প্রেসিডেন্ট হওয়ামাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশ আর জাস্টিন ট্রুডোকে গভর্নর ট্রুডো বলতে শুরু করলেন। কানাডীয়রা প্রথমে ভেবেছিলেন সাময়িক পাগলামো বা ঠাট্টা-মশকরা। ট্রুডো প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়লেন, নতুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন মার্ক কার্নি। ট্রাম্প বদলালেন না। কানাডাকে ৫১তম প্রদেশ করার সম্প্রসারণবাদী মনোভাব আসলে তাঁর মগজে বদ্ধমূল হয়ে গেঁড়ে বসেছে, দ্রুতই কানাডীয়রা সত্যটি বুঝতে শুরু করলেন। কারণ, ট্রাম্প কানাডাকে নিয়ে নিত্যদিনের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও হেয় করা বাড়িয়ে দিলেন।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে, সবকিছু নিয়ে যাচ্ছে, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পাচ্ছে সামান্যই ইত্যাদি অভিযোগ তো ছিলই! নতুনভাবে যোগ হলো যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে গেলে কানাডার কত লাভ—সেসবের বয়ান-ফিরিস্তি। হোয়াইট হাউসে মার্ক কার্নির সঙ্গে সাক্ষাতেও ট্রাম্প নিরস্ত্র হলেন না। একই বয়ান শুনে নিতান্ত ভদ্রলোক কার্নি মৃদু হেসে বলেছিলেন, হোয়াইট হাউস যেমন ‘নট ফর সেল’, কানাডাও তেমনই ‘নট ফর সেল’।
ট্রাম্পের ভূমিধস বিপর্যয়ের পেছনে কেন কানাডার নাম আসছে

কানাডা কি সত্যিই ‘আমেরিকার ৫১তম অঙ্গরাজ্য’নর্থ ডেকোটায় যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি, সহকর্মীদের প্রায় শতভাগই মার্কিন নাগরিক। লবিতে দেখাসাক্ষাৎ হলে পরিচিতজন সলজ্জ ‘স্যরি’ বলে আলাপ শুরু করতেন। জানাতেন ট্রাম্পের কানাডাকে অসম্মান তাঁদের কতটা লজ্জিত, বিব্রত ও বিরক্ত করে। আমিসহ তাঁদের মাত্র দুজন সহকর্মী নাগরিকত্বে কানাডীয়। তাঁরা মনে করিয়ে দিতেন কানাডাকে মার্কিন নাগরিকেরা প্রশংসার চোখে দেখেন, ট্রাম্পের আচরণে আমরা যেন মন খারাপ না করি, নিজেদের বহিরাগত না ভাবি।
নির্বাচন শেষ। রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবির নানা রকম বিশ্লেষণ চলছে। ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, অর্থনীতির বেহাল অবস্থা, ট্রাম্পের জিতে আসার পেছনের প্রতিশ্রুতিগুলো ভঙ্গ করা ইত্যাদি কারণ দেখানো হবে। কিন্তু আরেকটি সত্য ততটা আলোচিত হবে না। সত্যটি হচ্ছে, ট্রাম্পের কানাডা-নীতিও রিপাবলিকানদের পরাজয়ে রসদ জুগিয়েছে।
কানাডার কোনো পরিকল্পিত হস্তক্ষেপে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা ভুক্তভোগী হয়েছে ট্রাম্পের কানাডা-নীতির কুফলেই। বেশির ভাগ ভুক্তভোগীই আবার রিপাবলিকানদের ঘাঁটি নামে পরিচিত রাজ্যগুলোর বাসিন্দা, বিশেষত গ্রামাঞ্চলের কৃষিজীবী।
ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রতিবাদে কানাডার ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্রের মদসহ পণ্য আমদানি বন্ধ করে দেয়দুই.
ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় কানাডীয়রা নিজ দায়িত্বে ‘অসহযোগ’ শুরু করে দিয়েছিল।
ছুটিছাটা বা হাতে সময় মিললেই কানাডীয়রা ঘুরতে যেতেন যুক্তরাষ্ট্রে। বিশেষত, নিজেদের কাছাকাছি রাজ্যগুলোয়। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ বন্ধ করে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে নিলেন। কানাডার পর্যটননির্ভর সীমান্তবতী রাজ্যগুলোর পর্যটন আয়ে রীতিমতো ধস নামল। হোটেল-মোটেল ফাঁকা। এমনকি ডিজনিল্যান্ডের বিলিয়ন ডলারের উপার্জনও হুমকির মুখে পড়তে শুরু করল।
এ বছরের সেপ্টেম্বরে কানাডীয়দের মার্কিন সফর ২০২৪ সালের তুলনায় ২৯ শতাংশ কম ছিল। মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণা মোবাইল ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে যে মার্কিন মেট্রো এলাকায় কানাডীয়দের ভ্রমণ বছরওয়ারি প্রায় ৪২ শতাংশ কমেছে, যা সরকারি সীমান্ত পরিসংখ্যানে দেখানো প্রায় ২৫ শতাংশ পতনের চেয়ে অনেক বেশি। মার্কিন ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের আগের হিসাব ছিল যে কানাডীয় পর্যটন মাত্র ১০ শতাংশ কমলেই ১ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন চাকরি হারাবে এবং ২.১ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় ক্ষতি হবে। ১০ শতাংশে যদি এই ক্ষতি হয়, ৩০-৪০ শতাংশে কী হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। কানাডার ঘাড়ে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর পরিণতি উল্টো বিপদে ফেলল সীমান্তবর্তী কৃষি সমাজকে। সার, বীজ, কীটনাশক উৎপাদনের গ্যাস, কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী, স্টিল, কাঠ সব নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলো। মেপল সিরাপ থেকে হকিস্টিক বা সিমেন্ট পর্যন্ত যত পণ্যের ওপর মার্কিনিদের নির্ভরতা ছিল, সবই বাধাগ্রস্ত হলো।আপস্টেট নিউইয়র্ক, মিশিগানের আপার পেনিনসুলা এবং অন্যান্য প্রবেশদ্বার অঞ্চলের শহরগুলো খুচরা বিক্রি, আতিথেয়তা ও জ্বালানি কেনাকাটার জন্য কানাডীয় দিন ভ্রমণকারীদের ওপর নির্ভর করে। নায়াগ্রা নদীর তীরে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের শহর লুইস্টন, নিউইয়র্ক, যার ঠিক ওপারে অন্টারিওর নায়াগ্রা-অন-দ্য-লেক, সেখানকার ছোট ব্যবসায়ীরা এখন খালি দোকানে বসে থাকেন।
নিউ ইংল্যান্ডের পাহাড়ি শহরগুলোয়ও একই চিত্র। নিউ হ্যাম্পশায়ারের পাহাড়ি শহরগুলোয় কানাডীয় পর্যটন ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমেছিল, আর ভারমন্ট হারিয়েছে কোটি কোটি ডলারের রাজস্ব।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহলের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার কানাডা। শুল্ক ঘোষণার প্রথম দিনেই সব কটি লিকার স্টোর তাক থেকে নামিয়ে ফেলল মার্কিন লিকার। আমদানি বন্ধ করে দিল। দেখাদেখি অন্যসব ‘মেইড ইন আমেরিকা’ লেখা ভোগ্যপণ্য কেনাও বন্ধ করা শুরু হলো। এর সবই ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের স্বাভাবিক নাগরিক উদ্যোগ। পরিকল্পিত বিধিনিষেধ নয়।
কানাডার পাশে কেন ইউরোপকে দাঁড়াতেই হবেতিন.
ব্যক্তিগত এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের ভূমিকার বাইরে কেন্দ্রীয়ভাবে কানাডার পাল্টা আঘাত ছিল সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিত। কানাডীয় কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সেই রাজ্যগুলোর পণ্য, ভোক্তা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিয়েছেন, যেগুলোয় সাধারণত রিপাবলিকান ভোটার বেশি, অথবা ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানদের হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনী লড়াই হয়। ট্রাম্প কানাডার পণ্য ও সেবায় ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করার পর সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নির্দিষ্ট মার্কিন রাজ্যকে লক্ষ্য করে পাল্টা শুল্ক দেন। জবাবে ট্রাম্প দ্বিতীয় দফা শুল্ক বসান।
২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডাকে প্রকাশ্যে ‘৫১তম রাজ্য’ বলতে শুরু করেন এবং কানাডার পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক বসান। কানাডীয়রা বিষয়টিকে নিছক বাণিজ্যনীতি হিসেবে দেখেননি। দেখেছেন সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি, আগ্রাসী উপনিবেশবাদ এবং বন্ধুর বা প্রতিবেশীর সঙ্গে বেইমানি হিসেবে।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের আমদানিতে ৫০ শতাংশ শুল্কের মার্কিন হুমকির পর অটোয়া ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসে। হিসাব কষে দেখিয়ে দেয় শুল্কের পরিণতিতে মার্কিন অর্থনীতিও সমান-সমান বিপর্যস্ত হবে। ট্রাম্পের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমলে নিল না হিসাবটি। কানাডাও বাধ্য হয়ে ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক বসায়।
ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার ওপর গেম থিওরি প্রয়োগ করতে গিয়েছিল। হিসাব ছিল—বড় অর্থনীতি ছোট অর্থনীতিকে চাপে রাখলে ছোট অর্থনীতি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। কানাডার ঘাড়ে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর পরিণতি উল্টো বিপদে ফেলল সীমান্তবর্তী কৃষি সমাজকে। সার, বীজ, কীটনাশক উৎপাদনের গ্যাস, কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী, স্টিল, কাঠ সব নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলো। মেপল সিরাপ থেকে হকিস্টিক বা সিমেন্ট পর্যন্ত যত পণ্যের ওপর মার্কিনিদের নির্ভরতা ছিল, সবই বাধাগ্রস্ত হলো।
আসলে কানাডা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিই করে বেশি। পরিমাণ মোট আমদানির প্রায় ৭৫ ভাগ। আটলান্টিক কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, কানাডা মিশিগানের ক্র্যাফট পেপার রপ্তানির শতভাগ, আলাবামার ওভেন রপ্তানির ৯৫ শতাংশ এবং উইসকনসিনের ব্লু চিজ রপ্তানির ৮৮ শতাংশ কেনে। টয়লেট পেপারের মতো তুচ্ছ পণ্যও কিনত। মার্ক কার্নি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ। জানতেন মার্কিনদেরই হার মানতে হবে। কানাডা আমদানিতে রাশ টানায় কানাডার বাজারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল মার্কিন উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের অস্বাভাবিক বিপদে পড়তে হয়েছিল।
ট্রাম্পের কাছে গ্রিনল্যান্ড কেন এত গুরুত্বপূর্ণগ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেনকে এক সুতায় বাঁধল কে এবারের শুল্কযুদ্ধে কানাডার রণকৌশলকে অনেক দেশই শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে নেবে। বাংলাদেশের জন্যও খানিকটা শিক্ষণীয় রয়েছে, বিশেষত আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োগের বেলায়।উত্তর আমেরিকার গাড়িশিল্প বিকশিত হয়েছে মিশিগান ও কানাডার অন্টারিও প্রদেশের যৌথতার মাধ্যমে। একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ পূর্ণাঙ্গ গাড়ি হওয়ার আগে ডেট্রয়েট-উইন্ডসর সীমান্ত বহুবার পার হয়। গ্লোবাল নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী মিশিগান ও অন্টারিওর গাড়ি ও ইস্পাত উৎপাদনের সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙার নয়। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ সীমান্তের দুই পাশেই শিল্পটিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
মিশিগানের ক্ষতির পরিমাণ অবিশ্বাস্য। সিটিভির মার্কিন রাজনীতি বিশ্লেষক এরিক হ্যাম জানিয়েছেন, মিশিগানে পরিবারগুলোর জন্য শুল্কের খরচ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ডলার, যেখানে দেশের বাকি অংশে তা ছিল ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ ডলারের মতো। অর্থাৎ সীমান্তের কাছে থাকার অপরাধে মিশিগানের একটি পরিবার জাতীয় গড়ের তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি ‘শাস্তি’ পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সীমান্ততাই, দেশজুড়ে ভোটাররা দায়ী করেছেন ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে। বিশেষভাবে দায়ী করছেন কানাডার ওপর মাত্রাছাড়া শুল্ক আরোপকে। নির্বাচনের দু–এক দিন আগের জরিপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক কানাডার ওপর শুল্কের বিরোধী। তাঁদের ৬৪ শতাংশই স্বতন্ত্র ভোটার। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার বলেছেন, তাঁর নীতি অর্থনীতিকে খারাপ করেছে, আর তাঁদের প্রায় ১০ জনে ৮ জন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
কানাডা সীমান্তের যে ৩৩টি রাজ্যে সিনেট নির্বাচন হয়েছে, তার ২০টিতে ডেমোক্র্যাটরা জিতেছেন। ৫টি রাজ্য কানাডার সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত–ভাগাভাগি করা। আলাস্কা ছাড়া কানাডা-সংলগ্ন প্রতিটি রাজ্যেই দলটি প্রতিনিধি পরিষদের আসন জিতেছে।
ইতিহাসের ট্রাম্প-অধ্যায় শেষ হতে চলেছে, ইরান যুদ্ধের কী হবেঅবশেষে ট্রাম্পবাদের মরণঘণ্টা বাজল চার.
