এক ব্যাগ রক্তের জন্য গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ছোটাছুটি করছিলেন আবেদ আলী নামে এক ব্যক্তি। অপারেশন থিয়েটারে ছেলে সুমনের অস্ত্রোপচার চলছে। চিকিৎসকের নির্দেশ, দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করতে হবে।
রোগীর স্বজনেরা হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক, পরিচিতজন ও আত্মীয়স্বজনের কাছে ছুটছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে হাজির হন এক ব্যক্তি। আশ্বাস দেন, টাকা দিলেই মিলবে রক্ত। তার হাতে তুলে দেওয়া হয় পাঁচ হাজার টাকা। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজির রক্তের ব্যাগ। কিন্তু সেই রক্তের উৎস কী, কে দিয়েছেন, যথাযথ পরীক্ষা হয়েছে কি না— এসব প্রশ্নের নেই নির্ভরযোগ্য ও যথাযথ উত্তর।
তবে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় নেই স্বজনদের, তাদের লক্ষ্য— বাঁচাতে হবে রোগীকে। শুধু ঢাকা মেডিকেলই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। এখানে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে নামসর্বস্ব রক্ত বেচাকেনার কেন্দ্র। মানা হচ্ছে না কোনো নিয়মনীতি, নেওয়া হচ্ছে না সরকারি লাইসেন্স বা অনুমোদন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পুরো ঢাকা শহরই যেন এক বিশাল ‘ভাসমান ব্লাড ব্যাংক’।
রাজধানীজুড়ে ভাসমান ব্লাড ব্যাংক

তবে ভয়ের বিষয় হলো, এসব রক্ত নিরাপদ কতটুকু, সে বিচার কেউ করছেন না বা করার সুযোগ থাকছে না। এতে তৈরি হচ্ছে রোগীর প্রাণহানিসহ নানা সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের মূল চালিকাশক্তি হলো পেশাদার রক্তদাতারা, যাদের একটি বড় অংশ মাদকসেবী। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তারা নিয়মিত বিরতিতে রক্ত বিক্রি করছে।
নিয়মানুযায়ী, একজন সুস্থ মানুষ নির্দিষ্ট সময় পর রক্ত দিতে পারলেও এখানে টাকার লোভে একই ব্যক্তি কয়েক দিন পরপরই রক্ত দিচ্ছে। মাদকসেবীদের এই দূষিত ও রোগাক্রান্ত রক্তই টাকার বিনিময়ে তুলে দেওয়া হচ্ছে অসচেতন ও নিরুপায় মানুষের হাতে। একটি নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, এইচআইভি (এইডস), সিফিলিস ও ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগগুলো স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু রাজধানীর এই ভাসমান ও অবৈধ কেন্দ্রগুলোয় পরীক্ষার কোনো বালাই নেই। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শরীরে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে রক্ত টেনে নেওয়া হচ্ছে এবং কোনো প্রকার ক্রস-ম্যাচিং বা স্ক্রিনিং ছাড়াই তা প্যাকেটজাত করে বিক্রি চলছে। ফলে জীবন বাঁচাতে এসে মানুষ উল্টো বাহক হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন মরণব্যাধির। জরুরি মুহূর্তে যখন কোনো মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হয় এবং স্বজনেরা কোথাও তা খুঁজে পান না, তখনই এই চক্রটি তাদের ফাঁদে ফেলে।
হাসপাতালের সামনে ও আশপাশে ওত পেতে থাকা দালালচক্র অসহায় স্বজনদের টার্গেট করে। ‘সহজেই রক্ত পাওয়া যাবে’— এমন প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই অনিরাপদ রক্ত গছিয়ে দেয় তারা। নিরুপায় স্বজনেরা অজ্ঞতাবশত পা দিতে বাধ্য হন এই মরণফাঁদে। অপরাধ ও স্বাস্থ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় এই অবৈধ ব্যবসা দিন দিন জাঁকিয়ে বসছে।
মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দু-একটি অভিযান চালানো হলেও মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই যদি এই ‘ভাসমান ব্লাড ব্যাংক’ ও মাদকসেবীদের রক্তবাণিজ্য বন্ধ করা না যায়, তবে দেশের জনস্বাস্থ্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট ১৯৮টি সরকার অনুমোদিত ব্লাড ব্যাংক বা রক্ত সঞ্চালন কেন্দ্র রয়েছে।
তবে এর বাইরে দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর নিজস্ব ট্রান্সফিউশন ইউনিটসহ সর্বমোট ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা কমবেশি ৪৫২টি। ১৯৮টি স্বতন্ত্র ব্লাড ব্যাংকের মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে অনুমোদিত ও সক্রিয় কেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ১২৫টি। বেসরকারি সূত্রমতে, খোদ রাজধানীতেই অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা সহস্রাধিক।
এসব প্রতিষ্ঠানে মুখে মুখে যোগাযোগ, নগদ লেনদেন আর দালালদের মধ্যস্থতায় চলছে রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ বাণিজ্য। এক ব্যাগ রক্তের জন্য ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আসলে এই বাজারে রোগীর জীবন বাঁচানোর তাগিদই হয়ে উঠেছে মুনাফার হাতিয়ার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্রমতে, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে চলতি বছরও রাজধানীর আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, অ্যাকটিভ ব্লাড ব্যাংক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডক্টরস কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্যাপিটাল হাসপাতাল, ট্রান্সফিউশন অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, প্রাইম টিজি ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, ক্রিয়েটিভ ব্লাড ব্যাংকসহ প্রায় ২০টির মতো প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে তাদের কোনো বৈধ লাইসেন্স পাওয়া যায়নি।
