‘সালোঁ কিটি’ ও ‘ক্যালিগুলা’—দুটি চলচ্চিত্রই তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিয়েছে, আবার জড়িয়েছে বিতর্কেও। তবে ইরোটিক সিনেমার নির্মাতা পরিচয়ের আড়ালে ছিলেন ভিন্নধর্মী এক নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্রকার। প্রচলিত রীতিকে প্রশ্ন করা, সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আর যৌনতাকে মানুষের অভিব্যক্তির অংশ হিসেবে দেখার চেষ্টা—এসবই ছিল তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের বৈশিষ্ট্য। ইতালির সেই প্রখ্যাত নির্মাতা তিন্তো ব্রাস মারা গেছেন।
৪ নভেম্বর রোমে ৯৩ বছর বয়সে মারা গেছেন এই ইতালীয় নির্মাতা। তাঁর স্ত্রী কাতেরিনা ভার্জি ও দুই সন্তান বোনিফাচিও এবং বিয়াত্রিচা ব্রাস ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসাকে তাঁর মৃত্যুর খবর জানান। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।
শিল্পী পরিবার থেকে চলচ্চিত্রে
১৯৩৩ সালের ২৬ মার্চ ইতালির মিলানে জন্ম তিন্তো ব্রাসের। তাঁর পরিবার ছিল ভেনিসের শিল্পী পরিবার। ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা। শুরুতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করলেও শেষ পর্যন্ত টান অনুভব করেন চলচ্চিত্রের প্রতি। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে প্যারিসে গিয়ে কাজ শুরু করেন। সেখানে সিনেমাথেক ফ্রঁসেজে আর্কাইভিস্ট ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চলচ্চিত্রের ইতিহাস, বিভিন্ন দেশের নির্মাণশৈলী এবং সিনেমার ভাষা সম্পর্কে জানার সুযোগ হয় তাঁর।
যৌনতানির্ভর সিনেমা বানিয়ে বিতর্কিত নির্মাতা তিন্তো ব্রাস মারা গেছেন

প্যারিসে থাকার সময় পরিচয় হয় ইতালির প্রখ্যাত নির্মাতা রবার্তো রোসেলিনির সঙ্গে। পরে রোসেলিনির ‘জেনারেল দেলা রোভেরে’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করেন ব্রাস। এই অভিজ্ঞতা তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের ভিত তৈরি করে। তবে শুরু থেকেই তিনি প্রচলিত ধারার অনুকরণে আগ্রহী ছিলেন না। ক্যামেরা, সম্পাদনা ও দৃশ্য নির্মাণে নিজের মতো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাইতেন।
১৯৬৩ সালে ‘ইন কাপো আল মন্ডো’ নামে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। পরে ছবিটির নাম হয় ‘কি লাভোরা এ পারদুতো’। ভেনিসের পটভূমিতে এক বেকার তরুণের জীবন, হতাশা ও সমাজের সঙ্গে তার সংঘাত ছিল ছবিটির বিষয়। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার পর ছবিটি প্রশংসা পায়। কিন্তু ইতালির সেন্সর কর্তৃপক্ষের আপত্তির মুখে পড়ে। এটাই ছিল সেন্সরশিপের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সংঘাতের শুরু।
ষাটের দশকে ব্রাসের নির্মাণশৈলী ছিল অনেক বেশি পরীক্ষাধর্মী। ১৯৬৪ সালে ইতালির শিল্প ও নকশাবিষয়ক প্রদর্শনী ত্রিয়েনালে দি মিলানোর জন্য লেখক ও চিন্তাবিদ উমবের্তো একোর উদ্যোগে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষা নিয়ে তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা তখনকার সময়ে তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়। একসময় তাঁকে সত্তরের দশকের ‘আন্তোনিওনি’ বলেও অভিহিত করা হয়েছিল।
লন্ডনে চলচ্চিত্র নির্মাণ, ভেনিসে স্বীকৃতি