নির্বাচনের ঠিক আগে মার্কিন প্রশাসন টের পায় তারাই সমস্যা পাকিয়েছে, এবং পরিণতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এবার পিছু হটতে শুরু করে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে প্রশাসন প্লাইউড, কাগজজাত পণ্য, যন্ত্রপাতি ও রেফ্রিজারেশন সরঞ্জামসহ কিছু কানাডীয় আমদানিতে শুল্কছাড় ঘোষণা করে, যদিও একই সঙ্গে অন্য কিছু পণ্যে নতুন শুল্কও বসায়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণ এই মুহূর্তটিকে চমৎকারভাবে ধরেছে, ‘দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রই পিছু হটছে। যেসব শুল্ক অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ক্ষতি করছিল, সেগুলো প্রত্যাহার করছে। উত্তরের সীমান্ত রাজ্যগুলো কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সেগুলোয় গণসমর্থন হারিয়ে রিপাবলিকানরা কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়েছেন।
মিশিগানের রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্স নিজেই এক বিজ্ঞাপনে বলেন, ‘কানাডা ইজ নট আওয়ার এনিমি।’ যদিও মাস কয়েক আগে তিনি বাণিজ্যযুদ্ধটি সমর্থন করেছিলেন।
ইতিমধ্যে দেরি হয়ে গেছে। ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের পর কানাডার সীমান্তবর্তী মিশিগানে নির্বাচনী রাতের সমাবেশে প্রতিক্রিয়া জানান ডেমোক্রেটিক সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। ৪ নভেম্বর ২০২৬ কানাডা ওহাইওর সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, যেখানে রাজ্যটি ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পাঠায়, যা তার মোট রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এরিক হ্যামের হিসাবে কানাডার পাল্টা শুল্ক ওহাইওর ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি করেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের হিসাবে নর্থ ডাকোটা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, রাজ্যটির রপ্তানির ৮১ শতাংশ যায় কানাডায়। শুধু রপ্তানি নয়, আমদানিও: নর্থ ডাকোটা উৎপাদকদের জন্য ইস্পাত এবং কৃষকদের জন্য সার, জ্বালানি ও রাসায়নিকের মতো সরবরাহের জন্য কানাডার আমদানির ওপর নির্ভর করে। পাশের মিনেসোটায় মিনেসোটা ফার্মার্স ইউনিয়নের প্রধান গ্যারি ওয়ার্টিশ জানিয়েছেন, আগের তিন বছরে সম্মিলিতভাবে যতটা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন, শুধু এই এক বছরে তার চেয়ে বেশি কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়েছেন।
অর্থনীতির ‘ট্যাক্স ইনসিডেন্স’ বা ‘করের প্রকৃত বোঝা’ ধারণা থেকেই আমরা জানি শুল্ক কাগজে-কলমে বিদেশি পণ্যের ওপর বসে। কিন্তু মূল্য চোকায় দেশীয় আমদানিকারক। তারা খরচ ও লাভ তোলে ক্রেতার ঘাড়ে পণ্যের বাড়তি দাম চাপিয়ে দিয়ে। ২০১৮-১৯ সালের মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে অর্থনীতিবিদ মেরি অ্যামিতি, স্টিফেন রেডিং ও ডেভিড ওয়াইনস্টাইনের গবেষণাটিও দেখিয়েছিল যে শুল্কের প্রায় পুরো বোঝাই মার্কিন ভোক্তা ও কোম্পানির ঘাড়ে পড়েছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার ওপর গেম থিওরি প্রয়োগ করতে গিয়েছিল। হিসাব ছিল—বড় অর্থনীতি ছোট অর্থনীতিকে চাপে রাখলে ছোট অর্থনীতি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কাউন্সিল অব ফরেইন রিলেশনস ‘কানাডা শৌস দা লিমিটস অব ট্রাম্পস হার্ডবল ট্রেড ট্র্যাকট্রিস’ নিবন্ধে যথার্থই দেখায় ট্রাম্পের কানাডা-নীতি ভুল।কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের একগুঁয়েমির কারণে কানাডার পাল্টা শুল্কের চাপে কানাডা থেকে আমদানি করা অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের উচ্চমূল্য মার্কিন ভোক্তাদেরই জীবন-জীবিকার ওপর চাপ তৈরি করে বসেছে। ডাচ অর্থনীতিবিদ ইয়ান টিনবার্গেনের ‘গ্র্যাভিটি মডেল’ নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের আদলে এ রকম বাণিজ্য-সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিয়েই রেখেছিল যে দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য তাদের অর্থনীতির আকারের সমানুপাতিক এবং দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক।
এই সূত্রে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য-সম্পর্ক প্রায় অনিবার্য-অবিচ্ছেদ্য ও একক সত্তার মতো। বিশাল দুটি অর্থনীতি, পৃথিবীর দীর্ঘতম অরক্ষিত সীমান্ত। মহাকর্ষকে যেমন আইন করে বাতিল করা যায় না; জোর করে টানলে সুতা যেমন ছিঁড়ে যায়, কানাডাকে ধরাশায়ী ও দুর্বল করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উল্টো স্বদেশের ভোক্তাদের জীবনযাত্রাতেই নাভিশ্বাস তুলে দেয়।
আরও আগের শুল্ক ব্যবস্থাপনার আলোকে ২০১৮ সালে অর্থনীতিবিদ থিমো ফেটজার ও কার্লো শোয়ার্জ দেখিয়েছিলেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও কানাডা তাদের পাল্টা শুল্ক এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে তা রিপাবলিকান-ঝোঁকা ও দোলাচলের এলাকাগুলোয় সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। ২০২৬ সালে কানাডা এই কৌশলটি সরাসরিই প্রয়োগ করেছে।
