Bangladesh · 2026-11-06 14:28:34

স্লোভেনিয়া: প্রকৃতি আর সুরের নিরিবিলি মেলবন্ধন

স্লোভেনিয়া: প্রকৃতি আর সুরের নিরিবিলি মেলবন্ধন
জাগরেব থেকে ট্রেনযাত্রা। সকাল সাড়ে নয়টা, ৯ জুন ২০২৪। জাগরেব কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন থেকে রওনা দিয়ে পাহাড়, নদী, সবুজ প্রান্তর আর ছোট ছোট জনপদ পেরিয়ে আড়াই ঘণ্টার এক নান্দনিক রেলযাত্রায় পৌঁছে গেলাম স্লোভেনিয়ার রাজধানী লিউব্লিয়ানা।
জাগরেব থেকে ট্রেন ছাড়ার পর শহরের ঘনবসতি, বহুতল ভবন আর নাগরিক কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রইল। জানালার ওপারে খুলে যেতে লাগল ক্রোয়েশিয়ার গ্রামীণ ভূপ্রকৃতির এক শান্ত, সবুজ ক্যানভাস। কোথাও বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, কোথাও চাষের জমি, আবার কোথাও গাছপালায় ঘেরা ছোট ছোট জনপদ। দূরে নীলচে পাহাড়ের সারি দিগন্তের সঙ্গে মিশে আছে। মাঝেমধ্যে চোখে পড়ছিল লাল টালির ছাদের বাড়ি, গির্জার চূড়া আর নির্জন রেলক্রসিং। রেললাইনের দুই পাশের দৃশ্য যেন একের পর এক বদলে যাওয়া জলরঙের ছবি।
ক্রোয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলের এই ভূপ্রকৃতিতে সমতল কৃষিজমি, মৃদু ঢেউখেলানো ভূমি আর দূরবর্তী পাহাড়ের মেলবন্ধন রয়েছে। ট্রেন এগিয়ে চলেছে উত্তর-পশ্চিম দিকে, স্লোভেনিয়ার সীমান্তের দিকে। পথের দৃশ্যেও যেন ধীরে ধীরে পরিবর্তনের আভাস। সবুজ মাঠের ফাঁকে বনভূমি ঘন হয়ে উঠছে, কোথাও ছোট নদী কিংবা জলধারা রেলপথের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও বাড়িঘর ছাপিয়ে প্রকৃতিই হয়ে উঠছে দৃশ্যপটের প্রধান চরিত্র।
রেলযাত্রায় ইউরোপের ভূগোলকে খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায়। বিমানে কয়েক শ কিলোমিটার পাড়ি দিতে সময় লাগে অল্প, কিন্তু ট্রেনের জানালায় চোখ রেখে একটি দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার মধ্যে রয়েছে অন্য রকম আনন্দ। এখানে দূরত্ব শুধু মানচিত্রের মাপ নয়; মাঠের রং, গাছের সারি, জনপদের বিন্যাস আর দিগন্তের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই দূরত্ব ধীরে ধীরে অনুভূত হয়।
সকাল গড়িয়ে যখন স্লোভেনিয়ার রাজধানী লিউব্লিয়ানায় পৌঁছলাম, তখন মনে হলো, ক্রোয়েশিয়ার গ্রামীণ সবুজ পেরিয়ে এসে পৌঁছেছি এমন এক শহরে, যেখানে নদী, সেতু, পুরোনো স্থাপত্য আর সবুজের সমন্বয়ে অপেক্ষা করছে মধ্য ইউরোপের আরেকটি শান্ত অধ্যায়।
লিউব্লিয়ানা
লিউব্লিয়ানা —স্লোভেনীয় ভাষায় Ljubljana—দেশটির রাজধানী এবং প্রধান সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। স্লোভেনীয় রাজধানীকে বাংলায় লিখতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছিল, সহজ উচ্চারণের জন্যে অনেকে লুব্লিয়ানা বলে। কোনটি সঠিক বানান, গুগলের কাছে জানতে চাইলাম। গুগলের পরামর্শে শেষতক লিউব্লিয়ানাকে বেছে নিলাম।
