পর্ব ১
কিছু যাত্রা মানুষকে শুধু পাহাড়ের গভীরে নিয়ে যায় না, নিয়ে যায় নিজের অস্তিত্বের শেষ সীমা পর্যন্ত। যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে অনিশ্চয়তা, প্রতিটি বাঁকে অজানা বিপদ আর ক্লান্ত শরীরের কাছে বারবার হার মানতে চাওয়া মন। তবু মানুষ এগিয়ে যায় সাহস, জেদ আর বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাকে সঙ্গী করে। থানচি–রুমা সার্কিট ট্রেইলে আমার চার দিনের অভিযান ছিল তেমনই এক অভিজ্ঞতা। জীবনের সবচেয়ে কঠিন, ভয়ংকর অথচ অবিস্মরণীয় এ যাত্রায় দেখেছি তিনটি বুনো জলপ্রপাত—তারপে সাইতার, জাদিপাই ও ত্লাবং। তবে এ গল্প শুধু পাহাড় আর জলপ্রপাতের নয়; এ গল্প ভয়কে জয় করার, অচেনা মানুষের আপন হয়ে ওঠার এবং প্রকৃতির বিশালতার সামনে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার।
থানচি থেকে রুমা: দুর্গম পথে নিজেকে জানার অভিযান

চকরিয়া থেকে আলীকদম হয়ে থানচি: পাহাড়ের পথে যাত্রা শুরু
ঢাকা থেকে বাসে চকরিয়া। সেখান থেকে ফাইস্যাখালী হয়ে চান্দের গাড়িতে আলীকদমের পানবাজার। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক, সবুজ উপত্যকা আর মেঘের ছায়ায় ঢাকা দূরের চূড়া—পথের শুরুতেই প্রকৃতি যেন আমাদের অন্য এক জগতে স্বাগত জানাল।
ইন হোটেলে সতেজ হয়ে সকালের নাশতা সেরে নেওয়াআলীকদমে দামতুয়া ইন হোটেলে সতেজ হয়ে সকালের নাশতা সেরে আবার রওনা দিলাম থানচির উদ্দেশে। সামনে প্রায় ৩৪ কিলোমিটারের পাহাড়ি সড়ক, তারপর অপেক্ষা করছে মূল অভিযান।
ছয়-সাত কিলোমিটার এগোতেই শুরু হলো খাড়া চড়াই আর আঁকাবাঁকা পথ। জিসানের মোটরসাইকেলটি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠছিল কষ্ট করে। দুপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়, দূরে জনমানবহীন সবুজের বিস্তার। প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম ছিলা সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে। ডিম পাহাড় হয়ে থানচির পথে এগোতে প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হয় এখানে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে আবার যাত্রা শুরু।
পাহাড়ি পথের এ সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভব করারও। প্রতিটি বাঁকে বদলে যাচ্ছিল দৃশ্য আর অজানার প্রতি কৌতূহল বাড়ছিল আরও।
চৌদ্দজনের দল, চার দিনে এক পরিবার
ভ্রমণসঙ্গীরাআমিসহ চৌদ্দজনের এ দলে বেশির ভাগই ছিলেন নতুন ভ্রমণসঙ্গী। অথচ চার দিনের পথচলায় কখন যে অপরিচিত মানুষগুলো আপন হয়ে উঠলেন, টেরই পাইনি। ক্লান্তি ভাগ করে নেওয়া, খাবার এগিয়ে দেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো আর একসঙ্গে হাসতে হাসতেই তৈরি হয়েছিল পরিবারের মতো এক বন্ধন।
থানচিতে পৌঁছে মনে হলো, এবার সত্যিই অভিযানের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে দুর্গম পাহাড়, গভীর অরণ্য, পাথুরে পথ আর দীর্ঘ চড়াই-উতরাই। এখানে দূরত্বের হিসাব কেবল কিলোমিটারে হয় না; কয়েক কিলোমিটার পথও কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিয়ে নেয়।