ট্রাম্পের সমালোচনায় ওবামার পাশে কেন প্রগতিশীলেরামধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলেও কি ট্রাম্পের তাণ্ডব থামবে ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার ওপর গেম থিওরি প্রয়োগ করতে গিয়েছিল। হিসাব ছিল—বড় অর্থনীতি ছোট অর্থনীতিকে চাপে রাখলে ছোট অর্থনীতি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কাউন্সিল অব ফরেইন রিলেশনস ‘কানাডা শৌস দা লিমিটস অব ট্রাম্পস হার্ডবল ট্রেড ট্র্যাকট্রিস’ নিবন্ধে যথার্থই দেখায় ট্রাম্পের কানাডা-নীতি ভুল।
দর-কষাকষিতে শক্তির চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলো কে বেশি কষ্ট সহ্য করতে রাজি এবং কার ঘরে রাজনৈতিক চাপ বেশি। ছোট অর্থনীতির ভালোভাবে টিকে থাকার আরেকটি কৌশল হতে হয় সবল অর্থনীতির দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে আঘাত হানা। নির্বাচনী ভোটের হিসাব-নিকাশে মার্কিন সীমান্ত রাজ্যগুলোই ওয়াশিংটনের দুর্বল জায়গা। কানাডা ঠিক সেই সব দুর্বল জায়গাতেই তার বাণিজ্য-কৌশল প্রয়োগ করেছে।
এবারের শুল্কযুদ্ধে কানাডার রণকৌশলকে অনেক দেশই শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে নেবে। বাংলাদেশের জন্যও খানিকটা শিক্ষণীয় রয়েছে, বিশেষত আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োগের বেলায়।
হেলাল মহিউদ্দীন শিক্ষক, লিবারেল আর্টস, ম্যেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ডেকোটা, যুক্তরাষ্ট্র
* মতামত লেখকের নিজস্ব
নির্বাচন শেষ। রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবির নানা রকম বিশ্লেষণ চলছে। ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, অর্থনীতির বেহাল অবস্থা, ট্রাম্পের জিতে আসার পেছনের প্রতিশ্রুতিগুলো ভঙ্গ করা ইত্যাদি কারণ দেখানো হবে। কিন্তু আরেকটি সত্য ততটা আলোচিত হবে না। সত্যটি হচ্ছে, ট্রাম্পের কানাডা-নীতিও রিপাবলিকানদের পরাজয়ে রসদ জুগিয়েছে।
কানাডার কোনো পরিকল্পিত হস্তক্ষেপে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা ভুক্তভোগী হয়েছে ট্রাম্পের কানাডা-নীতির কুফলেই। বেশির ভাগ ভুক্তভোগীই আবার রিপাবলিকানদের ঘাঁটি নামে পরিচিত রাজ্যগুলোর বাসিন্দা, বিশেষত গ্রামাঞ্চলের কৃষিজীবী।
ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রতিবাদে কানাডার ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্রের মদসহ পণ্য আমদানি বন্ধ করে দেয়দুই.
ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় কানাডীয়রা নিজ দায়িত্বে ‘অসহযোগ’ শুরু করে দিয়েছিল।
ছুটিছাটা বা হাতে সময় মিললেই কানাডীয়রা ঘুরতে যেতেন যুক্তরাষ্ট্রে। বিশেষত, নিজেদের কাছাকাছি রাজ্যগুলোয়। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ বন্ধ করে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে নিলেন। কানাডার পর্যটননির্ভর সীমান্তবতী রাজ্যগুলোর পর্যটন আয়ে রীতিমতো ধস নামল। হোটেল-মোটেল ফাঁকা। এমনকি ডিজনিল্যান্ডের বিলিয়ন ডলারের উপার্জনও হুমকির মুখে পড়তে শুরু করল।
এ বছরের সেপ্টেম্বরে কানাডীয়দের মার্কিন সফর ২০২৪ সালের তুলনায় ২৯ শতাংশ কম ছিল। মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণা মোবাইল ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে যে মার্কিন মেট্রো এলাকায় কানাডীয়দের ভ্রমণ বছরওয়ারি প্রায় ৪২ শতাংশ কমেছে, যা সরকারি সীমান্ত পরিসংখ্যানে দেখানো প্রায় ২৫ শতাংশ পতনের চেয়ে অনেক বেশি। মার্কিন ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের আগের হিসাব ছিল যে কানাডীয় পর্যটন মাত্র ১০ শতাংশ কমলেই ১ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন চাকরি হারাবে এবং ২.১ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় ক্ষতি হবে। ১০ শতাংশে যদি এই ক্ষতি হয়, ৩০-৪০ শতাংশে কী হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। কানাডার ঘাড়ে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর পরিণতি উল্টো বিপদে ফেলল সীমান্তবর্তী কৃষি সমাজকে। সার, বীজ, কীটনাশক উৎপাদনের গ্যাস, কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী, স্টিল, কাঠ সব নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলো। মেপল সিরাপ থেকে হকিস্টিক বা সিমেন্ট পর্যন্ত যত পণ্যের ওপর মার্কিনিদের নির্ভরতা ছিল, সবই বাধাগ্রস্ত হলো।আপস্টেট নিউইয়র্ক, মিশিগানের আপার পেনিনসুলা এবং অন্যান্য প্রবেশদ্বার অঞ্চলের শহরগুলো খুচরা বিক্রি, আতিথেয়তা ও জ্বালানি কেনাকাটার জন্য কানাডীয় দিন ভ্রমণকারীদের ওপর নির্ভর করে। নায়াগ্রা নদীর তীরে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের শহর লুইস্টন, নিউইয়র্ক, যার ঠিক ওপারে অন্টারিওর নায়াগ্রা-অন-দ্য-লেক, সেখানকার ছোট ব্যবসায়ীরা এখন খালি দোকানে বসে থাকেন।
নিউ ইংল্যান্ডের পাহাড়ি শহরগুলোয়ও একই চিত্র। নিউ হ্যাম্পশায়ারের পাহাড়ি শহরগুলোয় কানাডীয় পর্যটন ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমেছিল, আর ভারমন্ট হারিয়েছে কোটি কোটি ডলারের রাজস্ব।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহলের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার কানাডা। শুল্ক ঘোষণার প্রথম দিনেই সব কটি লিকার স্টোর তাক থেকে নামিয়ে ফেলল মার্কিন লিকার। আমদানি বন্ধ করে দিল। দেখাদেখি অন্যসব ‘মেইড ইন আমেরিকা’ লেখা ভোগ্যপণ্য কেনাও বন্ধ করা শুরু হলো। এর সবই ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের স্বাভাবিক নাগরিক উদ্যোগ। পরিকল্পিত বিধিনিষেধ নয়।
কানাডার পাশে কেন ইউরোপকে দাঁড়াতেই হবেতিন.
