিরে। শৈশবে এখানে খেলাধুলা করে বেড়ে উঠেছি। আমরা এখন কীভাবে জায়গাটি ছেড়ে যেতে পারি।’
মসজিদের সামনে ও আশপাশে বেশ কিছু স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব জায়গায় মুসলিম পরিবারগুলো বসবাস করতরেখা নামে এক বিধবা নারী সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন। পাশের একটি বাসায় ধোয়ামোছার কাজ করতেন। সেই বেতন দিয়ে পরিবার চলত। পাশাপাশি স্থানীয় একটি মন্দিরে সেবায়েতের কাজেও যুক্ত ছিলেন। বাড়ি থেকে উচ্ছেদের কারণে এখন অকূলপাথারে পড়েছেন রেখা।
অসহায় কণ্ঠে রেখা বলেন, ‘বেশ কয়েক দশক এখানে ছিলাম। এখন উচ্ছেদ করা হলো। বহুদিনের গোছানো সংসার ফেলে এখন নতুন জায়গায় গিয়ে আবার কীভাবে সব গড়ে তুলব?’
নতুন জায়গায় যেতে হওয়ায় আগের কাজটি হারিয়েছেন রেখা। তাঁর ১৯ বছরের ছেলে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন। তিনতলায় একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট দেওয়া হয়েছে রেখাকে। অস্ত্রোপচার হয়েছিল, পায়ে একটি লোহার পাত পরানো রয়েছে রেখার। তাই সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় ওঠানামা করতে ভীষণ কষ্ট হয় তাঁর।
ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভোগা রেখা বলেন, ‘আমাকে একটা বাসা দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার বাড়িটি কেড়ে নিয়েছে।’
‘জীবিকা চলে যায়, আয় কমে’
সমালোচকদের মতে, দিল্লিতে এমন উচ্ছেদের ঘটনা নতুন নয়। এসব ঘটনা দীর্ঘদিনের সমস্যার অংশ। কাজের সন্ধানে শহরে আসা নিম্ন আয়ের মানুষদের বারবার শহরের দূরবর্তী প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর বড় কারণ তাঁরা সেখানে কয়েক দশক ধরে বসবাস করলেও জমির বৈধ মালিকানার প্রমাণ দেখাতে পারেন না।
নগর গবেষক মুক্তা নায়েক বিবিসিকে বলেন, উচ্ছেদের ফলে এসব মানুষ কর্মস্থল ও পরিচিত সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা—দুটো থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এতে তাঁদের জীবিকা চলে যায়, আয় কমে।
পুরোনো জায়গায় পরিবারগুলো দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাস করায় একে অপরের সহায় হয়ে ওঠেন। একটি পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। নতুন জায়গায় সেই নেটওয়ার্ক আবার গড়ে তোলাটি বেশ কঠিন। মুক্তা বলেন, ‘নতুন জায়গায় পরিবারগুলোকে একাই নিজেদের সবকিছু সামলাতে হয়।’
রেখা, ভুক্তভোগী নারী।‘বেশ কয়েক দশক এখানে ছিলাম। এখন উচ্ছেদ করা হলো। বহুদিনের গোছানো সংসার ফেলে এখন নতুন জায়গায় গিয়ে আবার কীভাবে সব গড়ে তুলব?বিদ্যুৎ ও পানি বন্ধ, উচ্ছেদ-আতঙ্কের মধ্যেই দিল্লির শতবর্ষী মসজিদে জুমার নামাজ পড়লেন মুসল্লিরাদিল্লির রাজ্য সরকারের আবাসন সংস্থা, স্থানীয় পৌর কাউন্সিল এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমি দপ্তরের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়েছিল বিবিসি। জবাব পাওয়া যায়নি।
সাভদা ঘেবরা জায়গাটি দিল্লি–হরিয়ানার সীমান্তঘেঁষা। ২০০৬ সালে সেখানে বিস্তৃর্ণ কৃষিজমিতে এটা গড়ে তোলা হয়েছিল। শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য এ আবাসিক এলাকা তৈরি করা হয়েছিল।
শুরুর দিকে এখানে যাঁরা বসতি গড়তে এসেছিলেন, তাঁরা পেয়েছিলেন খালি জমি। সড়ক, পানির ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ—কিছুই ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা নিজেদের ঘরবাড়ি বানান, দোকানপাট গড়ে তোলেন। তাঁদের মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো আদায়ের জন্য লড়াই করতে হয়েছে।
আসামের পর দিল্লিতে ৭০০ মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, মসজিদ ভেঙে দেওয়ার নোটিশ জারিনিত্যদিনের যাতায়াতে সমস্যা
চলতি শতকের শুরুর দশকে সাভদা ঘেবরায় হাজার পঞ্চাশেক মানুষ বসবাস করতেন। তাঁদের অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তাঁরা ধীরে ধীরে জায়গাটিকে একটি জনপদে পরিণত করেন। এখন রেসকোর্স থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো সেখানে একইভাবে নতুন করে জীবন গড়ার কঠিন ও দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছে।