বাকলাই পাড়ার প্রবেশমুখথানচি থেকে চান্দের গাড়িতে রওনা দিলাম বাকলাই পাড়ার দিকে। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পৌঁছালাম বাকলাই পাড়া সেনাক্যাম্পের কাছাকাছি। এলাকাটিতে প্রবেশের বিধিনিষেধ থাকায় নিয়ম ও অনুমতির বিষয়টি মাথায় রেখে এগোতে হলো। এরপরের পথ পাড়ি দিতে হবে পায়ে হেঁটে, কাঁধে নিজের ব্যাগ নিয়ে।
বাকলাই পাড়ায় পৌঁছে পাহাড়ের সতেজ পেঁপে খেয়ে প্রাণ জুড়াল। কিন্তু বিশ্রামের অবকাশ বেশি ছিল না। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছিল, আমাদের গন্তব্য থাইক্ষ্যং পাড়া। ফেরার পথে দেখা হবে রোমাঞ্চকর বাকলাই জলপ্রপাতের সঙ্গে।
ঝুম বৃষ্টি, জোঁক আর দুর্গম ট্রেইল
বাকলাই পাড়া থেকে থাইক্ষ্যং পাড়ায় পৌঁছাতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বা পরিস্থিতিভেদে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। বৃষ্টি নামলে কিংবা অন্ধকার ঘনিয়ে এলে পথ হয়ে ওঠে আরও বিপজ্জনক। আমরা যখন পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ, ঠিক সেই সময়েই যেন প্রকৃতি আমাদের ভাবনার জবাব দিল—যাত্রা শুরুর আগেই নেমে এল ঝুম বৃষ্টি।
বাকলাই পাড়ার চার্চ আর বৃষ্টিদুর্গম এলাকায় চার দিনের খাবার ও প্রয়োজনীয় রসদ নিজেদেরই বহন করতে হয়। আমাদের দলের প্রত্যেকের ব্যাগে ভাগ করে দেওয়া হলো কিছু না কিছু খাবার। এ ভাগাভাগির মধ্যেও ছিল বড় শিক্ষা—সব দায়িত্ব একজনের নয়, প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে চলাই দলের শক্তি।
প্রথম দিকে পথ মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই পেরোচ্ছিলাম। কখনো গাছের বিশাল শিকড় ও বাকল ডিঙিয়ে, কখনো খাড়া চড়াই বেয়ে ওপরে উঠছি, আবার কখনো পিচ্ছিল ঢাল ধরে নিচে নামছি। এভাবে পৌঁছালাম একটি ওয়াই আকৃতির পথের সংযোগস্থলে। বাঁয়ের পথ বাকলাই জলপ্রপাতের দিকে, ডানের পথ থাইক্ষ্যং পাড়ার দিকে।
মাংকি ফরেস্টের আতংক গ্রিন পিট ভাইপার সেখানেই শুরু হলো জোঁকের উপদ্রব। পাহাড়ি ঝিরিতে পা রাখতেই দলের অনেকের শরীরে জোঁক লেগে গেল। জোঁক ছাড়িয়ে, কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম। টিম লিডার আকরাম ভাই ও সিয়াম সতর্ক করে দিলেন, সামনের পথ পিচ্ছিল ও দুর্গম—বিশেষ করে অন্ধকারে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হবে ভেবেচিন্তে।
পাহাড়ের সৌন্দর্য যতই মোহিত করুক, এমন পথে অসতর্ক হওয়ার সুযোগ নেই।
অরণ্যের দৈত্যাকার বৃক্ষ আর হারিয়ে যাওয়া গান
দৈত্যাকার বইলাম বৃক্ষপথে চোখে পড়ছিল বিশাল সব বুনো গাছ। চুন্দুল, গর্জন ও বৈলামের মতো বৃক্ষ পাহাড়ি অরণ্যের প্রাকৃতিক ছাউনি গড়ে তুলেছে। মোটা কাণ্ড, আকাশছোঁয়া ডালপালা আর ঘন সবুজের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এ অরণ্য বহু যুগের নীরব সাক্ষী। ঝিরির ওপর কাঠের সাঁকো, চারপাশে নাম না জানা পোকার ডাক আর বৃষ্টিভেজা পাতার গন্ধ—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজের মতো করে গল্প বলে চলেছে।