প্রায় তিন লাখ মানুষের এই শহর বড় কোনো ইউরোপীয় মহানগরের মতো ব্যস্ত বা ভারী নয়; বরং ছোট, ছিমছাম, সবুজ এবং হেঁটে ঘুরে দেখার জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক। শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্রের বড় অংশই পথচারীদের জন্য সংরক্ষিত। লুবলিয়ানিকা নদী, তার ওপরের সেতু, পুরোনো ভবন, খোলা চত্বর, ক্যাফে আর ছোট ছোট দোকান মিলিয়ে শহরটিকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র সৌন্দর্য।
স্লোভেনিয়া মধ্য ইউরোপের একটি ছোট দেশ। মধ্য ইউরোপের দক্ষিণে অবস্থিত আল্পস পর্বতমালা এবং ভূমধ্যসাগরের মিলনস্থলে গড়ে ওঠা স্লোভেনিয়ার আয়তন প্রায় ২০ হাজার২৭৩ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ২১ লাখ। এটি ইউরোপের অন্যতম সবুজ দেশ, মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা বনে ঘেরা। ইউরোপের ‘সবুজ রাজধানী’ হিসেবে রয়েছে স্বীকৃতি।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.comআল্পস পর্বতের চূড়া, বিস্তীর্ণ বনভূমি, নদী, হ্রদ আর অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের নৈকট্য—ভূপ্রকৃতির অসাধারণ বহুমাত্রিকতায় একটি চোখজুড়ানো সুন্দর দেশ স্লোভেনিয়া। অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজের সমারোহ এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য খ্যাত স্লোভেনিয়ার উত্তর দিকে অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, ইতালি এবং দক্ষিণে ক্রোয়েশিয়া অবস্থিত। স্লোভেনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), ন্যাটো (NATO) ও শেনজেন (Schengen) অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশ হিসেবে পরিচিত।
রাজধানী লিউব্লিয়ানা যেন সেই বৈচিত্র্যেরই এক শান্ত, পরিপাটি প্রতিচ্ছবি। স্টেশন থেকে মিনিট সাতেক হেঁটেই পৌঁছে গেলাম আইবিস স্টাইলস লিউব্লিয়ানা সেন্ট্রাল হোটেলে। শহরের কেন্দ্রস্থলে মিকলোশিচেভা সড়কের ওপর হোটেলটির অবস্থান। আধুনিক নকশার তিন তারকা এই হোটেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এর কেন্দ্রীয় অবস্থান। শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্র, প্রাণবন্ত প্রেশেরেন চত্বর এবং বিখ্যাত ট্রিপল ব্রিজও ছিল হাঁটার নাগালের মধ্যে। ফলে শহরটিকে কাছ থেকে দেখার জন্য পদব্রজ এক উপযোগী মাধ্যম।
হোটেলের সাজসজ্জায় ছিল আধুনিক নগরজীবনের ছাপ। স্লোভেনীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরা দেয়ালচিত্র, পরিচ্ছন্ন ও সমকালীন নকশার কক্ষ এবং বিশ্রাম ও আড্ডার জন্য সাজানো অভ্যন্তরীণ পরিসর—সব মিলিয়ে জায়গাটিতে ছিল এক স্বচ্ছন্দ পরিবেশ। হোটেলের ছাদে একটি বার ও টেরেসও রয়েছে, যেখান থেকে ঐতিহাসিক লিউব্লিয়ানা দুর্গের দৃশ্য দেখা যায়।
ব্যাগ রেখে আর সময় নষ্ট করলাম না। বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে। আমার গন্তব্য শহরের কেন্দ্র, প্রধান চত্বরগুলো আর লুবলিয়ানিকা নদীর পাড়।
ফ্রম বাংলাদেশ
হোটেল থেকে বের হয়ে অল্প একটু হাঁটার পর হঠাৎ চোখে পড়ল ইংরেজিতে লেখা দুটি শব্দ, ‘FROM BANGLADESH (ফ্রম বাংলাদেশ)’। একটি ছোট টেক-আউট রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড।
