যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দলের বড় পরাজয়ের পর নিজেদের যুদ্ধকৌশল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে ইরান। দেশটির ধারণা, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ওয়াশিংটনকে যুদ্ধ বন্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার কৌশল কাজ করছে। তবে ইসরায়েল এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী।
ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদক লাজার বর্ম্যানের এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। পাশাপাশি টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও কানসাসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রভাবিত রাজ্যেও ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভা ও প্রশাসনিক পদেও দলটির অগ্রগতি হয়েছে।
নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানিয়েছে ইরানও। দেশটির শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমেরিকানরা যুদ্ধকে না বলেছে, আমরাও এই বার্তাকে সমর্থন করি।’
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপেও সফল ইরানের কৌশল

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, লোভ ও অহংকারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে একটি অবৈধ ও ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়েছে। তাঁর দাবি, ওয়াশিংটনের হিসাব ও কৌশলগত ধারণা ব্যর্থ হয়েছে।
দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল দেখছে ইরান
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলা মোকাবিলায় ইরান বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করলে তেহরান আশঙ্কা করেছিল, পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে ইরান।
এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার উপায় নিয়ে পরিকল্পনা সাজায় দেশটি। ২০০৯ সালের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরান গোপনে ভূগর্ভস্থ ফোরদো স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেছিল তারও সাত বছর আগে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও দীর্ঘ সময় টিকে থাকার পরিকল্পনা নিয়েছিল ইরান। এর অংশ হিসেবে দেশটির সামরিক কমান্ড কাঠামো বিকেন্দ্রীভূত করা হয়। ইরানের ৩১টি প্রদেশকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও নিজস্বভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক চাপই ইরানের বড় কৌশল
ইরানের যুদ্ধকৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। তেহরানের ধারণা ছিল, উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ডে হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ সৃষ্টি করবে।
তবে ইরানের কৌশলগত হিসাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মার্কিন ভোটাররা। সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা সীমিত হলেও মার্কিন সেনাদের হতাহত হওয়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন কমানো সম্ভব বলে মনে করেছে তেহরান।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি বছরের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতে এই কৌশলের প্রতিফলন দেখা গেছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অসন্তোষ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছে ইরান।
তবে নির্বাচনের ফলাফলকে সরাসরি ইরানের যুদ্ধকৌশলের সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, শুল্ক আরোপ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ইস্যুও নির্বাচনের ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসরায়েলের অবস্থান এখনো ভিন্ন
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এলেও ইসরায়েলের অবস্থান আলাদা। দেশটির নেতৃত্ব এখনো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী। ফলে ওয়াশিংটনের ওপর যুদ্ধ বন্ধের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হলেও ইসরায়েলের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান সংঘাতের ভবিষ্যৎকে জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরান মনে করছে, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য করার পরিকল্পনা কার্যকর হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য ও অবস্থানের পার্থক্য থাকায় সংঘাতের অবসান এখনো অনিশ্চিত।
Source - www.bd24live.com ↗