সাঁকো পার হতে হতে মনে পড়ে গেল হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শোনা সেই চিরচেনা গান—‘এই পথ যদি না শেষ হয়’।
জীবনে প্রথমবার গানটি শুনে মনে হচ্ছিল, পথটা যেন সত্যিই শেষ না হলেই ভালো! অবশ্য তখন রোমান্টিকতার চেয়ে ক্লান্তিই ছিল বেশি। পিচ্ছিল পথে বারবার পিছলে যাচ্ছিলাম, হোঁচট খাচ্ছিলাম। সামনে কতটা পথ বাকি, কখন বিশ্রাম মিলবে, কিছুই নিশ্চিত নয়। তখনই বুঝতে পারছিলাম, পাহাড়ের কাছে নিজের শক্তি ও সহ্যক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়।
এভাবে পার হতে হয়েছে পিচ্ছিল পথদলের তিন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক আকরাম ভাই, সিয়াম ও অর্পণ দাদা পাশে না থাকলে আমার জন্য এ পথ পাড়ি দেওয়া আরও কঠিন হতো। তাঁদের পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রতিটি পদক্ষেপে সাহস জুগিয়েছে। ইসমাইল ভাইয়ের হাইকিং স্টিকটিও চার দিনের অভিযানে বন্ধুর মতো পাশে ছিল।
এভাবেই চলতে হয় পাহাড়ের পথেক্লান্তির মধ্যে স্বস্তি বলতে কখনো ছোট্ট বিরতি, কখনো সিয়ামের ক্যাম্পিং বার্নার স্টোভে তৈরি গরম কফি আর বিস্কুট। বাণী আপুর বাদাম, অর্পণ দাদার খেজুরও জুগিয়েছে নতুন শক্তি। রাজু ভাই, উজ্জ্বল ভাই, মোদাসসের ভাই, নাজমুল ভাই, স্বর্ণালী আপু ও সোহেল ভাই—সবাই মিলে হয়ে উঠছিলেন এ পাহাড়ি গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রুশমিলা: দুর্গম পথে একটুকরো আলো
রুশমিলার সঙ্গে লেখকএ অভিযানের অন্যতম সুন্দর প্রাপ্তি রুশমিলা। দলের এই তরুণী নিজের অষ্টাদশ জন্মদিন উদ্যাপন করতে তার ফুফু, আমাদের প্রিয় বাণী আপুর সঙ্গে এসেছেন দুর্গম পাহাড়ি পথে। বই পড়তে ভালোবাসেন তিনি। তারুণ্যের এমন ব্যতিক্রমী আগ্রহ ও সাহস আমাকে মুগ্ধ করেছে।
আমরা যখন নতুন প্রজন্মকে নিয়ে নানা হতাশার কথা বলি, তখন রুশমিলার মতো কাউকে দেখে মনে হয়, আশার আলো নিভে যায়নি। এই প্রজন্মের মধ্যেও প্রকৃতিকে ভালোবাসার, নতুন কিছু জানার এবং নিজের পরিচিত গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
স্বর্গের দুয়ারে দুবারএক দুপুরে স্বর্গের সিঁড়িতেগিলপিনের ভোর থেকে ক্যাসলরিগের প্রাচীন পাথরেপাহাড় যেন এভাবেই মানুষকে টানে। কাউকে সৌন্দর্যের কাছে, কাউকে নিজের অজানা সামর্থ্যের কাছে, আবার কাউকে এমন অভিজ্ঞতার কাছে, যা জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।
নক্ষত্রভরা আকাশের নিচে থাইক্ষ্যং পাড়া
হৃদয় বিদীর্ণ করা হারভেস্ট মুনহৃদয় বিদীর্ণ করা এক ফালি হারভেস্ট মুনথাইক্ষ্যং পাড়ার ঠিক আগে আরেকটি ওয়াই আকৃতির পথ। এক দিকের পথ জাদিপাই জলপ্রপাতের দিকে, অন্যটি পাড়ার দিকে চলে গেছে। চারপাশে অরণ্যের গভীরতা, নাম না জানা পোকার একটানা ডাক আর মাথার ওপর হারভেস্ট মুনের আলোয় ভেসে থাকা আকাশ।
