পর্দায় তিনি রাগী গৃহকর্তা। বাড়ির গৃহকর্মীর কথার মাঝে বাগড়া দিলে কিংবা দরজায় উঁকি দিলেই কষিয়ে থাপ্পড় মারতেন। কিন্তু ক্যামেরা বন্ধ হতেই বদলে যেত দৃশ্যটা। যাঁকে একটু আগে থাপ্পড় মেরেছেন, তাঁকেই বুকে টেনে নিতেন। ব্যথা লেগেছে কি না জানতে চাইতেন, দুঃখ প্রকাশ করতেন বারবার। সহশিল্পী ফারুক আহমেদের স্মৃতিতে এভাবেই রয়ে গেছেন আলী যাকের—পর্দায় দাপুটে, পর্দার বাইরে স্নেহশীল এক মানুষ।
আজ ৬ নভেম্বর আলী যাকেরের জন্মদিন। ১৯৪৪ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া বরেণ্য এই অভিনেতার ৮২তম জন্মবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যাক অনুজ সহশিল্পী ফারুক আহমেদের স্মৃতিতে থাকা সেই মানুষটিকে।
ফারুক আহমেদের অভিনয়জীবনের প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘আজ রবিবার’। সেখানে তাঁর চরিত্রের নাম মতি। আর আলী যাকের অভিনয় করেছিলেন বাড়ির বড় ছেলে আজগরের চরিত্রে। গল্পে আজগরকে বেশির ভাগ সময় ঘরের ভেতর পড়াশোনা করতে দেখা যেত। দীর্ঘ সময় ঘরে বসে তিনি কী করেন, তা নিয়ে কৌতূহলের শেষ ছিল না গৃহপরিচারক মতির। সুযোগ পেলেই দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেন। আর ধরা পড়ে প্রায়ই থাপ্পড় খেতে হতো তাঁকে। একবার তো দরজার ছিদ্র দিয়ে কালিও ছুড়ে মারেন আজগর।
আলী যাকেরের প্রথম চড়েই মাটিতে পড়ে যান ফারুক আহমেদ
জন্ম ও বেড়ে ওঠা১৯৪৪ সালের ৬ নভেম্বর বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার রতনপুরে জন্ম আলী যাকেরের। পরবর্তী জীবনে অভিনয়, নির্দেশনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন তিনি।পর্দায় দর্শককে হাসানো এসব দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে ফারুককে সত্যিই অনেকগুলো থাপ্পড় খেতে হয়েছিল। কারণ, একবারে শট ঠিকমতো হচ্ছিল না। সেই স্মৃতি বলতে গিয়ে ফারুক জানিয়েছিলেন, ‘থাপ্পড় মারার শট ওকে না হওয়ার কারণে বারবার আলী যাকেরের হাতে আমাকে থাপ্পড় খেতে হচ্ছিল। প্রতিবার থাপ্পড় মেরে তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে ধরতেন। আমাকে আদর করে বলতেন, “ইশ্ রে, জোরে লেগেছে মনে হয়। মনে কষ্ট রেখো না।” আমি যতই তাঁকে বলি, ব্যথা পাইনি, কষ্ট নিইনি, তারপরও তিনি প্রতিবারই থাপ্পড়ের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছিলেন।’
নাটকের দৃশ্যে আলী যাকের ও ফারুক আহমেদমুক্তিযুদ্ধে শব্দসৈনিক১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইংরেজি বিভাগে কাজ করেন আলী যাকের। ইংরেজিতে সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের খবর বাইরের বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ার সেই সংগ্রামে তাঁর কণ্ঠও হয়ে উঠেছিল একটি অস্ত্র।অনন্য একজন আলী যাকেরশুধু ‘আজ রবিবার’ নয়, হুমায়ূন আহমেদের ‘অচিন বৃক্ষ’ নাটকেও আলী যাকেরের হাতে থাপ্পড় খাওয়ার স্মৃতি আছে ফারুকের। নাটকের গল্পে একদল বিদেশি একটি অচিন গাছ দেখতে আসে। তাদের সঙ্গে বসে কথা বলছিলেন আলী যাকের। কাজের ছেলের চরিত্রে থাকা ফারুক বারবার সেই আলোচনায় কথা বলে ওঠেন। একপর্যায়ে তাঁকে দূরে ডেকে নিয়ে থাপ্পড় মারেন আলী যাকের।
‘কবর’ দিয়ে মঞ্চে যাত্রা১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আরণ্যক নাট্যদলের প্রযোজনায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চে তাঁর পথচলা শুরু। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের বিকাশে পরে তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রধান অভিনেতা, নির্দেশক ও সংগঠক।ফারুকের ভাষায়, ‘যাকের ভাই ছিলেন স্বাস্থ্যবান, তাঁর হাতের পাঞ্জা ছিল মোটা। সেদিন প্রথম থাপ্পড় খেয়ে আমি মাটিতে পড়ে যাই। ব্যথায় আমার মাথা ঘুরতে থাকে। যাকের ভাই দ্রুত আমাকে তুলে নেন। দুঃখ প্রকাশ করেন। সেদিন সারাক্ষণ আমাকে আদর করে বলতে থাকেন, “মনে কষ্ট রাখিস না।”’