ব্যক্তিগত এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের ভূমিকার বাইরে কেন্দ্রীয়ভাবে কানাডার পাল্টা আঘাত ছিল সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিত। কানাডীয় কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সেই রাজ্যগুলোর পণ্য, ভোক্তা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিয়েছেন, যেগুলোয় সাধারণত রিপাবলিকান ভোটার বেশি, অথবা ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানদের হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনী লড়াই হয়। ট্রাম্প কানাডার পণ্য ও সেবায় ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করার পর সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নির্দিষ্ট মার্কিন রাজ্যকে লক্ষ্য করে পাল্টা শুল্ক দেন। জবাবে ট্রাম্প দ্বিতীয় দফা শুল্ক বসান।
২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডাকে প্রকাশ্যে ‘৫১তম রাজ্য’ বলতে শুরু করেন এবং কানাডার পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক বসান। কানাডীয়রা বিষয়টিকে নিছক বাণিজ্যনীতি হিসেবে দেখেননি। দেখেছেন সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি, আগ্রাসী উপনিবেশবাদ এবং বন্ধুর বা প্রতিবেশীর সঙ্গে বেইমানি হিসেবে।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের আমদানিতে ৫০ শতাংশ শুল্কের মার্কিন হুমকির পর অটোয়া ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসে। হিসাব কষে দেখিয়ে দেয় শুল্কের পরিণতিতে মার্কিন অর্থনীতিও সমান-সমান বিপর্যস্ত হবে। ট্রাম্পের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমলে নিল না হিসাবটি। কানাডাও বাধ্য হয়ে ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক বসায়।
ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার ওপর গেম থিওরি প্রয়োগ করতে গিয়েছিল। হিসাব ছিল—বড় অর্থনীতি ছোট অর্থনীতিকে চাপে রাখলে ছোট অর্থনীতি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। কানাডার ঘাড়ে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর পরিণতি উল্টো বিপদে ফেলল সীমান্তবর্তী কৃষি সমাজকে। সার, বীজ, কীটনাশক উৎপাদনের গ্যাস, কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী, স্টিল, কাঠ সব নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলো। মেপল সিরাপ থেকে হকিস্টিক বা সিমেন্ট পর্যন্ত যত পণ্যের ওপর মার্কিনিদের নির্ভরতা ছিল, সবই বাধাগ্রস্ত হলো।
আসলে কানাডা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিই করে বেশি। পরিমাণ মোট আমদানির প্রায় ৭৫ ভাগ। আটলান্টিক কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, কানাডা মিশিগানের ক্র্যাফট পেপার রপ্তানির শতভাগ, আলাবামার ওভেন রপ্তানির ৯৫ শতাংশ এবং উইসকনসিনের ব্লু চিজ রপ্তানির ৮৮ শতাংশ কেনে। টয়লেট পেপারের মতো তুচ্ছ পণ্যও কিনত। মার্ক কার্নি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ। জানতেন মার্কিনদেরই হার মানতে হবে। কানাডা আমদানিতে রাশ টানায় কানাডার বাজারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল মার্কিন উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের অস্বাভাবিক বিপদে পড়তে হয়েছিল।
ট্রাম্পের কাছে গ্রিনল্যান্ড কেন এত গুরুত্বপূর্ণগ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেনকে এক সুতায় বাঁধল কে এবারের শুল্কযুদ্ধে কানাডার রণকৌশলকে অনেক দেশই শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে নেবে। বাংলাদেশের জন্যও খানিকটা শিক্ষণীয় রয়েছে, বিশেষত আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োগের বেলায়।উত্তর আমেরিকার গাড়িশিল্প বিকশিত হয়েছে মিশিগান ও কানাডার অন্টারিও প্রদেশের যৌথতার মাধ্যমে। একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ পূর্ণাঙ্গ গাড়ি হওয়ার আগে ডেট্রয়েট-উইন্ডসর সীমান্ত বহুবার পার হয়। গ্লোবাল নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী মিশিগান ও অন্টারিওর গাড়ি ও ইস্পাত উৎপাদনের সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙার নয়। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ সীমান্তের দুই পাশেই শিল্পটিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
