Bangladesh · 2026-11-05 14:50:09

খুলনা অঞ্চলের চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্য

খুলনা অঞ্চলের চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্য
খুলনার বড় বাজারের মসলাপট্টিতে ঢুকলেই মরিচ-হলুদের ভিড়ে নাকে আসে চুইঝালের ঝাঁজালো ঘ্রাণ। রান্নাঘরের এই স্বতন্ত্র মসলা আসলে মরিচজাতীয় কোনো উদ্ভিদ নয়, এটি পানের নিকটাত্মীয়। পর্তুগিজদের হাত ধরে এ দেশে মরিচ আসার আগে উপমহাদেশের রান্নায় ঝাঁজ আনতে যেসব স্থানীয় মসলা ব্যবহৃত হতো, চুইঝাল তার অন্যতম। একসময় অবিভক্ত বাংলার রান্নায় এর ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও কালের বিবর্তনে তা কেবল বৃহত্তর খুলনা ও যশোর অঞ্চলের মানুষের বসতবাড়ির আঙিনায় টিকে ছিল।
গরু, খাসি কিংবা হাঁসের মাংস রান্নায় চুইঝালের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। লোকজ চিকিৎসায় গ্যাস্ট্রিক, কোষ্ঠকাঠিন্য, সর্দি-কাশি ও হজমের গোলমাল উপশমে এর ব্যবহার দীর্ঘদিনের। এটি ক্ষুধামান্দ্য দূর করে এবং স্নায়বিক উত্তেজনা কমায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ ও ২০২২ সালের একাধিক গবেষণায় চুইয়ের নির্যাসে জীবাণুনাশক, ব্যথানাশক, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট ও ক্যানসার-কোষ প্রতিরোধী উপাদানের প্রমাণ মিলেছে।
প্রতিদিন ১০–১৫ লাখ টাকার কেনাবেচা
খুলনার বড় বাজারে শুধু চুই বিক্রি করে—এমন দোকান আছে অন্তত ১৫টি। এর বাইরে অন্যান্য মসলার দোকানেও মেলে চুই। সব মিলিয়ে বড় বাজারে প্রতিদিন এক হাজার কেজির বেশি চুইঝাল বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য ১০–১৫ লাখ টাকা। গত কয়েক দশকে চুইয়ের চাহিদা যেমন বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দামও। চুই বিক্রেতা অমল বিশ্বাস জানান, তিন বছর আগেও চাষির কাছ থেকে ৮০০ টাকা কেজিতে কেনা চুই এখন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তবে ন্যূনতম ৬০০ টাকা থেকে ভালো মানের মূল বা শিকড় বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি। অথচ আশির দশকে প্রতি কেজি চুই মাত্র ২ টাকায় বিক্রি হতো বলে জানান প্রবীণ ক্রেতা অবনীন্দ্রনাথ কুমার।
শখের লতা এখন বাণিজ্যিক ফসল
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চুইঝালের উৎপাদন ৬০০ টনের বেশি। গত ছয় বছরে এর উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। কেজিপ্রতি গড় দাম ১ হাজার ২০০ টাকা ধরলে চুইঝালের বর্তমান বাজারের আকার ৭০ কোটি টাকার বেশি। এ হিসাবের বাইরেও আরও চাষ ও বিক্রি আছে। স্থানীয় লোকজন জানান, এই কৃষিপণ্যের বাজার বাস্তবে প্রায় শতকোটি টাকা।
আগে কৃষকদের আগ্রহ কম থাকলেও এখন দাম ও চাহিদা বাড়ায় আম, কাঁঠাল বা মেহগনিগাছকে আশ্রয় করে সাথি ফসল হিসেবে চুইয়ের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ছে। খুলনার নার্সারিগুলোতে চারা বিক্রির পরিমাণ কয়েক বছরে ২-৩ হাজার থেকে বেড়ে ৫০-৬০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বৃহত্তর খুলনার গণ্ডি পেরিয়ে কুড়িগ্রাম, ফরিদপুর ও ঝিনাইদহেও এখন বাণিজ্যিকভাবে চুইয়ের আবাদ হচ্ছে।
ভোজনরসিকদের পছন্দ চুই-মাংস
চুইঝালের অনন্য স্বাদ নিতে খুলনার বড় বাজারসংলগ্ন খাবার হোটেলগুলোতে ভিড় জমান ভোজনরসিকেরা। বিশেষ করে রেলস্টেশনের কাছের ‘হোটেল জাবেদ’-এ চুই দিয়ে রান্না করা গরুর মাংসের দারুণ কদর রয়েছে। প্রতিদিন দুপুরে সেখানে দেড় থেকে দুই মণ চুই-মাংস বিক্রি হয়, খেতে বসতে ক্রেতাদের রীতিমতো লাইনে দাঁড়াতে হয়।
জিআই স্বীকৃতির হাতছানি
চুইঝাল এখন আর কেবল আঞ্চলিক রান্নার উপকরণ নয়, এটি সম্ভাবনাময় এক অর্থনৈতিক সম্পদ। ২০২৪ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য যে ১৫১টি জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের তালিকা প্রস্তুত করেছে, তাতে খুলনার চুইঝাল অন্যতম।

Source - www.prothomalo.com ↗