নদী আর বঙ্গোপসাগরঘেরা বরগুনার ছোট্ট উপজেলা পাথরঘাটা। ১৯ অক্টোবর, সোমবার। সাপ্তাহিক হাটের দিন না হলেও সকাল নয়টার দিকেই বাজারে ব্যস্ততা দেখা গেল। গ্রামের চাষিরা সবজি নিয়ে এসেছেন, জেলেরা ব্যস্ত মাছের ঝুড়ি নিয়ে। মুদিদোকানগুলো সবে জমতে শুরু করেছে। বাজারের এক কোণে ছোট্ট একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এক নারী মুঠোফোনে কথা বলছেন। ফোন রেখে তিনি দোকানে বসা নারীকে বললেন, ‘আফা, টাকাডা আইছে?’ মুঠোফোনের পর্দায় লেনদেনের বার্তা দেখে দোকানি বললেন, ‘হ, আইছে। তুলবেন?’
টাকা হাতে নিয়ে কয়েকবার গুনলেন ওই নারী। মুখে ফুটল স্বস্তির হাসি। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, ফোনের ওপাশে ছিলেন সৌদিপ্রবাসী স্বামী। সংসারের মাসের খরচ পাঠিয়েছেন তিনি।
কাজের ফাঁকে হেসে তানিয়া বললেন, ‘মানুষের টাকা, নিজের টাকা না। তাই খুব সাবধানে কাজ করতে হয়।’দোকানের নারীটির নাম তানিয়া আক্তার, বয়স ৩৫ বছর। কয়েকটি মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট তিনি। সকাল থেকেই তাঁর দোকানে মানুষের আসা-যাওয়া। কেউ টাকা পাঠান, কেউ তোলেন, কেউ বিদ্যুৎ বিল দেন, কেউ মোবাইল ফোনে টাকা ভরেন। ছোট্ট দোকানটি যেন গ্রামের সঙ্গে শহরের, ঘরের সঙ্গে দূরদেশের এক আর্থিক সেতু।
তানিয়ার দোকান, অনেকের ভরসা

তানিয়ার বাড়ি দোকান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। ঘুম থেকে ওঠেন ভোর সাড়ে চারটায়। রান্না আর সংসারের কাজ সেরে, সকালের খাবার খেয়ে ইজিবাইকে চড়ে আসেন হাটে। দোকান খুলে প্রথম কাজ আগের দিনের হিসাব মেলানো, নগদ টাকা গুনে রাখা। এর মধ্যেই গ্রাহক আসতে শুরু করেন। বেলা একটা পর্যন্ত এত ভিড় থাকে যে ঘাড় ফেরানোর সময় পান না। এরপর ভিড় কমে আসে, তবে দোকান খোলা থাকে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত। প্রতিটি লেনদেনে সতর্ক থাকতে হয়, ভুল হলেই বিপদ।
কাজের ফাঁকে হেসে তানিয়া বললেন, ‘মানুষের টাকা, নিজের টাকা না। তাই খুব সাবধানে কাজ করতে হয়।’
তাদের পড়াশোনার খরচ আর ছোটখাটো আবদার, শাশুড়ির চিকিৎসা, বাজারসদাই, বিদ্যুৎ বিল, সবই মেটান ব্যবসার আয় থেকে। এতে ৩০ হাজার টাকার মতো তাঁর খরচ হয়। একা হাতে সংসার
আয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে তানিয়া স্মিত হেসে এড়িয়ে গেলেন। পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ২০২৪ সালে জমিজমা নিয়ে বিরোধে তাঁর স্বামী খুন হন। দুই শিশুসন্তান আর বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে তানিয়া পড়ে যান অকূলপাথারে।