মিশিগানের ক্ষতির পরিমাণ অবিশ্বাস্য। সিটিভির মার্কিন রাজনীতি বিশ্লেষক এরিক হ্যাম জানিয়েছেন, মিশিগানে পরিবারগুলোর জন্য শুল্কের খরচ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ডলার, যেখানে দেশের বাকি অংশে তা ছিল ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ ডলারের মতো। অর্থাৎ সীমান্তের কাছে থাকার অপরাধে মিশিগানের একটি পরিবার জাতীয় গড়ের তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি ‘শাস্তি’ পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সীমান্ততাই, দেশজুড়ে ভোটাররা দায়ী করেছেন ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে। বিশেষভাবে দায়ী করছেন কানাডার ওপর মাত্রাছাড়া শুল্ক আরোপকে। নির্বাচনের দু–এক দিন আগের জরিপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক কানাডার ওপর শুল্কের বিরোধী। তাঁদের ৬৪ শতাংশই স্বতন্ত্র ভোটার। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার বলেছেন, তাঁর নীতি অর্থনীতিকে খারাপ করেছে, আর তাঁদের প্রায় ১০ জনে ৮ জন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
কানাডা সীমান্তের যে ৩৩টি রাজ্যে সিনেট নির্বাচন হয়েছে, তার ২০টিতে ডেমোক্র্যাটরা জিতেছেন। ৫টি রাজ্য কানাডার সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত–ভাগাভাগি করা। আলাস্কা ছাড়া কানাডা-সংলগ্ন প্রতিটি রাজ্যেই দলটি প্রতিনিধি পরিষদের আসন জিতেছে।
ইতিহাসের ট্রাম্প-অধ্যায় শেষ হতে চলেছে, ইরান যুদ্ধের কী হবেঅবশেষে ট্রাম্পবাদের মরণঘণ্টা বাজল চার.
নির্বাচনের ঠিক আগে মার্কিন প্রশাসন টের পায় তারাই সমস্যা পাকিয়েছে, এবং পরিণতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এবার পিছু হটতে শুরু করে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে প্রশাসন প্লাইউড, কাগজজাত পণ্য, যন্ত্রপাতি ও রেফ্রিজারেশন সরঞ্জামসহ কিছু কানাডীয় আমদানিতে শুল্কছাড় ঘোষণা করে, যদিও একই সঙ্গে অন্য কিছু পণ্যে নতুন শুল্কও বসায়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণ এই মুহূর্তটিকে চমৎকারভাবে ধরেছে, ‘দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রই পিছু হটছে। যেসব শুল্ক অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ক্ষতি করছিল, সেগুলো প্রত্যাহার করছে। উত্তরের সীমান্ত রাজ্যগুলো কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সেগুলোয় গণসমর্থন হারিয়ে রিপাবলিকানরা কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়েছেন।
মিশিগানের রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্স নিজেই এক বিজ্ঞাপনে বলেন, ‘কানাডা ইজ নট আওয়ার এনিমি।’ যদিও মাস কয়েক আগে তিনি বাণিজ্যযুদ্ধটি সমর্থন করেছিলেন।
ইতিমধ্যে দেরি হয়ে গেছে। ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের পর কানাডার সীমান্তবর্তী মিশিগানে নির্বাচনী রাতের সমাবেশে প্রতিক্রিয়া জানান ডেমোক্রেটিক সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। ৪ নভেম্বর ২০২৬ কানাডা ওহাইওর সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, যেখানে রাজ্যটি ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পাঠায়, যা তার মোট রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এরিক হ্যামের হিসাবে কানাডার পাল্টা শুল্ক ওহাইওর ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি করেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের হিসাবে নর্থ ডাকোটা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, রাজ্যটির রপ্তানির ৮১ শতাংশ যায় কানাডায়। শুধু রপ্তানি নয়, আমদানিও: নর্থ ডাকোটা উৎপাদকদের জন্য ইস্পাত এবং কৃষকদের জন্য সার, জ্বালানি ও রাসায়নিকের মতো সরবরাহের জন্য কানাডার আমদানির ওপর নির্ভর করে। পাশের মিনেসোটায় মিনেসোটা ফার্মার্স ইউনিয়নের প্রধান গ্যারি ওয়ার্টিশ জানিয়েছেন, আগের তিন বছরে সম্মিলিতভাবে যতটা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন, শুধু এই এক বছরে তার চেয়ে বেশি কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়েছেন।