ষাটের দশকের শেষ দিকে ও সত্তরের দশকের শুরুতে লন্ডনে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ব্রাস। এর মধ্যে ‘ডেডলি সুইট’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৭ সালে নির্মিত এই ছবিতে অভিনয় করেন জ্যঁ-লুই ত্রিনতিনিয়াঁ ও সুইডিশ অভিনেত্রী ইভা অলিন। একজন তরুণ ব্যবসায়িক যোগাযোগের সূত্রে এক হত্যাকাণ্ডের মুখোমুখি হয়। পুলিশের কাছে না গিয়ে ঘটনাস্থলে থাকা এক তরুণীকে রক্ষা করতে গিয়ে সে জড়িয়ে পড়ে অপরাধজগতের সংঘাতে। অপরাধ, রহস্য ও রোমাঞ্চের সঙ্গে ছবিটিতে ছিল ব্রাসের নিজস্ব দৃশ্যভাষার প্রয়োগ।
‘সালোঁ কিটি’ র দৃশ্য। আইএমডিবি এরপর নির্মাণ করেন ‘অ্যাট্রাকশন’ (১৯৬৯) ও ‘ড্রপআউট’ (১৯৭০)। এই সময়ের কাজগুলোতে তিনি কেবল গল্প বলার দিকে মনোযোগ দেননি; বরং দৃশ্যের বিন্যাস, সম্পাদনার গতি এবং চরিত্রের মানসিক অবস্থাকে ভিন্নভাবে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ১৯৭১ সালে ভেনেসা রেডগ্রেভ ও ফ্রাঙ্কো নেরো অভিনীত ‘লা ভাকানজা’ নির্মাণ করেন। ছবিটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ইতালির সেরা চলচ্চিত্রের জন্য চলচ্চিত্র সমালোচকদের পুরস্কার পায়।
ব্রাসের এই সময়ের কাজগুলো মনে করিয়ে দেয়, পরবর্তী সময়ে যৌনতা ও নগ্নতানির্ভর চলচ্চিত্রের জন্য পরিচিত হলেও তাঁর নির্মাতা হয়ে ওঠার পথটি ছিল অন্য রকম। শুরুতে তিনি ছিলেন পরীক্ষাধর্মী, বিদ্রোহী ও নানা ঘরানার চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী এক পরিচালক।
‘সালোঁ কিটি’: যৌনতা, নাৎসিবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতি
১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সালোঁ কিটি’ ব্রাসের চলচ্চিত্রজীবনে বড় পরিবর্তন আনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের বার্লিনের একটি অভিজাত পতিতালয়কে ঘিরে ছবিটির গল্প। নাৎসি গোয়েন্দা সংস্থা ওই পতিতালয়কে ব্যবহার করত নিজেদের মিত্র ও কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি এবং গোপন তথ্য সংগ্রহের কাজে। ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়কে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিতে অভিনয় করেন হেলমুট বার্গার।
‘সালোঁ কিটি’কে কেবল যৌনতা ও নগ্নতানির্ভর চলচ্চিত্র হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক দিকটি উপেক্ষিত হয়। ছবিতে যৌনতা ও ক্ষমতার সম্পর্ক, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিষয়গুলো উঠে আসে। তবে বিষয়বস্তু ও দৃশ্যায়নের কারণে ছবিটি বিতর্কও তৈরি করে। এ ছবির মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্রাসের নাম আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
ছবিটি নজরে আসে ‘পেন্টহাউস’ সাময়িকীর প্রতিষ্ঠাতা বব গুচিওনের। এরপর তাঁর প্রযোজনায় ব্রাসকে দেওয়া হয় আরও বড় পরিসরের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের দায়িত্ব। সেই ছবিই ‘ক্যালিগুলা’।
‘পাপরিকা’র দৃশ্য। আইএমডিবি ‘ক্যালিগুলা’: যে ছবির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন পরিচালক
প্রাচীন রোমের সম্রাট ক্যালিগুলার জীবন ও ক্ষমতার উন্মত্ততা নিয়ে নির্মিত ‘ক্যালিগুলা’ ব্রাসের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র। ১৯৭৯ সালে ছবিটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। এতে নামভূমিকায় অভিনয় করেন ম্যালকম ম্যাকডাওয়েল। আরও ছিলেন হেলেন মিরেন, পিটার ও’টুল ও জন গিলগুড। চিত্রনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মার্কিন লেখক গোর ভিডাল।