এরপর এই ব্যবসা শুরু করেন তানিয়া। এখন একার আয়েই সংসার চলে। দোকানভাড়া দেন মাসে সাত হাজার টাকা। মেয়ে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে, ছেলে প্রথম শ্রেণিতে। তাদের পড়াশোনার খরচ আর ছোটখাটো আবদার, শাশুড়ির চিকিৎসা, বাজারসদাই, বিদ্যুৎ বিল, সবই মেটান ব্যবসার আয় থেকে। এতে ৩০ হাজার টাকার মতো তাঁর খরচ হয়।
এম জসীম উদ্দীন, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, বরিশালআস্থাই পুঁজি
তানিয়ার দোকানে যাঁরা আসেন, তাঁদের বেশির ভাগই পরিচিত। কেউ জেলে, কেউ কৃষক, কেউ ছোট ব্যবসায়ী। তাঁদের সন্তান বা স্বজন কাজ করেন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ নানা শহরে, কেউ কেউ বিদেশে। সরকারি নানা ভাতার টাকাও তোলা যায় এই দোকানে।
প্রায় আট কিলোমিটার দূরের চরলাঠিমারা থেকে নিয়মিত বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে আসেন আলী আজিম খান। অন্য কোথাও গিয়ে টাকা তোলার ভরসা পান না তিনি। বললেন, ‘তানিয়া আমাগো এলাকার মানুষ। আমি তো এই সব বুঝি না। তানিয়া আমারে চিনে, ওর কাছে আইলে টাহা তুইল্লা দেয়। অন্য জায়গায় গেলে ভয় লাগে। আইতে-যাইতে ৬০ টাহা খরচ হয়, তা-ও তানিয়ার কাছেই আসি।’
এই চেনাজানা আর আস্থাই তানিয়ার ব্যবসার বড় পুঁজি। ৫২ বছর বয়সী জেলে ফারুক মাঝি বলেন, ‘প্রায় দিনই গাঙ্গে মোবাইলের টাকা ফুরাইয়া যায়। আফারে কই, ৫০ টাহা লোন দেন।’ এমন অনুরোধ প্রায়ই পান তানিয়া, তা তিনি মেটানও।
ঘরের বাইরে নতুন পরিচয়
তানিয়ার দোকান তাই শুধু লেনদেনের জায়গা নয়, দরকারে ভরসারও জায়গা। দুই বছর আগেও ঘরের বাইরে তাঁর কোনো পরিচয় ছিল না। এখন নিজের গ্রাম ছাড়িয়ে প্রায় পুরো উপজেলার মানুষ তাঁকে চেনে। গ্রামের নারীরা আর্থিক ও পারিবারিক সমস্যায় তাঁর পরামর্শ চান।
তানিয়ার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো নিজের উপার্জনে সন্তানদের পড়াতে পারা। মেয়ে যখন বলে, ‘আম্মু, তুমি না থাকলে আমার লেখাপড়া হইত না,’ তখন আনন্দে আর গর্বে তাঁর মন ভরে ওঠে।
সংসার আর ব্যবসা একসঙ্গে সামলানো সহজ নয়। লেনদেনের চাপ, ভুলের ঝুঁকি, নেটওয়ার্কের সমস্যা, হিসাব মেলানোর ঝামেলা তো আছেই। গ্রামে স্বামীহারা নারী আর তাঁর সন্তানদের নিরাপত্তার দুশ্চিন্তাও তাঁর নিত্যসঙ্গী।
ভিড় কমলে পাশের দোকানে বসে চা খান তানিয়া, পরিচিত নারীদের সঙ্গে গল্প করেন। কারও মেয়ের বিয়ে, কারও ছেলে বিদেশে গেছে, কারও ঘরে নতুন অতিথি এসেছে, এমন হরেক খবর এসে জমে এখানে। তানিয়া বলেন, ‘ঘরে বসে থাকলে তো এত মানুষের সাথে দেখা হইত না। আমার এখানে কত মানুষ আসে, কত কিছু জানতে পারি। এখানে আসলে ভালো লাগে।’
