দেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশদূষণ কমাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতেই ভূমিকা রাখছে না, বরং প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল সমন্বয় ও আর্থিক সুবিধা পাওয়ারও সুযোগ তৈরি করছে।
এমন সম্ভাবনা ও আধুনিক প্রযুক্তির নানা দিক তুলে ধরতে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬। ৩ নভেম্বর শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭টায় শেষ হয়। এক্সপোতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে বসে অসংখ্য স্টল। সেখানে প্রদর্শিত হয় সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণব্যবস্থাসহ সৌরবিদ্যুতের নানা প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম।
সৌরবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়ে আয়ের সুযোগ

দর্শনার্থীরা এসব প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পণ্য, দাম ও সেবা সম্পর্কে ধারণা নেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি এটি বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
বিশেষ করে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও কৃষি খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থার উপর চাপ কমানো সম্ভব। এক্সপোতে অংশ নেওয়া সৌর প্যানেল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যবহার আগের তুলনায় সহজ হচ্ছে। বাড়ির ছাদ কিংবা প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত জায়গায় সৌর প্যানেল স্থাপন করে নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব।
এতে প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা ও বিদ্যুৎ বিল কমানোর সুযোগ রয়েছে। তাঁদের মতে, কোনো গ্রাহক নিজের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে নির্ধারিত নীতিমালা ও নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রযোজ্য ব্যবস্থায় আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সৌরবিদ্যুতে সাশ্রয় ও গ্রিডে সংযোগের সুযোগ ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন ডিভিশনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মহিউদ্দিন মুস্তফা কামাল বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকের নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব। এতে প্রচলিত বিদ্যুতের উপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয় হয়।
বিশেষ করে বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করলে অব্যবহৃত জায়গাকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো যায়। তিনি বলেন, নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহক প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন। এতে গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে এ সুবিধা পেতে নির্ধারিত কারিগরি শর্ত, সংযোগপ্রক্রিয়া ও নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।
একটি বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প প্রযুক্তি নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয় ও বিনিয়োগের একটি সম্ভাবনাময় খাত। আধুনিক সৌর প্যানেল, উন্নতমানের ইনভার্টার ও ব্যাটারি ব্যবহারের মাধ্যমে বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব।
এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সহায়তার পাশাপাশি পরিবেশের উপর চাপও কমবে। উপকূলীয় অঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব এক্সপো পরিদর্শনকালে ECOVA Foundation-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মতিন সাগর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে উপকূলের প্রত্যন্ত এলাকায় কৃষি সেচ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। সৌরবিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতেও সহায়তা করতে পারে।
কৃষি ও গ্রামীণ জীবিকার সঙ্গে সৌরপ্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। মতিন সাগর আরও বলেন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে উপকূলীয় ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে সাশ্রয়ী সৌরপ্রযুক্তি পৌঁছে দিতে সহজ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
এতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রসারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে শুধু প্রযুক্তি আমদানি বা বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, সহজ অর্থায়ন, মানসম্মত প্রযুক্তি নিশ্চিত করা এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তাও প্রয়োজন।
পাশাপাশি নেট মিটারিং ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করা গেলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহ বাড়তে পারে। সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটলে একদিকে যেমন বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ সোলার এক্সপোর মতো আয়োজন এ খাতের উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করছে।
The post সৌরবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা: অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়ে আয়ের সুযোগ appeared first on Bangladesh Diplomat | বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাট.
Source - bangladeshdiplomat.com ↗