আলী যাকের নাটকটি দেখে যেতে পারলেন নাবাবা আলী যাকেরের সঙ্গে ছেলে ইরেশ যাকেরনাগরিকের সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা‘কবর’-এ অভিনয়ের পর নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হন আলী যাকের। দলটির হয়ে অভিনয় ও নির্দেশনার পাশাপাশি সাংগঠনিক দায়িত্বও পালন করেন। নিয়মিত মঞ্চায়ন ও দলগত নাট্যচর্চার বিকাশে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই যাত্রায় তাঁর দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ছিলেন স্ত্রী, অভিনেত্রী ও নাট্যব্যক্তিত্ব সারা যাকের।দৃশ্যটি বাস্তবসম্মত করে তুলতেই জোরে থাপ্পড় মেরেছিলেন বলে ফারুককে বুঝিয়েছিলেন আলী যাকের। কিন্তু একই নাটকে আবারও তাঁকে থাপ্পড় মারার দৃশ্য ছিল। এবার আর মন সায় দিচ্ছিল না তাঁর। হুমায়ূন আহমেদকে ডেকে বলেছিলেন, ‘হুমায়ূন, ফারুক ছেলেটাকে থাপ্পড় মারতে কষ্ট লাগছে। মায়াবী একটা ছেলে, তাকে থাপ্পড় না মারলে হয় না?’
এরপর দৃশ্যটি অন্যভাবে করা হয়। ফারুকের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, আলোচনায় বাগড়া দেওয়ায় তাঁকে দূরে ডেকে নিয়ে যান আলী যাকের। ক্যামেরা তখন থাকে বিদেশি অতিথিদের দিকে। দর্শক শুধু থাপ্পড়ের শব্দ শুনতে পান। সেই শব্দে অতিথিরা কিছুটা ভয় পান। পরের দৃশ্যে গাল ডলতে ডলতে ফিরে আসেন ফারুক। সরাসরি থাপ্পড়ের দৃশ্য না দেখিয়েও গল্পের প্রয়োজন মিটে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণস্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণেও কাজ করেছেন আলী যাকের। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি। একাত্তরে স্বাধীনতার সংবাদ প্রচার থেকে পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ—দুই ক্ষেত্রেই যুক্ত ছিলেন তিনি।বাবা নেই, জন্মদিন কীভাবে কাটে আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারেরএকক ও ধারাবাহিক মিলিয়ে আলী যাকেরের সঙ্গে প্রায় ১৫টি নাটকে অভিনয় করেছেন ফারুক আহমেদ। তাঁর কাছে এটি অভিনয়জীবনের বড় প্রাপ্তি। জ্যেষ্ঠ এই সহশিল্পীকে নিয়ে ফারুক বলেছিলেন, ‘যাকের ভাই নিরহংকার এবং সহযোগিতাপূর্ণ একজন অভিনেতা। সেটে কখনো তাঁকে উচ্চ স্বরে কথা বলতে শুনিনি। তিনি সবাইকে মূল্যায়ন করতেন।’
আলী যাকের লেখালেখি ও আলোকচিত্রসমাজ, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে সংবাদপত্রে লিখেছেন আলী যাকের। আলোকচিত্রের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন ও মানুষ তাঁর ছবির বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সদস্যও ছিলেন।টেলিভিশনের দর্শকের কাছে ‘আজ রবিবার’ ও ‘বহুব্রীহি’র মতো নাটকে অভিনয় করে আপন হয়ে উঠেছিলেন আলী যাকের। মঞ্চেও তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অভিনেতা ও নির্দেশক। ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আরণ্যকের প্রযোজনায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চে তাঁর পথচলা শুরু। পরে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয়, নির্দেশনা ও নাট্যসংগঠনে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘গ্যালিলিও’ ও ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’য় তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে স্মরণীয়।
নূরলদীন, দেওয়ান গাজী ও গ্যালিলিওসৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এ নূরলদীন, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’য় দেওয়ান গাজী এবং ‘গ্যালিলিও’তে নাম ভূমিকায় অভিনয় তাঁর মঞ্চজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন। চরিত্রভেদে কণ্ঠ, অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষার ব্যবহারে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজস্ব অভিনয়শৈলী। তাঁর মঞ্চকাজের মধ্যে ‘ম্যাকবেথ’, ‘অচলায়তন’ ও ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’ও উল্লেখযোগ্য।বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার রতনপুরে জন্ম আলী যাকেরের। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টিও ছিলেন তিনি।