নক্ষত্রভরা আকাশের নিচে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, একদিন আমরাও হারিয়ে যাব নক্ষত্রের দেশে। হয়তো সেই অচেনা দূরত্ব থেকে কোনো একদিন দেখব, অন্য কোনো দুঃসাহসী অভিযাত্রী হেঁটে চলেছে এমনই কোনো বুনো পাহাড়ি পথে।
কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরতেই হলো। সামনে তখনো বাকি পথ।
দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার ট্রেকিং শেষে অবশেষে পৌঁছালাম থাইক্ষ্যং পাড়ায়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে মাচাঘরে বসে ছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, মনে নেই।
এ স্বাদ যেন অমৃতঘুম ভাঙল টিম লিডারের ডাকে। কাপড় বদলে সতেজ হওয়ার মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল রাতের খাবার—মুরগির মাংস, ডাল, আলুভর্তা, ডিমভর্তা আর ভাত। দুর্গম পথ পেরিয়ে এমন খাবার যে কতটা তৃপ্তি দিতে পারে, তা সেদিন বুঝেছি। মনে হচ্ছিল, আমাদের সঙ্গীরাই যেন একেকজন দক্ষ রন্ধনশিল্পী!
খাওয়া শেষে গল্প-আড্ডায় কেটে গেল কিছুটা সময়। তারপর ঘুম। বাইরে পাহাড়ের রাত, অরণ্যের নিস্তব্ধতা আর আকাশজুড়ে নক্ষত্র। পরদিনের গন্তব্য মাঙ্কি ট্রেইল ধরে তারপে সাইতার জলপ্রপাত। নতুন দিনের নতুন অভিযানের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়লাম।
পাহাড়ের কাছে ফিরে পাওয়া নিজেকে
থানচি–রুমা সার্কিট ট্রেইলে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু তিনটি জলপ্রপাত দেখা কিংবা দুর্গম পথ পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো নয়। এ যাত্রা আমাকে শিখিয়েছে, ক্লান্তি আর ভয় যখন একসঙ্গে ঘিরে ধরে, তখনো মানুষ নিজের ভেতর থেকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি খুঁজে পেতে পারে। শিখেছি, সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়; বরং ভয়কে বুঝে, নিজের সামর্থ্য ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সামনে এগোনোর চেষ্টা করা।
পাহাড় ডাকে আয়পাহাড়ের সৌন্দর্য মানুষকে কাছে টানে, কিন্তু পাহাড়ের নিয়মকে সম্মান করেই সেখানে টিকে থাকতে হয়। দলের মানুষের ওপর আস্থা, পরস্পরের সহযোগিতা আর সঠিক সিদ্ধান্তই দুর্গম অভিযানের সবচেয়ে বড় ভরসা।
থানচি থেকে রুমার পথে আমি শুধু পাহাড় পেরিয়ে আসিনি, নিজের ভেতরের কিছু অচেনা পথও চিনে ফিরেছি। ফিরে এসেছি ক্লান্ত শরীর নিয়ে, কিন্তু মনে জমেছে নতুন উপলব্ধি—জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করতে হলে কখনো কখনো পরিচিত পৃথিবী থেকে অনেক দূরে যেতে হয়।
কিছু অভিযান শেষ হয় গন্তব্যে পৌঁছে, কিছু শেষ হয় ঘরে ফিরে। আর কিছু অভিযান মনের ভেতর চলতেই থাকে—ঝিরির জলে, অরণ্যের ছায়ায়, পাহাড়ের বাঁকে আর নক্ষত্রভরা রাতের নিচে।
নিজেকে জানার অভিযান তাই থেমে থাকে না। পাহাড়ের কাছে গিয়ে এবার নিজেকে নতুন করে চিনেছি; সামনে আরও কত অজানা পথ, কত গল্প, কত বিস্ময় অপেক্ষা করছে—সেই ডাকেই আবার বেরিয়ে পড়ব। (চলবে)
ছবি: লেখক
নোট: তারপে সাইতার জলপ্রপাতের পথে মাঙ্কি ট্রেইলের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা থাকছে পরবর্তী পর্বে।