অনেক প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরির রেফ্রিজারেটর থেকে উৎস ও মেয়াদ উল্লেখ না থাকা রক্তের ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। রক্তদাতার চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য কিংবা স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোনো নির্ভরযোগ্য ডেটাবেইসও নেই তাদের। অভিযানকালে রক্তবাণিজ্যের দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে জরিমানা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।
গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো সিলগালা ও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এরপরও থেমে নেই এই মরণবাণিজ্য। চিকিৎসকেরা জানান, এই কালোবাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ পেশাদার রক্তদাতা। হাসপাতালের আশপাশে ঘোরাফেরা করা ভাসমান মানুষ, দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তি এবং মাদকনির্ভর কিছু মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনানুষ্ঠানিক রক্ত সরবরাহ নেটওয়ার্ক।
অভিযোগ রয়েছে, মাদকের টাকা জোগাড় করতে তাদের একটি অংশ নিয়মিত রক্ত বিক্রি করে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করে একশ্রেণির দালাল। রোগীর স্বজনের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট গ্রুপের রক্তদাতা হাজির করাই তাদের কাজ। কোনো কোনো পেশাদার রক্তদাতাকে ২০ থেকে ২৫ দিন পরপর রক্ত দিতে হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে মাসে একাধিকবার রক্ত সংগ্রহ করা হয়।
অথচ রক্তদানের আগে দাতার শারীরিক অবস্থা, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা এবং আগের রক্তদানের সময়সহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা জরুরি। ঘন ঘন রক্ত দিলে আয়রনের ঘাটতি, রক্তস্বল্পতা ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, সংক্রমণের ইতিহাস এবং যথাযথ স্বাস্থ্যপরীক্ষা ছাড়া রক্ত সংগ্রহ করলে এইচআইভি, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি ও সিফিলিসের মতো সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
অথচ, এদের কাছে দাতার স্বাস্থ্যগত ইতিহাস ও রক্তদানের বিরতি সংরক্ষণের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই। নগদ লেনদেনের কারণে এসব বাণিজ্যের নির্ভরযোগ্য নথি থাকে না। কে রক্ত দিয়েছেন, কোন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হয়েছে, কে সরবরাহ করেছেন, কিংবা কত টাকা নেওয়া হয়েছে— সবই থেকে যায় মৌখিক সমঝোতায়। ফলে রক্ত দেওয়ার পর রোগীর কোনো জটিলতা দেখা দিলে দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ রক্তের ব্যাগের পরিচয় ও পরীক্ষার তথ্য নিয়ে জালিয়াতি। কোনো কোনো অনিয়ন্ত্রিত সরবরাহব্যবস্থায় রক্তের উৎস, গ্রুপ ও পরীক্ষার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করেই ব্যাগ রোগীর স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এমনকি রক্তের গ্রুপের পরিচয় পরিবর্তন কিংবা পরীক্ষার ফল জাল করার অভিযোগও রয়েছে।
তবে ব্যাগের গায়ে লেখা গ্রুপই নিরাপদ রক্তের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, সংক্রমণ পরীক্ষা এবং রোগীর সঙ্গে ক্রস-ম্যাচ সম্পন্ন করা অপরিহার্য। ভুল গ্রুপের রক্ত শরীরে প্রবেশ করলে তীব্র হেমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন রিঅ্যাকশন, কিডনি বিকল, শক, রক্ত জমাট বাঁধার জটিলতা, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। দেশে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন নিশ্চিত করতে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন, ২০০২ রয়েছে।
রক্ত সংগ্রহ, পরীক্ষা, সংরক্ষণ ও পরিসঞ্চালনের জন্য অনুমোদন ও নির্দিষ্ট নিয়মকানুনও রয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের প্রবেশপথ, জরুরি বিভাগ ও ব্লাড ব্যাংকের আশপাশে দিনের পর দিন এসব কার্যক্রম চললেও নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। হাসপাতালের কিছু অসৎ চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড মাস্টারসহ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একটি অংশও এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ব্লাড ব্যাংকগুলোয় যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী কঠোর অভিযান চলমান।
যেসব তথাকথিত ব্লাড ব্যাংক ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখতে পারছে না বা কোনো রকম বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা ফেঁদে বসেছে, সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা (বন্ধ) করে দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভুয়া টেকনিশিয়ান, দালালচক্র ও অবৈধ রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
The post রাজধানীজুড়ে ভাসমান ব্লাড ব্যাংক appeared first on Bangladesh Diplomat | বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাট.
Source - bangladeshdiplomat.com ↗