বড় বাজেট, পরিচিত অভিনয়শিল্পী এবং প্রাচীন রোমের রাজনৈতিক ক্ষমতার গল্প—সব মিলিয়ে ছবিটি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। কিন্তু নির্মাণের পরই পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজকের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ব্রাসের পরিকল্পনা ছিল ক্ষমতা, নিষ্ঠুরতা, রাজনীতি ও যৌনতার সম্পর্ক নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক চলচ্চিত্র নির্মাণের। কিন্তু প্রযোজক গুচিওনে ছবিটির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে সম্পাদনা ও বিষয়বস্তুতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন।
অভিনয়শিল্পীদের মূল কাজ শেষ হওয়ার পর তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়াই অতিরিক্ত যৌন দৃশ্য ধারণ করা হয়। সেসব দৃশ্য পরে ছবিতে যুক্ত করা হয়। ব্রাস ও ভিডালের আপত্তি ছিল, তাঁদের পরিকল্পিত চলচ্চিত্রের সঙ্গে চূড়ান্ত সংস্করণের মিল নেই। তাঁরা ছবিটি থেকে নিজেদের নাম সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে আইনি পদক্ষেপও নেন। মুক্তির পর ছবিটি নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া সংস্করণে ব্রাসের নাম পরিচালকের পরিবর্তে মূল চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
‘ক্যালিগুলা’র পোস্টার। আইএমডিবি ‘ক্যালিগুলা’ তাই শুধু একটি চলচ্চিত্রের নাম নয়; এটি চলচ্চিত্র নির্মাণে পরিচালকের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ, প্রযোজকের ক্ষমতা এবং শিল্পীর কাজের ওপর অন্যের হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনারও একটি বড় উদাহরণ। ছবিটির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে ব্রাসের নাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও, ছবির চূড়ান্ত রূপ নিয়ে তাঁর অসন্তোষ কখনো কাটেনি। ২০২৩ সালে প্রযোজকের সংযোজন বাদ দিয়ে নতুন সম্পাদিত একটি সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। তবে সেটিও ব্রাসের সম্পাদনা ছিল না, তিনি সেটিকে অনুমোদনও করেননি।
যৌনতাকে কেন চলচ্চিত্রের বিষয় করেছিলেন
‘সালোঁ কিটি’ ও ‘ক্যালিগুলা’র পর ব্রাসের নামের সঙ্গে ইরোটিক চলচ্চিত্রের পরিচয় আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু তাঁর কাছে যৌনতা কেবল দর্শককে আকৃষ্ট করার উপাদান ছিল না। মানুষের প্রকাশভঙ্গি, আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক ও ক্ষমতার জটিলতা বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবেও বিষয়টিকে দেখতেন তিনি।
‘লা রিপাবলিকা’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, মানুষের অভিব্যক্তি বোঝার মৌলিক চাবিকাঠি যৌনতা; বিশেষ করে নারীকে পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এটি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই বক্তব্য তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়বস্তু বুঝতে সাহায্য করে। তবে তাঁর কাজ নিয়ে বিতর্কও ছিল। নারীর স্বাধীনতা ও আকাঙ্ক্ষাকে সামনে আনার দাবি থাকলেও, তাঁর ছবিতে নারীর শরীরের উপস্থাপন কতটা মুক্তির, আর কতটা পুরুষ দর্শকের দৃষ্টিকে তৃপ্ত করার—এ প্রশ্নও উঠেছে।