ঢাকা থেকে বাসে চকরিয়া। সেখান থেকে ফাইস্যাখালী হয়ে চান্দের গাড়িতে আলীকদমের পানবাজার। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক, সবুজ উপত্যকা আর মেঘের ছায়ায় ঢাকা দূরের চূড়া—পথের শুরুতেই প্রকৃতি যেন আমাদের অন্য এক জগতে স্বাগত জানাল।
ইন হোটেলে সতেজ হয়ে সকালের নাশতা সেরে নেওয়াআলীকদমে দামতুয়া ইন হোটেলে সতেজ হয়ে সকালের নাশতা সেরে আবার রওনা দিলাম থানচির উদ্দেশে। সামনে প্রায় ৩৪ কিলোমিটারের পাহাড়ি সড়ক, তারপর অপেক্ষা করছে মূল অভিযান।
ছয়-সাত কিলোমিটার এগোতেই শুরু হলো খাড়া চড়াই আর আঁকাবাঁকা পথ। জিসানের মোটরসাইকেলটি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠছিল কষ্ট করে। দুপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়, দূরে জনমানবহীন সবুজের বিস্তার। প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম ছিলা সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে। ডিম পাহাড় হয়ে থানচির পথে এগোতে প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হয় এখানে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে আবার যাত্রা শুরু।
পাহাড়ি পথের এ সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভব করারও। প্রতিটি বাঁকে বদলে যাচ্ছিল দৃশ্য আর অজানার প্রতি কৌতূহল বাড়ছিল আরও।
চৌদ্দজনের দল, চার দিনে এক পরিবার
ভ্রমণসঙ্গীরাআমিসহ চৌদ্দজনের এ দলে বেশির ভাগই ছিলেন নতুন ভ্রমণসঙ্গী। অথচ চার দিনের পথচলায় কখন যে অপরিচিত মানুষগুলো আপন হয়ে উঠলেন, টেরই পাইনি। ক্লান্তি ভাগ করে নেওয়া, খাবার এগিয়ে দেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো আর একসঙ্গে হাসতে হাসতেই তৈরি হয়েছিল পরিবারের মতো এক বন্ধন।
থানচিতে পৌঁছে মনে হলো, এবার সত্যিই অভিযানের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে দুর্গম পাহাড়, গভীর অরণ্য, পাথুরে পথ আর দীর্ঘ চড়াই-উতরাই। এখানে দূরত্বের হিসাব কেবল কিলোমিটারে হয় না; কয়েক কিলোমিটার পথও কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিয়ে নেয়।
বাকলাই পাড়ার প্রবেশমুখথানচি থেকে চান্দের গাড়িতে রওনা দিলাম বাকলাই পাড়ার দিকে। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পৌঁছালাম বাকলাই পাড়া সেনাক্যাম্পের কাছাকাছি। এলাকাটিতে প্রবেশের বিধিনিষেধ থাকায় নিয়ম ও অনুমতির বিষয়টি মাথায় রেখে এগোতে হলো। এরপরের পথ পাড়ি দিতে হবে পায়ে হেঁটে, কাঁধে নিজের ব্যাগ নিয়ে।
বাকলাই পাড়ায় পৌঁছে পাহাড়ের সতেজ পেঁপে খেয়ে প্রাণ জুড়াল। কিন্তু বিশ্রামের অবকাশ বেশি ছিল না। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছিল, আমাদের গন্তব্য থাইক্ষ্যং পাড়া। ফেরার পথে দেখা হবে রোমাঞ্চকর বাকলাই জলপ্রপাতের সঙ্গে।
ঝুম বৃষ্টি, জোঁক আর দুর্গম ট্রেইল