ফারুক মাঝিপ্রায় দিনই গাঙ্গে মোবাইলের টাকা ফুরাইয়া যায়। আফারে কই, ৫০ টাহা লোন দেন।ব্যবসাটা আরও বড় করতে চান তানিয়া, তবে সে জন্য দরকার পুঁজি। নিজের জন্য কিছু চান কি না, জানতে চাইলে হাসলেন। বললেন, ‘নিজের জন্য আর কী চাওয়ার আছে। ছোট পরিসরে হইলেও মানুষের জন্য কিছু করতে পারি, এইটাই আনন্দের। তবে এইটা আরও বড় পরিসরে করতে পারলে জীবনটাকে আরও বেশি সার্থক মনে হবে।’
ততক্ষণে হাটের ভিড় বেড়েছে। মাছের ডাক, সবজির দরদাম আর হাঁকডাকের মধ্যে আরেকজন গ্রাহক এসে দাঁড়িয়েছেন। খাতা সরিয়ে মুঠোফোন হাতে নিলেন তানিয়া।
একটি নম্বর, কয়েকটি সংখ্যা, একটি লেনদেন। এভাবেই প্রতিদিন এই ছোট্ট দোকান দিয়ে মানুষের শ্রমের টাকা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে যায়। কখনো তা সন্তানের পড়ার খরচ, কখনো ঘরের বাজার, কখনো অসুস্থ স্বজনের চিকিৎসার টাকা।
হাটের ভিড়ে তানিয়ার দোকানটি ছোট। কিন্তু জীবনের ঝড় পেরিয়ে সেখানে বসা নারীটির পৃথিবী আর আগের মতো ছোট নেই।
এম জসীম উদ্দীন, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, বরিশাল
কাজের ফাঁকে হেসে তানিয়া বললেন, ‘মানুষের টাকা, নিজের টাকা না। তাই খুব সাবধানে কাজ করতে হয়।’
তাদের পড়াশোনার খরচ আর ছোটখাটো আবদার, শাশুড়ির চিকিৎসা, বাজারসদাই, বিদ্যুৎ বিল, সবই মেটান ব্যবসার আয় থেকে। এতে ৩০ হাজার টাকার মতো তাঁর খরচ হয়। একা হাতে সংসার
আয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে তানিয়া স্মিত হেসে এড়িয়ে গেলেন। পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ২০২৪ সালে জমিজমা নিয়ে বিরোধে তাঁর স্বামী খুন হন। দুই শিশুসন্তান আর বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে তানিয়া পড়ে যান অকূলপাথারে।
এরপর এই ব্যবসা শুরু করেন তানিয়া। এখন একার আয়েই সংসার চলে। দোকানভাড়া দেন মাসে সাত হাজার টাকা। মেয়ে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে, ছেলে প্রথম শ্রেণিতে। তাদের পড়াশোনার খরচ আর ছোটখাটো আবদার, শাশুড়ির চিকিৎসা, বাজারসদাই, বিদ্যুৎ বিল, সবই মেটান ব্যবসার আয় থেকে। এতে ৩০ হাজার টাকার মতো তাঁর খরচ হয়।
এম জসীম উদ্দীন, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, বরিশালআস্থাই পুঁজি
তানিয়ার দোকানে যাঁরা আসেন, তাঁদের বেশির ভাগই পরিচিত। কেউ জেলে, কেউ কৃষক, কেউ ছোট ব্যবসায়ী। তাঁদের সন্তান বা স্বজন কাজ করেন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ নানা শহরে, কেউ কেউ বিদেশে। সরকারি নানা ভাতার টাকাও তোলা যায় এই দোকানে।
প্রায় আট কিলোমিটার দূরের চরলাঠিমারা থেকে নিয়মিত বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে আসেন আলী আজিম খান। অন্য কোথাও গিয়ে টাকা তোলার ভরসা পান না তিনি। বললেন, ‘তানিয়া আমাগো এলাকার মানুষ। আমি তো এই সব বুঝি না। তানিয়া আমারে চিনে, ওর কাছে আইলে টাহা তুইল্লা দেয়। অন্য জায়গায় গেলে ভয় লাগে। আইতে-যাইতে ৬০ টাহা খরচ হয়, তা-ও তানিয়ার কাছেই আসি।’