টেলিভিশনে বিপুল জনপ্রিয়তামঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশনেও স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন আলী যাকের। হুমায়ূন আহমেদের ‘বহুব্রীহি’ ও ‘আজ রবিবার’-এ তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে জনপ্রিয়। ‘আজ রবিবার’-এর আজগর চরিত্রটি এখনো দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। গম্ভীর ও হাস্যরসাত্মক—দুই ধরনের চরিত্রেই তিনি ছিলেন সাবলীল। সংলাপ, চোখের অভিব্যক্তি ও বিরতির ব্যবহার তাঁর অভিনয়কে আলাদা করে চিনিয়ে দিত।একুশে পদক ও অন্যান্য সম্মাননানাটকে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে একুশে পদক পান আলী যাকের। এ ছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনশিল্প, লেখালেখি ও আলোকচিত্রচর্চায় যুক্ত ছিলেন। নাটকে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে পান একুশে পদক।
জীবনাবসান
দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত থাকার পর ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আলী যাকের। বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। মৃত্যুর আগে তাঁর করোনাভাইরাসের সংক্রমণও ধরা পড়ে। মঞ্চ ও টেলিভিশনের স্মরণীয় চরিত্র, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা এবং বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন আলী যাকের। মৃত্যুর আগে করোনাভাইরাসের সংক্রমণও ধরা পড়ে। ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর, ৭৬ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
নাটকের দৃশ্যে আলী যাকের ও ফারুক আহমেদমুক্তিযুদ্ধে শব্দসৈনিক১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইংরেজি বিভাগে কাজ করেন আলী যাকের। ইংরেজিতে সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের খবর বাইরের বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ার সেই সংগ্রামে তাঁর কণ্ঠও হয়ে উঠেছিল একটি অস্ত্র।অনন্য একজন আলী যাকেরশুধু ‘আজ রবিবার’ নয়, হুমায়ূন আহমেদের ‘অচিন বৃক্ষ’ নাটকেও আলী যাকেরের হাতে থাপ্পড় খাওয়ার স্মৃতি আছে ফারুকের। নাটকের গল্পে একদল বিদেশি একটি অচিন গাছ দেখতে আসে। তাদের সঙ্গে বসে কথা বলছিলেন আলী যাকের। কাজের ছেলের চরিত্রে থাকা ফারুক বারবার সেই আলোচনায় কথা বলে ওঠেন। একপর্যায়ে তাঁকে দূরে ডেকে নিয়ে থাপ্পড় মারেন আলী যাকের।
‘কবর’ দিয়ে মঞ্চে যাত্রা১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আরণ্যক নাট্যদলের প্রযোজনায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চে তাঁর পথচলা শুরু। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের বিকাশে পরে তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রধান অভিনেতা, নির্দেশক ও সংগঠক।ফারুকের ভাষায়, ‘যাকের ভাই ছিলেন স্বাস্থ্যবান, তাঁর হাতের পাঞ্জা ছিল মোটা। সেদিন প্রথম থাপ্পড় খেয়ে আমি মাটিতে পড়ে যাই। ব্যথায় আমার মাথা ঘুরতে থাকে। যাকের ভাই দ্রুত আমাকে তুলে নেন। দুঃখ প্রকাশ করেন। সেদিন সারাক্ষণ আমাকে আদর করে বলতে থাকেন, “মনে কষ্ট রাখিস না।”’
আলী যাকের নাটকটি দেখে যেতে পারলেন নাবাবা আলী যাকেরের সঙ্গে ছেলে ইরেশ যাকেরনাগরিকের সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা‘কবর’-এ অভিনয়ের পর নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হন আলী যাকের। দলটির হয়ে অভিনয় ও নির্দেশনার পাশাপাশি সাংগঠনিক দায়িত্বও পালন করেন। নিয়মিত মঞ্চায়ন ও দলগত নাট্যচর্চার বিকাশে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই যাত্রায় তাঁর দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ছিলেন স্ত্রী, অভিনেত্রী ও নাট্যব্যক্তিত্ব সারা যাকের।দৃশ্যটি বাস্তবসম্মত করে তুলতেই জোরে থাপ্পড় মেরেছিলেন বলে ফারুককে বুঝিয়েছিলেন আলী যাকের। কিন্তু একই নাটকে আবারও তাঁকে থাপ্পড় মারার দৃশ্য ছিল। এবার আর মন সায় দিচ্ছিল না তাঁর। হুমায়ূন আহমেদকে ডেকে বলেছিলেন, ‘হুমায়ূন, ফারুক ছেলেটাকে থাপ্পড় মারতে কষ্ট লাগছে। মায়াবী একটা ছেলে, তাকে থাপ্পড় না মারলে হয় না?’