কথা হচ্ছিল বাবলুর সঙ্গে। তাঁর সন্তান এখনো দিল্লির মধ্যাঞ্চলের আগের বিদ্যালয় পড়ছে। বাবলু বলেন, সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বেরোতে হয়। এরপর মেট্রোতে চড়ে সন্তানকে দিল্লির ওই বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে তাঁকে তিনবার ট্রেন বদলাতে হয়। বিদ্যালয় চলার পুরো সময়টা তিনি পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষা করেন। পরে একইভাবে ট্রেন বদলে আবার বাড়ি ফেরেন।
বাবলু জানান, তিনি কাজে চলে গেলে সন্তানকে নিয়ে তাঁর স্ত্রীকে এই যুদ্ধটা করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, নতুন বাড়িটা বেশ দূরে। তাই তিনি বা তাঁর স্ত্রীর সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতে বিকেল চারটা বেজে যায়।
রেসকোর্সের একটি ক্লাবে কাজ করতেন বাবলু। এখন দিল্লির উত্তর–পূর্বাঞ্চলের মিরাট শহরে কাজ খুঁজছেন তিনি। বাবলু বলেন, কর্মস্থল আর ছেলেমেয়ের বিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকাগুলোয় চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন অনেকেই।
সরকারের দাবি, রেসকোর্সের কাছাকাছি উপযুক্ত ফ্ল্যাট পাওয়া যায়নি। আদালতে সরকার বলেছে, সাভদা ঘেবরায় চিকিৎসাকেন্দ্র, বিদ্যালয় ও যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। তাই বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর বসবাসের জন্য এলাকাটি বেশ উপযুক্ত।
মুক্তা নায়েক, নগর গবেষক।উচ্ছেদের ফলে এসব মানুষ কর্মস্থল ও পরিচিত সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা—দুটো থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এতে তাঁদের জীবিকা চলে যায়, আয় কমে।আসামের ধুবড়িতে উচ্ছেদ অভিযানে গৃহহীন ৪ হাজার বাঙালি মুসলমাননাগরিক সুবিধার অপ্রতুলতা
কিন্তু এসব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারছেন না ৬৩ বছর বয়সী নাঈম খান। তাঁর দুই নাতি কথা বলতে ও শুনতে পারে না। তাদের বিশেষায়িত চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রয়োজন। নাঈমের দাবি, সাভদা ঘেবরায় এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই।
নাঈম বলেন, স্থানান্তরের কারণে তাঁর পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। এক ছেলে আর বিবাহবিচ্ছিন্ন মেয়ে তাঁর সঙ্গে ছোট্ট এক কক্ষের ফ্ল্যাটে থাকেন। জায়গার অভাবে অন্য দুই ছেলেকে থাকতে হচ্ছে আলাদা জায়গায়। নাঈমের ভাষায়, ‘আমাদের প্রায় ২০ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
এই বাস্তুচ্যুতি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে নারীদের ওপর। নগর গবেষক মুক্তা বলেন, শিশুদের দেখাশোনার দায়িত্ব, যাতায়াতের খরচ ও নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে নারীদের জন্য দূরে গিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আসামে বাঙালি মুসলিমদের বাড়িঘর উচ্ছেদ, মসজিদ ভাঙার অভিযোগরেসকোর্সের আশপাশের ধনী পরিবারগুলোয় কাজ করে আয় করার সুযোগ ছিল। কারও বাসায় থালাবাসন ধোয়া, বাগানের পরিচর্যা করা, ফেলে দেওয়া বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করা—এসব কাজ করে উচ্ছেদ হওয়ার আগে নারীরা উপার্জন করতে পারতেন।
তাঁদেরই একজন আখতারি। স্বামী মারা গেছেন। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পানির বোতল কুড়িয়ে দিনে প্রায় ১০০ রুপি আয় হতো তাঁর। এখন সেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
নতুন বসতির বিষয়ে আখতারি বলেন, ‘এখানে যাঁরা থাকেন সবাইকে একসময় উচ্ছেদ করা হয়েছে। সবাই গরিব, অসহায়। নিজেরা টিকে থাকার লড়াই করছেন। অন্যের বাসায় কাজের জন্য কে আর কাউকে নিয়োগ দেবে?’
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কী হবে, এখন সেই চিন্তা তাড়া করছে আখতারিকে। তিনি বলেন, ‘ঘরে মৃত পড়ে থাকলেও কেউ জানতে পারবে না। আশা করি কেউ একদিন দরজা ভেঙে আমাকে (মৃত অবস্থায়) খুঁজে পাবে।’
এবার দিল্লির ১৫০ বছরের পুরোনো মসজিদ উচ্ছেদের নোটিশ
Source - www.prothomalo.com ↗