লেখাটি দেখে থমকে দাঁড়ালাম। পৃথিবীর দেশে দেশে অনেক বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ দেখেছি। ব্যবসায়িক কারণে অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো নিজেদের পরিচয় দেয় ‘ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট’ হিসেবে। সেখানে ইউরোপের এই ছোট্ট শহরে নিজের দেশের নামটি এতটা স্পষ্টভাবে লেখা দেখে ভালো লাগল। মনে হলো, দূরদেশের এক কোণে বাংলাদেশের একটি ছোট্ট সাইনবোর্ড নিজের অস্তিত্বের কথাই জানাচ্ছে।
রেস্তোরাঁর মালিক জনাব বাবুর সঙ্গে কথা হলো। বিদেশের অচেনা শহরে হঠাৎ নিজের দেশের একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ আলাদা। ভ্রমণে ইতিহাস, স্থাপত্য কিংবা বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু কখনো কখনো এমন একটি পরিচিত মুখই বিদেশের শহরকে আপন করে দেয়। মানচিত্রে দূরত্ব যতই হোক, পরিচয়ের সূত্রে মানুষ কত সহজেই কাছে চলে আসে!
কিন্তু এই ক্ষেত্রে খেয়াল করলাম, প্রত্যাশার সঙ্গে আন্তরিকতার ফারাক ছিল। স্লোভেনিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশি পর্যটক বিরল হওয়ার কথা। আন্তরিকতা অবশ্য ব্যক্তিত্বের ধরনের ওপর নির্ভরশীল। জেনেভা হেলসিংকি বার্লিন ব্যাংকক তালিন থেকে টোকিও দেশে দেশে বাংলাদেশি ঘরানার রেস্তোরাঁর মালিকদের আন্তরিকতার বিচারে ইউরোপের এক রিমোট দেশে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ দেখে আমার আবেগের সঙ্গে প্রত্যাশার মিল না থাকাটা অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। প্রবাসে অনেকেই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তববাদী হয়ে ওঠেন ঘাত-প্রতিঘাতের নানা অভিজ্ঞতায়।
নদীনদী, চত্বর, দুর্গ আর দোকানপাটের শহর
বাংলাদেশি টেক-আউট রেস্তোরাঁ পেরিয়ে লিউব্লিয়ানার কেন্দ্রের দিকে কিছুটা এগোতেই বুঝতে পারলাম, শহরের প্রাণকেন্দ্র প্রেশেরেন স্কয়ারে এসে গেছি। স্লোভেনিয়ার জাতীয় কবি ফ্রান্সে প্রেশেরেনের নামে এই চত্বরের নামকরণ। মাঝখানে কবির মূর্তি, আর এক পাশে গোলাপি রঙের দৃষ্টিনন্দন ফ্রান্সিসকান চার্চ অব দ্য অ্যানানসিয়েশন। চত্বরের সামনে লুবলিয়ানিকা নদীর ওপর ঐতিহাসিক ট্রিপল ব্রিজ।
চারপাশে মানুষের চলাচল। কেউ কাজে যাচ্ছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন, কেউ ক্যামেরা হাতে ছবি তুলছেন, আবার কেউ পাশের ক্যাফেতে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন। পুরোনো ইউরোপীয় স্থাপত্যের আবহের মধ্যেও এখানকার জীবন একেবারেই সমকালীন।
প্রেশেরেন চত্বরকে লিউব্লিয়ানার প্রবেশদ্বার বলা চলে। একদিকে নদী ও সেতু, অন্যদিকে পুরোনো শহরের সরু রাস্তা। আশপাশে বইয়ের দোকান, পোশাকের দোকান, ক্যাফে, রেস্তোরাঁ আর নানা ধরনের ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কোনো ব্যস্ত মহানগরের কোলাহল নেই, অথচ প্রাণচাঞ্চল্যেরও অভাব নেই।
ইউরোপের অনেক শহরে কেন্দ্রীয় চত্বর মানেই বিশাল ভবন, প্রশস্ত সড়ক আর গাড়ির ভিড়। লিউব্লিয়ানায় এসে দেখলাম, শহরের সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে অনেক সহজ কিছু উপাদানে—একটি নদী, কয়েকটি সেতু, কবির মূর্তি, চার্চের গোলাপি দেয়াল আর মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। শহরটি যেন তার সৌন্দর্যকে জাঁকজমক করে প্রদর্শন করতে চায় না; বরং দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই তা ছড়িয়ে রেখেছে।