এরপর দৃশ্যটি অন্যভাবে করা হয়। ফারুকের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, আলোচনায় বাগড়া দেওয়ায় তাঁকে দূরে ডেকে নিয়ে যান আলী যাকের। ক্যামেরা তখন থাকে বিদেশি অতিথিদের দিকে। দর্শক শুধু থাপ্পড়ের শব্দ শুনতে পান। সেই শব্দে অতিথিরা কিছুটা ভয় পান। পরের দৃশ্যে গাল ডলতে ডলতে ফিরে আসেন ফারুক। সরাসরি থাপ্পড়ের দৃশ্য না দেখিয়েও গল্পের প্রয়োজন মিটে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণস্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণেও কাজ করেছেন আলী যাকের। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি। একাত্তরে স্বাধীনতার সংবাদ প্রচার থেকে পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ—দুই ক্ষেত্রেই যুক্ত ছিলেন তিনি।বাবা নেই, জন্মদিন কীভাবে কাটে আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারেরএকক ও ধারাবাহিক মিলিয়ে আলী যাকেরের সঙ্গে প্রায় ১৫টি নাটকে অভিনয় করেছেন ফারুক আহমেদ। তাঁর কাছে এটি অভিনয়জীবনের বড় প্রাপ্তি। জ্যেষ্ঠ এই সহশিল্পীকে নিয়ে ফারুক বলেছিলেন, ‘যাকের ভাই নিরহংকার এবং সহযোগিতাপূর্ণ একজন অভিনেতা। সেটে কখনো তাঁকে উচ্চ স্বরে কথা বলতে শুনিনি। তিনি সবাইকে মূল্যায়ন করতেন।’
আলী যাকের লেখালেখি ও আলোকচিত্রসমাজ, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে সংবাদপত্রে লিখেছেন আলী যাকের। আলোকচিত্রের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন ও মানুষ তাঁর ছবির বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সদস্যও ছিলেন।টেলিভিশনের দর্শকের কাছে ‘আজ রবিবার’ ও ‘বহুব্রীহি’র মতো নাটকে অভিনয় করে আপন হয়ে উঠেছিলেন আলী যাকের। মঞ্চেও তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অভিনেতা ও নির্দেশক। ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আরণ্যকের প্রযোজনায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চে তাঁর পথচলা শুরু। পরে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয়, নির্দেশনা ও নাট্যসংগঠনে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘গ্যালিলিও’ ও ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’য় তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে স্মরণীয়।
নূরলদীন, দেওয়ান গাজী ও গ্যালিলিওসৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এ নূরলদীন, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’য় দেওয়ান গাজী এবং ‘গ্যালিলিও’তে নাম ভূমিকায় অভিনয় তাঁর মঞ্চজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন। চরিত্রভেদে কণ্ঠ, অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষার ব্যবহারে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজস্ব অভিনয়শৈলী। তাঁর মঞ্চকাজের মধ্যে ‘ম্যাকবেথ’, ‘অচলায়তন’ ও ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’ও উল্লেখযোগ্য।বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার রতনপুরে জন্ম আলী যাকেরের। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টিও ছিলেন তিনি।
টেলিভিশনে বিপুল জনপ্রিয়তামঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশনেও স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন আলী যাকের। হুমায়ূন আহমেদের ‘বহুব্রীহি’ ও ‘আজ রবিবার’-এ তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে জনপ্রিয়। ‘আজ রবিবার’-এর আজগর চরিত্রটি এখনো দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। গম্ভীর ও হাস্যরসাত্মক—দুই ধরনের চরিত্রেই তিনি ছিলেন সাবলীল। সংলাপ, চোখের অভিব্যক্তি ও বিরতির ব্যবহার তাঁর অভিনয়কে আলাদা করে চিনিয়ে দিত।একুশে পদক ও অন্যান্য সম্মাননানাটকে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে একুশে পদক পান আলী যাকের। এ ছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনশিল্প, লেখালেখি ও আলোকচিত্রচর্চায় যুক্ত ছিলেন। নাটকে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে পান একুশে পদক।
জীবনাবসান
দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত থাকার পর ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আলী যাকের। বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। মৃত্যুর আগে তাঁর করোনাভাইরাসের সংক্রমণও ধরা পড়ে। মঞ্চ ও টেলিভিশনের স্মরণীয় চরিত্র, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা এবং বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন আলী যাকের। মৃত্যুর আগে করোনাভাইরাসের সংক্রমণও ধরা পড়ে। ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর, ৭৬ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
Source - www.prothomalo.com ↗