ব্রাসের চলচ্চিত্রের মূল্যায়নে এই দ্বন্দ্ব গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে তিনি যৌনতাকে সামাজিক ভণ্ডামি ও নিষেধাজ্ঞার বাইরে এনে দেখাতে চেয়েছেন, অন্যদিকে তাঁর ছবির নগ্নতা ও দৃশ্যায়ন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ফলে তাঁর কাজকে এককথায় মুক্তচিন্তার উদ্যাপন কিংবা নিছক উত্তেজক বিনোদন—কোনোটিতেই সীমাবদ্ধ করা যায় না।
‘দ্য কি’ থেকে ‘পাপরিকা’: ইরোটিক সিনেমার নিজস্ব জগৎ
১৯৮৩ সালে জাপানি লেখক জুনিচিরো তানিজাকির উপন্যাস অবলম্বনে ‘দ্য কি’ নির্মাণ করেন ব্রাস। এতে অভিনয় করেন স্তেফানিয়া সান্দ্রেল্লি। এক দম্পতির সম্পর্ক, গোপন আকাঙ্ক্ষা ও যৌন জীবনের জটিলতা নিয়ে ছবিটি নির্মিত। আগের কাজগুলোর তুলনায় এখানে যৌনতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মনস্তত্ত্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও ছবিটি পরিচিতি পায়।
এরপর ‘মিরান্দা’ (১৯৮৫), ‘ক্যাপ্রিচিও’ (১৯৮৭), ‘পাপরিকা’ (১৯৯১) ও ‘কোসি ফান তুত্তে’ (১৯৯২) নির্মাণ করেন তিনি। এসব ছবিতে নারী চরিত্রের আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, যৌন স্বাধীনতা ও সামাজিক বিধিনিষেধের বিষয়গুলো ঘুরেফিরে এসেছে। ‘পাপরিকা’তে এক তরুণীর পতিতালয়ের জগতে প্রবেশের গল্প দেখানো হয়। ‘কোসি ফান তুত্তে’তে উঠে আসে বিবাহিত সম্পর্ক ও যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রশ্ন।
চলে গেলেন ক্যানসার আক্রান্ত মডেল–অভিনেত্রী তুলনাপরবর্তী সময়ে ‘ল’উমো চে গুয়ারদা’ (১৯৯৪), ‘মোনেলা’ (১৯৯৮), ‘ব্ল্যাক অ্যাঞ্জেল’ (২০০২) এবং ‘ফালো’ (২০০৩) নির্মাণ করেন ব্রাস। তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয় ও উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, ইউরোপীয় ইরোটিক সিনেমার দর্শকদের কাছে তিনি আলাদা জায়গা করে নেন। তাঁর নামের সঙ্গে তৈরি হয় একধরনের স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রধারা—যেখানে যৌনতা, হাস্যরস, উসকানি ও সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান একসঙ্গে উপস্থিত।
বিতর্কের বাইরে যে নির্মাতাকে নতুন করে দেখা হচ্ছিল
জীবনের শেষভাগেও চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি ব্রাস। ২০১০ সালে স্ট্রোকের পর তাঁর শারীরিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আরও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে জনসমক্ষে উপস্থিতি কমে যায়। তবু তাঁর পুরোনো কাজ নিয়ে আগ্রহ থেমে থাকেনি।
২০২৬ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর ‘ডেডলি সুইট’—ইতালীয় নাম ‘কোল কুওরে ইন গোলা’—ছবির পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ প্রদর্শিত হয়। এটি ছিল উৎসবের উদ্বোধনের আগের বিশেষ প্রদর্শনী। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ব্রাস নিজে সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি। তাঁর স্ত্রী কাতেরিনা ভার্জি তাঁর হয়ে একটি বার্তা পড়ে শোনান। সেখানে ব্রাস নিজের চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে নান্দনিক অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক আলবের্তো বারবেরা তাঁকে শুধু ইরোটিক চলচ্চিত্রের নির্মাতা হিসেবে দেখাকে সীমিত মূল্যায়ন বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, ষাটের দশকে ব্রাস ছিলেন ইতালির গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতাদের। পরে তিনি ইরোটিক চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন এবং ইতালির মূলধারার সংস্কৃতিতে এই ধরনের চলচ্চিত্রকে দৃশ্যমান করে তোলেন।