বাকলাই পাড়া থেকে থাইক্ষ্যং পাড়ায় পৌঁছাতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বা পরিস্থিতিভেদে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। বৃষ্টি নামলে কিংবা অন্ধকার ঘনিয়ে এলে পথ হয়ে ওঠে আরও বিপজ্জনক। আমরা যখন পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ, ঠিক সেই সময়েই যেন প্রকৃতি আমাদের ভাবনার জবাব দিল—যাত্রা শুরুর আগেই নেমে এল ঝুম বৃষ্টি।
বাকলাই পাড়ার চার্চ আর বৃষ্টিদুর্গম এলাকায় চার দিনের খাবার ও প্রয়োজনীয় রসদ নিজেদেরই বহন করতে হয়। আমাদের দলের প্রত্যেকের ব্যাগে ভাগ করে দেওয়া হলো কিছু না কিছু খাবার। এ ভাগাভাগির মধ্যেও ছিল বড় শিক্ষা—সব দায়িত্ব একজনের নয়, প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে চলাই দলের শক্তি।
প্রথম দিকে পথ মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই পেরোচ্ছিলাম। কখনো গাছের বিশাল শিকড় ও বাকল ডিঙিয়ে, কখনো খাড়া চড়াই বেয়ে ওপরে উঠছি, আবার কখনো পিচ্ছিল ঢাল ধরে নিচে নামছি। এভাবে পৌঁছালাম একটি ওয়াই আকৃতির পথের সংযোগস্থলে। বাঁয়ের পথ বাকলাই জলপ্রপাতের দিকে, ডানের পথ থাইক্ষ্যং পাড়ার দিকে।
মাংকি ফরেস্টের আতংক গ্রিন পিট ভাইপার সেখানেই শুরু হলো জোঁকের উপদ্রব। পাহাড়ি ঝিরিতে পা রাখতেই দলের অনেকের শরীরে জোঁক লেগে গেল। জোঁক ছাড়িয়ে, কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম। টিম লিডার আকরাম ভাই ও সিয়াম সতর্ক করে দিলেন, সামনের পথ পিচ্ছিল ও দুর্গম—বিশেষ করে অন্ধকারে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হবে ভেবেচিন্তে।
পাহাড়ের সৌন্দর্য যতই মোহিত করুক, এমন পথে অসতর্ক হওয়ার সুযোগ নেই।
অরণ্যের দৈত্যাকার বৃক্ষ আর হারিয়ে যাওয়া গান
দৈত্যাকার বইলাম বৃক্ষপথে চোখে পড়ছিল বিশাল সব বুনো গাছ। চুন্দুল, গর্জন ও বৈলামের মতো বৃক্ষ পাহাড়ি অরণ্যের প্রাকৃতিক ছাউনি গড়ে তুলেছে। মোটা কাণ্ড, আকাশছোঁয়া ডালপালা আর ঘন সবুজের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এ অরণ্য বহু যুগের নীরব সাক্ষী। ঝিরির ওপর কাঠের সাঁকো, চারপাশে নাম না জানা পোকার ডাক আর বৃষ্টিভেজা পাতার গন্ধ—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজের মতো করে গল্প বলে চলেছে।
সাঁকো পার হতে হতে মনে পড়ে গেল হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শোনা সেই চিরচেনা গান—‘এই পথ যদি না শেষ হয়’।
জীবনে প্রথমবার গানটি শুনে মনে হচ্ছিল, পথটা যেন সত্যিই শেষ না হলেই ভালো! অবশ্য তখন রোমান্টিকতার চেয়ে ক্লান্তিই ছিল বেশি। পিচ্ছিল পথে বারবার পিছলে যাচ্ছিলাম, হোঁচট খাচ্ছিলাম। সামনে কতটা পথ বাকি, কখন বিশ্রাম মিলবে, কিছুই নিশ্চিত নয়। তখনই বুঝতে পারছিলাম, পাহাড়ের কাছে নিজের শক্তি ও সহ্যক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়।
এভাবে পার হতে হয়েছে পিচ্ছিল পথদলের তিন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক আকরাম ভাই, সিয়াম ও অর্পণ দাদা পাশে না থাকলে আমার জন্য এ পথ পাড়ি দেওয়া আরও কঠিন হতো। তাঁদের পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রতিটি পদক্ষেপে সাহস জুগিয়েছে। ইসমাইল ভাইয়ের হাইকিং স্টিকটিও চার দিনের অভিযানে বন্ধুর মতো পাশে ছিল।