জাগ্রেব: ইতিহাস স্থাপত্য বিজ্ঞানে মানুষের গল্পপ্রেশেরেন স্কয়ার থেকে কয়েক পা এগোলেই ট্রিপল ব্রিজ। ট্রিপল ব্রিজ লিউব্লিয়ানার একটি অত্যন্ত বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন। এটি লুবলিয়ানিকা নদীর ওপর নির্মিত তিনটি ব্রিজের একটি অনন্য সমষ্টি, যা শহরের ঐতিহাসিক পুরোনো অংশকে আধুনিক অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তিনটি পাশাপাশি সেতুর এই অনন্য স্থাপত্য লিউব্লিয়ানার অন্যতম পরিচিত নিদর্শন। বিখ্যাত স্লোভেনীয় স্থপতি ইয়োজে প্লেচনিকের পরিকল্পনায় পুরোনো সেতুটিকে কেন্দ্র করে তিনটি সেতুর এই সমন্বিত রূপ তৈরি হয়।
লুবলিয়ানিকা নদী যেন শহরটির প্রাণ। লুবলিয়ানিকার শান্ত জলধারা শহরটিকে যেন দুই পাশে জড়িয়ে রেখেছে। তার দুই তীরে পুরোনো ভবন, ছোট ছোট সেতু, ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং মানুষের অবাধ চলাচল মিলিয়ে শহরের কেন্দ্রটি যেন খোলা আকাশের নিচে সাজানো একটি জীবন্ত মঞ্চ।
লুবলিয়ানিকা নদী স্লোভেনিয়ার কার্স্ট ভূপ্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। সাধারণ নদীর মতো কোনো পাহাড়ি ঝরনা থেকে নয়; বরং চুনাপাথরের ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহ, গুহা ও একাধিক প্রস্রবণের জটিল ব্যবস্থার সঙ্গে এর জন্ম জড়িত। প্রায় ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি রাজধানী লিউব্লিয়ানার বুক চিরে বয়ে গেছে। শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অংশটি তার সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। রাজধানী থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে এটি সাভা নদীতে গিয়ে মিশেছে। সাভা নদী বেলগ্রেডে দানিয়ুবের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এরপর দানিয়ুবের দীর্ঘ জলযাত্রা শেষ হয়েছে কৃষ্ণসাগরে।
সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে একদিকে পুরোনো শহরের স্থাপত্য, অন্যদিকে নদীর বুকে তার প্রতিফলন দেখতে দেখতে মনে হলো, এখানে নদী আর শহরের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। নদীর পারই যেন শহরের বসার ঘর।
দুর্গ আর কনসার্টএক শ্রমিক নেতা আরেক পিয়ানোবাদকের দেশেনদীর দুই ধারে সারি সারি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ। টেবিলগুলো প্রায় নদীর কিনারা পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে। ছোট ছোট নৌকা নদীর জলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। নদীর ওপর সেতু, সেতুর পাশে পুরোনো ভবন, আর সবকিছুর মধ্যে মানুষের অবাধ বিচরণ—দৃশ্যটি শান্ত, অথচ প্রাণবন্ত।
নদীর পাশের সরু রাস্তাগুলোতেও রয়েছে নানা ধরনের দোকানপাট। পোশাক, জুতা, বই, স্মারকসামগ্রী ও স্থানীয় হস্তশিল্পের দোকান। বড় বড় শপিং মলের চেয়ে আমার কাছে এসব ছোট দোকান আর পথের পাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই বেশি আপন মনে হলো।
