Bangladesh · 2026-11-04 18:24:10

নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও ভোলার নদীতে ইলিশ সংকট কাটেনি

নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও ভোলার নদীতে ইলিশ সংকট কাটেনি
ভোর হওয়ার আগেই নদীর ঘাটে ছোটাছুটি শুরু করেন জেলেরা। কেউ ট্রলারে জাল তুলছেন, কেউ জ্বালানি নিচ্ছেন, আবার কেউ বরফ ও খাবার সংগ্রহ করছেন। সবার চোখে একটাই প্রত্যাশা নদী বা সাগর থেকে এবার বুঝি ভালো মাছ নিয়ে ফিরবেন।

কিন্তু দিনের পর দিন সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। জাল ফেলেও মিলছে না কাঙ্খিত মাছ। অথচ মাছ ধরতে গিয়ে খরচ হচ্ছে জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি, খাবার ও বরফের টাকা। সঙ্গে আছে ট্রলার ও জাল কেনার ঋণের কিস্তি। গত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ফিরেছে জেলেদের কর্মচাঞ্চল্য। নৌকা-ট্রলার নিয়ে নদীতে নেমেছেন হাজারো জেলে।

মাছঘাটেও শুরু হয়েছে বেচাকেনা। কিন্তু নদীতে ফিরলেও ভাগ্য ফিরছে না তাদের। জালে ধরা পড়ছে না প্রত্যাশিত ইলিশ। কোনো কোনো ট্রলারে মিলছে মাত্র দুই থেকে চারটি মাছ। এতে মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে ট্রলারের জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞার সময় ধারদেনা করে চলা পরিবারগুলোর মধ্যে এখন নতুন করে দেখা দিয়েছে ঋণ পরিশোধের দুচিন্তা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন বাড়াতে গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। এ সময় নদীতে মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। গত বুধবার মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নতুন আশায় নদীতে নামেন জেলেরা।

সরেজমিনে দৌলতখান মৎস্যঘাট ঘুরে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা শেষে মেঘনা নদীতে ফিরে এসেছে চিরচেনা কর্মব্যস্ততা। নৌকা ও ট্রলারে মাছ ধরছেন জেলেরা। সারারাত মাছ শিকার শেষে একে একে ঘাটে ফিরছেন তারা। কেউ ঝুড়িতে মাছ তুলছেন, কেউ নিয়ে যাচ্ছেন আড়তদার ও পাইকারদের কাছে। মাছঘাটে চলছে দরদাম ও কেনাবেচা। আড়তদার ও মহাজনেরা হাঁকডাক দিয়ে মাছ কিনছেন।

পরে বরফ দিয়ে সংরক্ষণের জন্য মাছ তোলা হচ্ছে বাক্সে। তবে ঘাটে এমন কর্মচাঞ্চল্য থাকলেও জেলেদের মুখে হাসি নেই। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে নেমে প্রচুর ইলিশ পাওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হচ্ছে না। জেলেদের জালে যে পরিমাণ মাছ ধরা পড়ছে, তা দিয়ে নৌকা-ট্রলারের খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ধরা পড়া ইলিশের অধিকাংশই আকারে ছোট। অনেক ট্রলারকে ফিরতে হচ্ছে সামান্য মাছ নিয়ে।

জেলেরা জানান, টানা ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় তাদের অধিকাংশ পরিবারকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছ ধরতে নেমে সেই দেনা পরিশোধের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কিন্তু নদীতে মাছের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় সেই আশায় ভাটা পড়েছে। তাদের ভাষ্য, নদীতে মাছ কম থাকায় একদিকে যেমন জ্বালানি, বরফ ও শ্রমিকের খরচ তুলতে পারছেন না, অন্যদিকে মহাজন ও স্থানীয়ভাবে নেওয়া ধারদেনা পরিশোধ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে পরিবার-পরিজন নিয়ে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। নদীতে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। ছোট আকারের ইলিশও বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ইলিশ কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মাছের সংকট ও বাড়তি দামের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক ক্রেতাকেই ইলিশ কেনার ক্ষেত্রে হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে।

তবে আগামী দিনগুলোতে নদীতে ইলিশের সরবরাহ বাড়বে বলে আশাবাদী মৎস্য বিভাগ। ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো.দেলোয়ার হোসেন বলেন, বৃষ্টির পরিমাণ বাড়লে এবং আগামী পূর্ণিমার জো এলে নদীতে বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে বলেও প্রত্যাশা করছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, এ বছর জাটকা সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

এর ফলে ভোলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে ফিরেছে জেলেদের নৌকা, ঘাটে ফিরেছে বেচাকেনার ব্যস্ততা। কিন্তু জালে পর্যাপ্ত ইলিশ না মেলায় সেই ব্যস্ততার আড়ালে রয়ে গেছে জীবিকার অনিশ্চয়তা। এখন জেলেদের অপেক্ষা পূর্ণিমার জো ও বৃষ্টির সঙ্গে নদীতে ফিরবে কাঙ্খিত ইলিশ, স্বস্তি ফিরবে তাদের সংসারেও।

The post নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও ভোলার নদীতে ইলিশ সংকট কাটেনি appeared first on Bangladesh Diplomat | বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাট.

Source - bangladeshdiplomat.com ↗