শেষ ইচ্ছা ছিল ভেনিসের জলেই মিশে যাওয়া
জীবনের শেষ কয়েক বছর রোমের উপকণ্ঠে ইসোলা ফারনেসে এলাকায় বসবাস করতেন ব্রাস। ২০১৭ সালে কাতেরিনা ভার্জিকে বিয়ে করেন তিনি। স্ত্রী তাঁর চলচ্চিত্রের আর্কাইভ সংরক্ষণের কাজেও যুক্ত ছিলেন। এর আগে ৯০তম জন্মদিন উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে ব্রাস জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর দেহভস্ম যেন ভেনিসের জলরাশিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যে শহর তাঁর শৈশব, শিল্পবোধ ও প্রথম চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, শেষবিদায়েও সেই শহরকেই কাছে চেয়েছিলেন তিনি।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে
১৯৬৩ সালে ‘ইন কাপো আল মন্ডো’ নামে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। পরে ছবিটির নাম হয় ‘কি লাভোরা এ পারদুতো’। ভেনিসের পটভূমিতে এক বেকার তরুণের জীবন, হতাশা ও সমাজের সঙ্গে তার সংঘাত ছিল ছবিটির বিষয়। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার পর ছবিটি প্রশংসা পায়। কিন্তু ইতালির সেন্সর কর্তৃপক্ষের আপত্তির মুখে পড়ে। এটাই ছিল সেন্সরশিপের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সংঘাতের শুরু।
ষাটের দশকে ব্রাসের নির্মাণশৈলী ছিল অনেক বেশি পরীক্ষাধর্মী। ১৯৬৪ সালে ইতালির শিল্প ও নকশাবিষয়ক প্রদর্শনী ত্রিয়েনালে দি মিলানোর জন্য লেখক ও চিন্তাবিদ উমবের্তো একোর উদ্যোগে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষা নিয়ে তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা তখনকার সময়ে তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়। একসময় তাঁকে সত্তরের দশকের ‘আন্তোনিওনি’ বলেও অভিহিত করা হয়েছিল।
লন্ডনে চলচ্চিত্র নির্মাণ, ভেনিসে স্বীকৃতি
ষাটের দশকের শেষ দিকে ও সত্তরের দশকের শুরুতে লন্ডনে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ব্রাস। এর মধ্যে ‘ডেডলি সুইট’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৭ সালে নির্মিত এই ছবিতে অভিনয় করেন জ্যঁ-লুই ত্রিনতিনিয়াঁ ও সুইডিশ অভিনেত্রী ইভা অলিন। একজন তরুণ ব্যবসায়িক যোগাযোগের সূত্রে এক হত্যাকাণ্ডের মুখোমুখি হয়। পুলিশের কাছে না গিয়ে ঘটনাস্থলে থাকা এক তরুণীকে রক্ষা করতে গিয়ে সে জড়িয়ে পড়ে অপরাধজগতের সংঘাতে। অপরাধ, রহস্য ও রোমাঞ্চের সঙ্গে ছবিটিতে ছিল ব্রাসের নিজস্ব দৃশ্যভাষার প্রয়োগ।
‘সালোঁ কিটি’ র দৃশ্য। আইএমডিবি এরপর নির্মাণ করেন ‘অ্যাট্রাকশন’ (১৯৬৯) ও ‘ড্রপআউট’ (১৯৭০)। এই সময়ের কাজগুলোতে তিনি কেবল গল্প বলার দিকে মনোযোগ দেননি; বরং দৃশ্যের বিন্যাস, সম্পাদনার গতি এবং চরিত্রের মানসিক অবস্থাকে ভিন্নভাবে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ১৯৭১ সালে ভেনেসা রেডগ্রেভ ও ফ্রাঙ্কো নেরো অভিনীত ‘লা ভাকানজা’ নির্মাণ করেন। ছবিটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ইতালির সেরা চলচ্চিত্রের জন্য চলচ্চিত্র সমালোচকদের পুরস্কার পায়।