আরেকটু এগিয়ে মার্কেট স্কয়ারের দিকে গেলে পরিবেশ বদলে যায়। খোলা বাজারে ফলমূল, সবজি, ফুল আর স্থানীয় পণ্যের দোকান। বাজারের কোলাহল আর নদীর ধারের শান্ত পরিবেশ পাশাপাশি অবস্থান করছে। মনে হলো, লিউব্লিয়ানা একই সঙ্গে ব্যস্ত ও নিরিবিলি—শহুরে জীবনের এই দুই বৈশিষ্ট্য এখানে সুন্দরভাবে মিশে গেছে।
শহরটির অন্যতম আকর্ষণ লিউব্লিয়ানা দুর্গ (Ljubljana Castle), হোটেলের ছাদ থেকে প্রথমেই চোখে পড়েছিল এই দুর্গের চমৎকার ভিউ। পুরোনো শহরের মাথার ওপর এই দুর্গ লিউব্লিয়ানা শহরের আইকন। প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো দুর্গ এটি। এই দুর্গের ওয়াচ টাওয়ারে থেকে লিউব্লিয়ানা শহর এবং দূরের আল্পস পর্বতমালার প্যানারমিক দৃশ্য দেখা যায়। বর্তমানে দুর্গটি ইভেন্ট আর উৎসবের বিনোদনকেন্দ্র। স্লোভেনিয়ার পুতুলনাচের ইতিহাস–ঐতিহ্য নিয়ে দুর্গের ভেতর চমৎকার একটি জাদুঘর রয়েছে।
ফলের সালাদ আর হায়দরাবাদি বিরিয়ানি
হাঁটতে হাঁটতে একপর্যায়ে দুপুরের খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে লাগলাম। আশপাশের রেস্তোরাঁগুলোতে চোখ বোলাতে গিয়ে লুবলিয়ানিকা নদীর এক পাশের একটি রেস্তোরাঁয় ফলের সালাদের বিজ্ঞাপনে চোখ পড়ল, প্রাণবন্ত ছবিটিকে উপেক্ষা করতে পারলাম না। দুপুরের খাবার হিসেবে বেছে নিলাম স্লোভেনীয় ঘরানার ফলের সালাদ। সবজির সালাদে বিপরীতে ফলের সালাদের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন ছিল বেশ আকর্ষণীয়। রেস্তোরাঁর এক নারী কর্মী অত্যন্ত যত্ন নিয়ে সালাদটি তৈরি করে দিলেন। খাবারের স্বাদ গ্রহণের আগেই তাঁর আন্তরিকতা ও পরিবেশনের যত্ন ভ্রমণের ছোট্ট অভিজ্ঞতাটিকে স্মরণীয় করে তুলল। আর সালাদটির স্বাদও ছিল অসাধারণ।
প্রায় আট ঘণ্টার ব্যবধানে রাতের খাবারের পালা সারলাম নদীর অপর পারে একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁয়, হায়দরাবাদি বিরিয়ানি দিয়ে। ইউরোপের ছোট্ট এক রাজধানীর রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হায়দরাবাদি বিরিয়ানির ঘ্রাণে উপমহাদেশের পরিচিত মসলার সুবাস খুঁজে পাওয়া এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। দূরদেশের অপরিচিত নগরেও খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ কী সহজেই নিজের চেনা ভূগোলের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়! লুবলিয়ানিকার দুই তীরের ভিন্ন পরিবেশে দুটি খাবারের অভিজ্ঞতায় একদিকে স্লোভেনীয় খাদ্যসংস্কৃতির নিজস্বতা, অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাদ ও ঐতিহ্যের পরিচিত উপস্থিতি অন্য রকম এক বিনোদন।
মালদোভায় মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিশাল রাজ্যলিউব্লিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়