অর্থনীতির ‘ট্যাক্স ইনসিডেন্স’ বা ‘করের প্রকৃত বোঝা’ ধারণা থেকেই আমরা জানি শুল্ক কাগজে-কলমে বিদেশি পণ্যের ওপর বসে। কিন্তু মূল্য চোকায় দেশীয় আমদানিকারক। তারা খরচ ও লাভ তোলে ক্রেতার ঘাড়ে পণ্যের বাড়তি দাম চাপিয়ে দিয়ে। ২০১৮-১৯ সালের মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে অর্থনীতিবিদ মেরি অ্যামিতি, স্টিফেন রেডিং ও ডেভিড ওয়াইনস্টাইনের গবেষণাটিও দেখিয়েছিল যে শুল্কের প্রায় পুরো বোঝাই মার্কিন ভোক্তা ও কোম্পানির ঘাড়ে পড়েছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার ওপর গেম থিওরি প্রয়োগ করতে গিয়েছিল। হিসাব ছিল—বড় অর্থনীতি ছোট অর্থনীতিকে চাপে রাখলে ছোট অর্থনীতি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কাউন্সিল অব ফরেইন রিলেশনস ‘কানাডা শৌস দা লিমিটস অব ট্রাম্পস হার্ডবল ট্রেড ট্র্যাকট্রিস’ নিবন্ধে যথার্থই দেখায় ট্রাম্পের কানাডা-নীতি ভুল।কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের একগুঁয়েমির কারণে কানাডার পাল্টা শুল্কের চাপে কানাডা থেকে আমদানি করা অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের উচ্চমূল্য মার্কিন ভোক্তাদেরই জীবন-জীবিকার ওপর চাপ তৈরি করে বসেছে। ডাচ অর্থনীতিবিদ ইয়ান টিনবার্গেনের ‘গ্র্যাভিটি মডেল’ নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের আদলে এ রকম বাণিজ্য-সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিয়েই রেখেছিল যে দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য তাদের অর্থনীতির আকারের সমানুপাতিক এবং দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক।
এই সূত্রে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য-সম্পর্ক প্রায় অনিবার্য-অবিচ্ছেদ্য ও একক সত্তার মতো। বিশাল দুটি অর্থনীতি, পৃথিবীর দীর্ঘতম অরক্ষিত সীমান্ত। মহাকর্ষকে যেমন আইন করে বাতিল করা যায় না; জোর করে টানলে সুতা যেমন ছিঁড়ে যায়, কানাডাকে ধরাশায়ী ও দুর্বল করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উল্টো স্বদেশের ভোক্তাদের জীবনযাত্রাতেই নাভিশ্বাস তুলে দেয়।
আরও আগের শুল্ক ব্যবস্থাপনার আলোকে ২০১৮ সালে অর্থনীতিবিদ থিমো ফেটজার ও কার্লো শোয়ার্জ দেখিয়েছিলেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও কানাডা তাদের পাল্টা শুল্ক এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে তা রিপাবলিকান-ঝোঁকা ও দোলাচলের এলাকাগুলোয় সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। ২০২৬ সালে কানাডা এই কৌশলটি সরাসরিই প্রয়োগ করেছে।
ট্রাম্পের সমালোচনায় ওবামার পাশে কেন প্রগতিশীলেরামধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলেও কি ট্রাম্পের তাণ্ডব থামবে ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার ওপর গেম থিওরি প্রয়োগ করতে গিয়েছিল। হিসাব ছিল—বড় অর্থনীতি ছোট অর্থনীতিকে চাপে রাখলে ছোট অর্থনীতি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কাউন্সিল অব ফরেইন রিলেশনস ‘কানাডা শৌস দা লিমিটস অব ট্রাম্পস হার্ডবল ট্রেড ট্র্যাকট্রিস’ নিবন্ধে যথার্থই দেখায় ট্রাম্পের কানাডা-নীতি ভুল।
দর-কষাকষিতে শক্তির চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলো কে বেশি কষ্ট সহ্য করতে রাজি এবং কার ঘরে রাজনৈতিক চাপ বেশি। ছোট অর্থনীতির ভালোভাবে টিকে থাকার আরেকটি কৌশল হতে হয় সবল অর্থনীতির দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে আঘাত হানা। নির্বাচনী ভোটের হিসাব-নিকাশে মার্কিন সীমান্ত রাজ্যগুলোই ওয়াশিংটনের দুর্বল জায়গা। কানাডা ঠিক সেই সব দুর্বল জায়গাতেই তার বাণিজ্য-কৌশল প্রয়োগ করেছে।
এবারের শুল্কযুদ্ধে কানাডার রণকৌশলকে অনেক দেশই শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে নেবে। বাংলাদেশের জন্যও খানিকটা শিক্ষণীয় রয়েছে, বিশেষত আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োগের বেলায়।
হেলাল মহিউদ্দীন শিক্ষক, লিবারেল আর্টস, ম্যেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ডেকোটা, যুক্তরাষ্ট্র
* মতামত লেখকের নিজস্ব
Source - www.prothomalo.com ↗