ব্রাসের এই সময়ের কাজগুলো মনে করিয়ে দেয়, পরবর্তী সময়ে যৌনতা ও নগ্নতানির্ভর চলচ্চিত্রের জন্য পরিচিত হলেও তাঁর নির্মাতা হয়ে ওঠার পথটি ছিল অন্য রকম। শুরুতে তিনি ছিলেন পরীক্ষাধর্মী, বিদ্রোহী ও নানা ঘরানার চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী এক পরিচালক।
‘সালোঁ কিটি’: যৌনতা, নাৎসিবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতি
১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সালোঁ কিটি’ ব্রাসের চলচ্চিত্রজীবনে বড় পরিবর্তন আনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের বার্লিনের একটি অভিজাত পতিতালয়কে ঘিরে ছবিটির গল্প। নাৎসি গোয়েন্দা সংস্থা ওই পতিতালয়কে ব্যবহার করত নিজেদের মিত্র ও কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি এবং গোপন তথ্য সংগ্রহের কাজে। ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়কে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিতে অভিনয় করেন হেলমুট বার্গার।
‘সালোঁ কিটি’কে কেবল যৌনতা ও নগ্নতানির্ভর চলচ্চিত্র হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক দিকটি উপেক্ষিত হয়। ছবিতে যৌনতা ও ক্ষমতার সম্পর্ক, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিষয়গুলো উঠে আসে। তবে বিষয়বস্তু ও দৃশ্যায়নের কারণে ছবিটি বিতর্কও তৈরি করে। এ ছবির মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্রাসের নাম আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
ছবিটি নজরে আসে ‘পেন্টহাউস’ সাময়িকীর প্রতিষ্ঠাতা বব গুচিওনের। এরপর তাঁর প্রযোজনায় ব্রাসকে দেওয়া হয় আরও বড় পরিসরের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের দায়িত্ব। সেই ছবিই ‘ক্যালিগুলা’।
‘পাপরিকা’র দৃশ্য। আইএমডিবি ‘ক্যালিগুলা’: যে ছবির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন পরিচালক
প্রাচীন রোমের সম্রাট ক্যালিগুলার জীবন ও ক্ষমতার উন্মত্ততা নিয়ে নির্মিত ‘ক্যালিগুলা’ ব্রাসের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র। ১৯৭৯ সালে ছবিটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। এতে নামভূমিকায় অভিনয় করেন ম্যালকম ম্যাকডাওয়েল। আরও ছিলেন হেলেন মিরেন, পিটার ও’টুল ও জন গিলগুড। চিত্রনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মার্কিন লেখক গোর ভিডাল।
বড় বাজেট, পরিচিত অভিনয়শিল্পী এবং প্রাচীন রোমের রাজনৈতিক ক্ষমতার গল্প—সব মিলিয়ে ছবিটি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। কিন্তু নির্মাণের পরই পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজকের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ব্রাসের পরিকল্পনা ছিল ক্ষমতা, নিষ্ঠুরতা, রাজনীতি ও যৌনতার সম্পর্ক নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক চলচ্চিত্র নির্মাণের। কিন্তু প্রযোজক গুচিওনে ছবিটির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে সম্পাদনা ও বিষয়বস্তুতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন।