ভালো লাগার বিষয় ছিল, শহরের কেন্দ্রটি যেন হাঁটার জন্যই তৈরি। এক চত্বর থেকে আরেক চত্বর, এক সেতু থেকে অন্য সেতু, নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়—হেঁটেই শহরটিকে আবিষ্কার করা যায়। এখানে সৌন্দর্য দেখার জন্য কোনো তাড়াহুড়ো নেই। নদীর জল, পুরোনো বাড়ির রং, ক্যাফের চেয়ার, দোকানের জানালা আর পথচারীদের স্বাভাবিক জীবন—সবকিছু মিলিয়েই শহরটি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রকাশ করে। হেঁটে হেঁটে দেখা হয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়, সংসদসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ভবনগুলো।
লিউব্লিয়ানার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কংগ্রেস স্কয়ারে লিউব্লিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টরেট (কেন্দ্রীয় কার্যালয়) ভবনটি ঐতিহাসিক রেনেসাঁ যুগের স্থাপত্যরীতির অনুকরণে নির্মিত একটি প্রাসাদে। পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, ভবনটি একসময় প্রাদেশিক প্রাসাদ ছিল।
লিউব্লিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে প্রাচীন এবং বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়, বৈশ্বিক মানে বিশ্বের প্রথম সারির অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয়। এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে এখানে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত, যাঁদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষাদান ও গবেষণার কাজে যুক্ত আছেন প্রায় ৪ হাচার শিক্ষক ও গবেষক।
এখানে মনে ধরার মতো তথ্যটি হচ্ছে যে ২১ লাখ জনসংখ্যার একটি দেশের তিন লাখ জনসংখ্যার রাজধানী শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ধারণ করছে ৪০ হাজার শিক্ষার্থী।
লিউব্লিয়ানার কেন্দ্র ঘুরে বেড়াতে গিয়ে অনুভব করলাম, নদী, সেতু, চত্বর, রাস্তা আর পুরোনো ভবন—সবকিছু যেন একটি বৃহত্তর নকশার অংশ। লিউব্লিয়ানার স্থাপত্যের কথা বলতে গেলে ইয়োজে প্লেচনিকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। বিংশ শতাব্দীর এই বিখ্যাত স্লোভেনীয় স্থপতি শহরের নগর-পরিকল্পনা, সেতু, নদীর তীর এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নকশায় গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর কাজের বিশেষত্ব হলো, স্থাপত্যকে শুধু আলাদা কোনো ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো শহরের অভিজ্ঞতার অংশ করে তোলা।
ট্রেনকনসার্টের শহরে সান্ধ্যসংগীত
কনসার্টের শহর হিসেবে লিউব্লিয়ানার বেশ নাম ডাক, কনসার্টের দিক থেকে এটি ইউরোপের অন্যতম প্রাণবন্ত একটি রাজধানী। ধ্রুপদি, ক্ল্যাসিক্যাল সংগীত থেকে শুরু করে রক, মেটাল, জ্যাজ সংগীতের বিভিন্ন ঘরানায় শহরটিতে উৎসবের অন্তহীন আয়োজন।
সন্ধ্যার দিকে আবার বের হলাম হাঁটতে। দিনের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। নদীর পানিতে শহরের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। দিনের ব্যস্ততা কিছুটা কমে এলেও শহরের প্রাণচাঞ্চল্য তখনো অটুট। ঠিক সেই সময় শহরের কেন্দ্রে চোখে পড়ল একটি সংগীতানুষ্ঠান। একটি সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় কনসার্ট। অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র, অনেক তরুণ-তরুণী শিল্পী—তারপর একসঙ্গে বেজে উঠল সুর।