এভাবেই চলতে হয় পাহাড়ের পথেক্লান্তির মধ্যে স্বস্তি বলতে কখনো ছোট্ট বিরতি, কখনো সিয়ামের ক্যাম্পিং বার্নার স্টোভে তৈরি গরম কফি আর বিস্কুট। বাণী আপুর বাদাম, অর্পণ দাদার খেজুরও জুগিয়েছে নতুন শক্তি। রাজু ভাই, উজ্জ্বল ভাই, মোদাসসের ভাই, নাজমুল ভাই, স্বর্ণালী আপু ও সোহেল ভাই—সবাই মিলে হয়ে উঠছিলেন এ পাহাড়ি গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রুশমিলা: দুর্গম পথে একটুকরো আলো
রুশমিলার সঙ্গে লেখকএ অভিযানের অন্যতম সুন্দর প্রাপ্তি রুশমিলা। দলের এই তরুণী নিজের অষ্টাদশ জন্মদিন উদ্যাপন করতে তার ফুফু, আমাদের প্রিয় বাণী আপুর সঙ্গে এসেছেন দুর্গম পাহাড়ি পথে। বই পড়তে ভালোবাসেন তিনি। তারুণ্যের এমন ব্যতিক্রমী আগ্রহ ও সাহস আমাকে মুগ্ধ করেছে।
আমরা যখন নতুন প্রজন্মকে নিয়ে নানা হতাশার কথা বলি, তখন রুশমিলার মতো কাউকে দেখে মনে হয়, আশার আলো নিভে যায়নি। এই প্রজন্মের মধ্যেও প্রকৃতিকে ভালোবাসার, নতুন কিছু জানার এবং নিজের পরিচিত গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
স্বর্গের দুয়ারে দুবারএক দুপুরে স্বর্গের সিঁড়িতেগিলপিনের ভোর থেকে ক্যাসলরিগের প্রাচীন পাথরেপাহাড় যেন এভাবেই মানুষকে টানে। কাউকে সৌন্দর্যের কাছে, কাউকে নিজের অজানা সামর্থ্যের কাছে, আবার কাউকে এমন অভিজ্ঞতার কাছে, যা জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।
নক্ষত্রভরা আকাশের নিচে থাইক্ষ্যং পাড়া
হৃদয় বিদীর্ণ করা হারভেস্ট মুনহৃদয় বিদীর্ণ করা এক ফালি হারভেস্ট মুনথাইক্ষ্যং পাড়ার ঠিক আগে আরেকটি ওয়াই আকৃতির পথ। এক দিকের পথ জাদিপাই জলপ্রপাতের দিকে, অন্যটি পাড়ার দিকে চলে গেছে। চারপাশে অরণ্যের গভীরতা, নাম না জানা পোকার একটানা ডাক আর মাথার ওপর হারভেস্ট মুনের আলোয় ভেসে থাকা আকাশ।
নক্ষত্রভরা আকাশের নিচে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, একদিন আমরাও হারিয়ে যাব নক্ষত্রের দেশে। হয়তো সেই অচেনা দূরত্ব থেকে কোনো একদিন দেখব, অন্য কোনো দুঃসাহসী অভিযাত্রী হেঁটে চলেছে এমনই কোনো বুনো পাহাড়ি পথে।
কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরতেই হলো। সামনে তখনো বাকি পথ।
দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার ট্রেকিং শেষে অবশেষে পৌঁছালাম থাইক্ষ্যং পাড়ায়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে মাচাঘরে বসে ছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, মনে নেই।
এ স্বাদ যেন অমৃতঘুম ভাঙল টিম লিডারের ডাকে। কাপড় বদলে সতেজ হওয়ার মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল রাতের খাবার—মুরগির মাংস, ডাল, আলুভর্তা, ডিমভর্তা আর ভাত। দুর্গম পথ পেরিয়ে এমন খাবার যে কতটা তৃপ্তি দিতে পারে, তা সেদিন বুঝেছি। মনে হচ্ছিল, আমাদের সঙ্গীরাই যেন একেকজন দক্ষ রন্ধনশিল্পী!