অভিনয়শিল্পীদের মূল কাজ শেষ হওয়ার পর তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়াই অতিরিক্ত যৌন দৃশ্য ধারণ করা হয়। সেসব দৃশ্য পরে ছবিতে যুক্ত করা হয়। ব্রাস ও ভিডালের আপত্তি ছিল, তাঁদের পরিকল্পিত চলচ্চিত্রের সঙ্গে চূড়ান্ত সংস্করণের মিল নেই। তাঁরা ছবিটি থেকে নিজেদের নাম সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে আইনি পদক্ষেপও নেন। মুক্তির পর ছবিটি নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া সংস্করণে ব্রাসের নাম পরিচালকের পরিবর্তে মূল চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
‘ক্যালিগুলা’র পোস্টার। আইএমডিবি ‘ক্যালিগুলা’ তাই শুধু একটি চলচ্চিত্রের নাম নয়; এটি চলচ্চিত্র নির্মাণে পরিচালকের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ, প্রযোজকের ক্ষমতা এবং শিল্পীর কাজের ওপর অন্যের হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনারও একটি বড় উদাহরণ। ছবিটির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে ব্রাসের নাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও, ছবির চূড়ান্ত রূপ নিয়ে তাঁর অসন্তোষ কখনো কাটেনি। ২০২৩ সালে প্রযোজকের সংযোজন বাদ দিয়ে নতুন সম্পাদিত একটি সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। তবে সেটিও ব্রাসের সম্পাদনা ছিল না, তিনি সেটিকে অনুমোদনও করেননি।
যৌনতাকে কেন চলচ্চিত্রের বিষয় করেছিলেন
‘সালোঁ কিটি’ ও ‘ক্যালিগুলা’র পর ব্রাসের নামের সঙ্গে ইরোটিক চলচ্চিত্রের পরিচয় আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু তাঁর কাছে যৌনতা কেবল দর্শককে আকৃষ্ট করার উপাদান ছিল না। মানুষের প্রকাশভঙ্গি, আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক ও ক্ষমতার জটিলতা বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবেও বিষয়টিকে দেখতেন তিনি।
‘লা রিপাবলিকা’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, মানুষের অভিব্যক্তি বোঝার মৌলিক চাবিকাঠি যৌনতা; বিশেষ করে নারীকে পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এটি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এই বক্তব্য তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়বস্তু বুঝতে সাহায্য করে। তবে তাঁর কাজ নিয়ে বিতর্কও ছিল। নারীর স্বাধীনতা ও আকাঙ্ক্ষাকে সামনে আনার দাবি থাকলেও, তাঁর ছবিতে নারীর শরীরের উপস্থাপন কতটা মুক্তির, আর কতটা পুরুষ দর্শকের দৃষ্টিকে তৃপ্ত করার—এ প্রশ্নও উঠেছে।
ব্রাসের চলচ্চিত্রের মূল্যায়নে এই দ্বন্দ্ব গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে তিনি যৌনতাকে সামাজিক ভণ্ডামি ও নিষেধাজ্ঞার বাইরে এনে দেখাতে চেয়েছেন, অন্যদিকে তাঁর ছবির নগ্নতা ও দৃশ্যায়ন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ফলে তাঁর কাজকে এককথায় মুক্তচিন্তার উদ্যাপন কিংবা নিছক উত্তেজক বিনোদন—কোনোটিতেই সীমাবদ্ধ করা যায় না।
‘দ্য কি’ থেকে ‘পাপরিকা’: ইরোটিক সিনেমার নিজস্ব জগৎ
১৯৮৩ সালে জাপানি লেখক জুনিচিরো তানিজাকির উপন্যাস অবলম্বনে ‘দ্য কি’ নির্মাণ করেন ব্রাস। এতে অভিনয় করেন স্তেফানিয়া সান্দ্রেল্লি। এক দম্পতির সম্পর্ক, গোপন আকাঙ্ক্ষা ও যৌন জীবনের জটিলতা নিয়ে ছবিটি নির্মিত। আগের কাজগুলোর তুলনায় এখানে যৌনতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মনস্তত্ত্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও ছবিটি পরিচিতি পায়।