আমি দাঁড়িয়ে শুনছিলাম।
কোনো শহরকে তার স্থাপত্য দিয়ে মনে থাকে, কোনো শহরকে ইতিহাস দিয়ে, আবার কোনো শহরকে খাবার কিংবা মানুষের আতিথেয়তা দিয়ে। লিউব্লিয়ানা আমার কাছে সেদিন স্মরণীয় হয়ে রইল তার নিরিবিলি সৌন্দর্য, নদীর ধারের জীবন এবং সন্ধ্যার সংগীতের জন্য।
ছোট্ট একটি শহর, অথচ তার ভেতরের সাংস্কৃতিক জীবন কত সমৃদ্ধ! এখানে আধুনিক জীবন আর ঐতিহাসিক পরিবেশ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পাশাপাশি থেকে একে অন্যের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে।
সারায়েভো: ইউরোপের জেরুজালেমবেলগ্রেড হয়ে বাসেল
পর্যটকের খোলস থেকে বের হয়ে ফিরতে হবে পেশাদারত্বে, ১০ জুন সকালে আবার যাত্রা। এবার গন্তব্য সুইজারল্যান্ডের বাসেল, যেখানে অপেক্ষা করছে পুরো সপ্তাহের পেশাগত ব্যস্ততা।
হোটেল ছেড়ে রওনা হলাম লিউব্লিয়ানা বিমানবন্দরের উদ্দেশে। না, কোনো ট্যাক্সিতে নয়, হোটেলে থেকে হাঁটার দূরত্বে বাসস্টেশন, সেখান থেকে এয়ারপোর্টগামী বাসে, ৫০ মিনিটের যাত্রা মাত্র ৪ ইউরোতে।
স্লোভেনিয়ার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি রাজধানী থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। স্লোভেনীয় সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ জোজে পুচনিকের নামানুসারে নামকরণ। বিমানবন্দরটি স্লোভেনিয়ার প্রধান ও একমাত্র সক্রিয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। গ্রামীণ পটভূমিকে অবস্থিত জোজে পুচনিক বিমানবন্দর থেকে আলপ্স পর্বতমালায় নান্দনিক দৃশ্য অপূর্ব।
বাসেলে যাওয়ার জন্য ট্রানজিট বেলগ্রেডে। স্লোভেনিয়ার ছোট এই বিমানবন্দরে সুবিধামতো ফ্লাইট পাওয়া বেশ অসুবিধাজনক। সুইস এয়ারের সরাসরি ফ্লাইটে জুরিখ যাওয়ার শিডিউলের সঙ্গে আমার শিডিউলের মিল হলো না। বাধ্য হয়ে বলকানের প্রভাবশালী এয়ারলাইনস এয়ার সার্বিয়ায় ফ্লাইট ৬২১-এ প্রথমে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের নিকোলা টেসলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে একই বিমান সংস্থার ফ্লাইট ৩৩২-এ সুইজারল্যান্ডের জুরিখ। এরপর জুরিখ থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার ট্রেনযাত্রায় বাসেল।
ইউরোপের এক শহর থেকে অন্য শহরে এভাবে ট্রেন, বিমান আর পায়ে হাঁটা মিলিয়ে যাত্রা করতে করতে কখনো কখনো মনে হয়, ভ্রমণের মানচিত্রটি আসলে কত সহজে এক দেশের সীমানা পেরিয়ে আরেক দেশে পৌঁছে যায়।
লিউব্লিয়ানার নদীতীর, সেতু, চত্বর, দুর্গ, রেস্তোরাঁ আর সন্ধ্যার সংগীত তখন আমার দেশভ্রমণের অনেক স্মৃতির ঝাঁপিতে একটি নতুন অধ্যায়ে সংরক্ষিত হয়ে থাকল। সামনে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে পুরো সপ্তাহের পেশাগত কাজ। ভ্রমণের আনন্দ ও কাজের দায়িত্ব—দুটিকে সঙ্গে নিয়েই আবার শুরু হলো ইউরোপযাত্রার নতুন অধ্যায়।
*লেখক: শোয়েব সাঈদ, কানাডার মন্ট্রিয়লে একটি বহুজাতিক করপোরেটে ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত।

Source - nagorik.prothomalo.com ↗