এই চেনাজানা আর আস্থাই তানিয়ার ব্যবসার বড় পুঁজি। ৫২ বছর বয়সী জেলে ফারুক মাঝি বলেন, ‘প্রায় দিনই গাঙ্গে মোবাইলের টাকা ফুরাইয়া যায়। আফারে কই, ৫০ টাহা লোন দেন।’ এমন অনুরোধ প্রায়ই পান তানিয়া, তা তিনি মেটানও।
ঘরের বাইরে নতুন পরিচয়
তানিয়ার দোকান তাই শুধু লেনদেনের জায়গা নয়, দরকারে ভরসারও জায়গা। দুই বছর আগেও ঘরের বাইরে তাঁর কোনো পরিচয় ছিল না। এখন নিজের গ্রাম ছাড়িয়ে প্রায় পুরো উপজেলার মানুষ তাঁকে চেনে। গ্রামের নারীরা আর্থিক ও পারিবারিক সমস্যায় তাঁর পরামর্শ চান।
তানিয়ার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো নিজের উপার্জনে সন্তানদের পড়াতে পারা। মেয়ে যখন বলে, ‘আম্মু, তুমি না থাকলে আমার লেখাপড়া হইত না,’ তখন আনন্দে আর গর্বে তাঁর মন ভরে ওঠে।
সংসার আর ব্যবসা একসঙ্গে সামলানো সহজ নয়। লেনদেনের চাপ, ভুলের ঝুঁকি, নেটওয়ার্কের সমস্যা, হিসাব মেলানোর ঝামেলা তো আছেই। গ্রামে স্বামীহারা নারী আর তাঁর সন্তানদের নিরাপত্তার দুশ্চিন্তাও তাঁর নিত্যসঙ্গী।
ভিড় কমলে পাশের দোকানে বসে চা খান তানিয়া, পরিচিত নারীদের সঙ্গে গল্প করেন। কারও মেয়ের বিয়ে, কারও ছেলে বিদেশে গেছে, কারও ঘরে নতুন অতিথি এসেছে, এমন হরেক খবর এসে জমে এখানে। তানিয়া বলেন, ‘ঘরে বসে থাকলে তো এত মানুষের সাথে দেখা হইত না। আমার এখানে কত মানুষ আসে, কত কিছু জানতে পারি। এখানে আসলে ভালো লাগে।’
ফারুক মাঝিপ্রায় দিনই গাঙ্গে মোবাইলের টাকা ফুরাইয়া যায়। আফারে কই, ৫০ টাহা লোন দেন।ব্যবসাটা আরও বড় করতে চান তানিয়া, তবে সে জন্য দরকার পুঁজি। নিজের জন্য কিছু চান কি না, জানতে চাইলে হাসলেন। বললেন, ‘নিজের জন্য আর কী চাওয়ার আছে। ছোট পরিসরে হইলেও মানুষের জন্য কিছু করতে পারি, এইটাই আনন্দের। তবে এইটা আরও বড় পরিসরে করতে পারলে জীবনটাকে আরও বেশি সার্থক মনে হবে।’
ততক্ষণে হাটের ভিড় বেড়েছে। মাছের ডাক, সবজির দরদাম আর হাঁকডাকের মধ্যে আরেকজন গ্রাহক এসে দাঁড়িয়েছেন। খাতা সরিয়ে মুঠোফোন হাতে নিলেন তানিয়া।
একটি নম্বর, কয়েকটি সংখ্যা, একটি লেনদেন। এভাবেই প্রতিদিন এই ছোট্ট দোকান দিয়ে মানুষের শ্রমের টাকা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে যায়। কখনো তা সন্তানের পড়ার খরচ, কখনো ঘরের বাজার, কখনো অসুস্থ স্বজনের চিকিৎসার টাকা।
হাটের ভিড়ে তানিয়ার দোকানটি ছোট। কিন্তু জীবনের ঝড় পেরিয়ে সেখানে বসা নারীটির পৃথিবী আর আগের মতো ছোট নেই।
এম জসীম উদ্দীন, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, বরিশাল
Source - www.prothomalo.com ↗