এরপর ‘মিরান্দা’ (১৯৮৫), ‘ক্যাপ্রিচিও’ (১৯৮৭), ‘পাপরিকা’ (১৯৯১) ও ‘কোসি ফান তুত্তে’ (১৯৯২) নির্মাণ করেন তিনি। এসব ছবিতে নারী চরিত্রের আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, যৌন স্বাধীনতা ও সামাজিক বিধিনিষেধের বিষয়গুলো ঘুরেফিরে এসেছে। ‘পাপরিকা’তে এক তরুণীর পতিতালয়ের জগতে প্রবেশের গল্প দেখানো হয়। ‘কোসি ফান তুত্তে’তে উঠে আসে বিবাহিত সম্পর্ক ও যৌন আকাঙ্ক্ষার প্রশ্ন।
চলে গেলেন ক্যানসার আক্রান্ত মডেল–অভিনেত্রী তুলনাপরবর্তী সময়ে ‘ল’উমো চে গুয়ারদা’ (১৯৯৪), ‘মোনেলা’ (১৯৯৮), ‘ব্ল্যাক অ্যাঞ্জেল’ (২০০২) এবং ‘ফালো’ (২০০৩) নির্মাণ করেন ব্রাস। তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয় ও উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, ইউরোপীয় ইরোটিক সিনেমার দর্শকদের কাছে তিনি আলাদা জায়গা করে নেন। তাঁর নামের সঙ্গে তৈরি হয় একধরনের স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রধারা—যেখানে যৌনতা, হাস্যরস, উসকানি ও সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান একসঙ্গে উপস্থিত।
বিতর্কের বাইরে যে নির্মাতাকে নতুন করে দেখা হচ্ছিল
জীবনের শেষভাগেও চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি ব্রাস। ২০১০ সালে স্ট্রোকের পর তাঁর শারীরিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আরও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে জনসমক্ষে উপস্থিতি কমে যায়। তবু তাঁর পুরোনো কাজ নিয়ে আগ্রহ থেমে থাকেনি।
২০২৬ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর ‘ডেডলি সুইট’—ইতালীয় নাম ‘কোল কুওরে ইন গোলা’—ছবির পুনরুদ্ধার করা সংস্করণ প্রদর্শিত হয়। এটি ছিল উৎসবের উদ্বোধনের আগের বিশেষ প্রদর্শনী। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ব্রাস নিজে সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি। তাঁর স্ত্রী কাতেরিনা ভার্জি তাঁর হয়ে একটি বার্তা পড়ে শোনান। সেখানে ব্রাস নিজের চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে নান্দনিক অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক আলবের্তো বারবেরা তাঁকে শুধু ইরোটিক চলচ্চিত্রের নির্মাতা হিসেবে দেখাকে সীমিত মূল্যায়ন বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, ষাটের দশকে ব্রাস ছিলেন ইতালির গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতাদের। পরে তিনি ইরোটিক চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন এবং ইতালির মূলধারার সংস্কৃতিতে এই ধরনের চলচ্চিত্রকে দৃশ্যমান করে তোলেন।
শেষ ইচ্ছা ছিল ভেনিসের জলেই মিশে যাওয়া
জীবনের শেষ কয়েক বছর রোমের উপকণ্ঠে ইসোলা ফারনেসে এলাকায় বসবাস করতেন ব্রাস। ২০১৭ সালে কাতেরিনা ভার্জিকে বিয়ে করেন তিনি। স্ত্রী তাঁর চলচ্চিত্রের আর্কাইভ সংরক্ষণের কাজেও যুক্ত ছিলেন। এর আগে ৯০তম জন্মদিন উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে ব্রাস জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর দেহভস্ম যেন ভেনিসের জলরাশিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যে শহর তাঁর শৈশব, শিল্পবোধ ও প্রথম চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, শেষবিদায়েও সেই শহরকেই কাছে চেয়েছিলেন তিনি।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে
Source - www.prothomalo.com ↗