খাওয়া শেষে গল্প-আড্ডায় কেটে গেল কিছুটা সময়। তারপর ঘুম। বাইরে পাহাড়ের রাত, অরণ্যের নিস্তব্ধতা আর আকাশজুড়ে নক্ষত্র। পরদিনের গন্তব্য মাঙ্কি ট্রেইল ধরে তারপে সাইতার জলপ্রপাত। নতুন দিনের নতুন অভিযানের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়লাম।
পাহাড়ের কাছে ফিরে পাওয়া নিজেকে
থানচি–রুমা সার্কিট ট্রেইলে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু তিনটি জলপ্রপাত দেখা কিংবা দুর্গম পথ পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো নয়। এ যাত্রা আমাকে শিখিয়েছে, ক্লান্তি আর ভয় যখন একসঙ্গে ঘিরে ধরে, তখনো মানুষ নিজের ভেতর থেকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি খুঁজে পেতে পারে। শিখেছি, সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়; বরং ভয়কে বুঝে, নিজের সামর্থ্য ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সামনে এগোনোর চেষ্টা করা।
পাহাড় ডাকে আয়পাহাড়ের সৌন্দর্য মানুষকে কাছে টানে, কিন্তু পাহাড়ের নিয়মকে সম্মান করেই সেখানে টিকে থাকতে হয়। দলের মানুষের ওপর আস্থা, পরস্পরের সহযোগিতা আর সঠিক সিদ্ধান্তই দুর্গম অভিযানের সবচেয়ে বড় ভরসা।
থানচি থেকে রুমার পথে আমি শুধু পাহাড় পেরিয়ে আসিনি, নিজের ভেতরের কিছু অচেনা পথও চিনে ফিরেছি। ফিরে এসেছি ক্লান্ত শরীর নিয়ে, কিন্তু মনে জমেছে নতুন উপলব্ধি—জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করতে হলে কখনো কখনো পরিচিত পৃথিবী থেকে অনেক দূরে যেতে হয়।
কিছু অভিযান শেষ হয় গন্তব্যে পৌঁছে, কিছু শেষ হয় ঘরে ফিরে। আর কিছু অভিযান মনের ভেতর চলতেই থাকে—ঝিরির জলে, অরণ্যের ছায়ায়, পাহাড়ের বাঁকে আর নক্ষত্রভরা রাতের নিচে।
নিজেকে জানার অভিযান তাই থেমে থাকে না। পাহাড়ের কাছে গিয়ে এবার নিজেকে নতুন করে চিনেছি; সামনে আরও কত অজানা পথ, কত গল্প, কত বিস্ময় অপেক্ষা করছে—সেই ডাকেই আবার বেরিয়ে পড়ব। (চলবে)
ছবি: লেখক
নোট: তারপে সাইতার জলপ্রপাতের পথে মাঙ্কি ট্রেইলের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা থাকছে পরবর্তী পর্বে।
Source - www.haal.fashion ↗