বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা, কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ, পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং বেসামরিক স্থাপনায় প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
এসব সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা। কৃষ্ণসাগরে হামলা, খাদ্যসংকটের আশঙ্কা : কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সামুদ্রিক সংঘাত বাড়তে থাকায় বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সতর্ক করে বলেছেন, কৃষ্ণসাগরে হামলা সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করছে এবং এর ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।
বার্লিনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর মের্ৎস বলেন, শীতের আগে ইউক্রেনকে অতিরিক্ত সহায়তা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে জার্মানি। তার মতে, কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যিক নৌপথে হামলার কারণে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শস্য ও তেল রপ্তানির জন্য কৃষ্ণসাগর রাশিয়া ও ইউক্রেনÑ উভয় দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধের আঁচ বিশ্বজুড়ে, তীব্র হচ্ছে খাদ্যসংকটের শঙ্কা

কিন্তু জাহাজে হামলা বেড়ে যাওয়ায় এই বাণিজ্যপথে চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ন্যাটোর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ : কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলা ন্যাটোর সদস্য রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের সন্দেহ, সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তবে মস্কো এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
গত কয়েক মাসে কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরে শত শত জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার পর ন্যাটো সামুদ্রিক টহল বিমান, রাডার ও চালকবিহীন আকাশযান মোতায়েনের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার মাধ্যমে রাশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার সীমা পরীক্ষা করছে।
ন্যাটোর এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইউক্রেনকে মিত্রদের সহায়তা বন্ধ করতে চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে জোটের সদস্যদের নিরাপত্তা রক্ষায় ন্যাটো অঙ্গীকারবদ্ধ। ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা, শীত নিয়ে শঙ্কা : শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে রাশিয়ার হামলা জোরদার হয়েছে। কিয়েভ ও ঝিতোমির অঞ্চলের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার কথা জানিয়েছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া পোলতাভা, দিনিপ্রো, কিরোভোহরাদ ও রিভনে অঞ্চলেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের হামলায় ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। রাজধানী কিয়েভেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জাপোরিঝিয়া প্রদেশের কোমাইশুভাখা গ্রামের একটি বিদ্যালয় ভবনে রুশ হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত এবং ৫০ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর জানিয়েছে ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ।
ভবনটি তখন বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল না; বরং বেসামরিক মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র ও মানবিক সহায়তা বিতরণের স্থান ছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন জানিয়েছে, হামলার সময় সেখানে বেসামরিক মানুষ সহায়তা নিতে জড়ো হয়েছিল। মিশনের প্রধান ড্যানিয়েল বেল হামলাটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করে থাকতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, রাশিয়া ও চীনের সতর্কবার্তা : পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির বিরোধিতা করেছে রাশিয়া ও চীন। দুই দেশই সামরিক সংঘাত এড়িয়ে সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা হুমকি বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইও ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যপথ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে তেল ও গ্যাসের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানিনির্ভর দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের সদর দপ্তর স্থানান্তরের প্রস্তাব : এদিকে জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্ক থেকে রাশিয়ার সোচি শহরে স্থানান্তরের প্রস্তাব বহাল রাখার কথা জানিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কিরিল লগভিনভ বলেছেন, স্বাগতিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পালনের বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছিল।
তবে সদর দপ্তর স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়ের মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে স্বীকার করেছে রাশিয়া। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সীমিত। সংঘাতের অবসানে কূটনীতির প্রয়োজন : ইউক্রেন যুদ্ধ ও পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা বিশ্বকে নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বাণিজ্যপথে হামলা, জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা আরও বিঘিœত হতে পারে। তাই যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে সংলাপ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়ে বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
The post যুদ্ধের আঁচ বিশ্বজুড়ে, তীব্র হচ্ছে খাদ্যসংকটের শঙ্কা appeared first on Bangladesh Diplomat | বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাট.
Source - bangladeshdiplomat.com ↗