২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণেরা জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করলে এর মুখপাত্র হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচি, জনসংযোগ, টেলিভিশনের টক শোসহ নানা মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করেন সামান্তা শারমিন। কিছুদিনের মধ্যেই এই তরুণদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও দেশ নিয়ে ভাবনা তুলে ধরে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ করলে এর জ্যেষ্ঠ নেতাদের একজন হিসেবেও সামান্তা ছিলেন রাজনীতিসচেতন ব্যক্তিদের নজরে।
সেই সামান্তা শারমিন এখন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দলটি ছেড়ে যাওয়ায় অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে। হঠাৎ কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। এ নিয়ে ফেসবুকে অনেকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ করছেন।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিপি নেতৃত্বের সঙ্গে সামান্তার মতাদর্শিক বিরোধ শুরু হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করার সময় এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। এই জোটের বিরোধিতা করে এর আগেই এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ২০ জনের বেশি নেতা পদত্যাগ করেছেন। সর্বশেষ সেই তালিকায় নাম লেখালেন সামান্তা শারমিন।
এনসিপি নেতৃত্বের সঙ্গে সামান্তার বিরোধ চলছিল আগে থেকেই, এখন পদত্যাগে নানা প্রতিক্রিয়া
সারোয়ার তুষার, রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য, এনসিপিএনসিপিতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ আছেন। তিনি জামায়াতবিরোধী ব্লকের নেতৃত্ব দিতে পারতেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার প্রাক্তন শিক্ষার্থী সামান্তা গতকাল দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে নিজের অসন্তোষের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। সেই সঙ্গে দলে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতি এবং দলের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলার কথা বলেছেন।
তাঁর পদত্যাগে বিস্মিত নন বলে জানিয়েছেন এনসিপির নেতারা। তাঁরা বলছেন, সামান্তা শারমিন যেকোনো দিন এনসিপি ছেড়ে যাবেন, এ ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত ছিলেন। কারণ, এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকেই তিনি দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন। এখন তাঁর এই দল ত্যাগে এনসিপির লাভ বা ক্ষতি কোনোটিই হয়নি। কারণ, পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সামান্তা তাঁর ‘নিষ্ক্রিয়তাকেই একটি আনুষ্ঠানিক রূপ’ দিয়েছেন।
জামায়াত নিয়ে বিরোধ থেকে রাজনৈতিক পর্ষদ থেকে সরে যান সামান্তা
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতা হিসেবে একঝাঁক তরুণ মুখ জাতীয়ভাবে আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসেন। তাঁদের মধ্যে সামান্তা শারমিনের পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম ও নাজিফা জান্নাত, লন্ডনফেরত চিকিৎসক তাসনিম জারাসহ আরও বেশ কয়েকজন নারীনেত্রী ছিলেন।
তবে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি যখন জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করতে আলোচনা চালাচ্ছিল, সেই সময় প্রথম দিকেই দলটি ছেড়ে যান তাসনিম জারা। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকার একটি আসনে নির্বাচন করে হেরে যান তিনি। জামায়াত বিরোধিতা থেকে পরে দলটি ছেড়ে গেছেন আলোচিত নারীনেত্রী তাজনূভা জাবীন, সৈয়দা নীলিমা দোলা। এনসিপির আরও বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা সে সময় দলটি ছেড়ে যান।
সামান্তা শারমিন সামান্তা শারমিন তখন এনসিপি ছেড়ে না গেলেও দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হলেও সামান্তা ফেরেননি। তাঁর জবাব ছিল, এনসিপি জামায়াত জোট না ছাড়লে তিনি দলের রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরবেন না। পরে সামান্তার স্থলে অন্য একজন নেত্রীকে পর্ষদে যুক্ত করে এনসিপি।
এর পর থেকে এনসিপির সাংগঠনিক কার্যক্রম বা কর্মসূচিতে সামান্তা শারমিনকে আর সেভাবে অংশ নিতে দেখা যায়নি। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠিত হলে সেখানে কার্যত সামান্তার ‘পদাবনতি’ হয়। পুনর্গঠিত কমিটিতে সামান্তা শারমিনকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
সামান্তার অভিযোগ, এনসিপির জবাব
নাহিদ ইসলামকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে দল ছেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে চারটি বিষয় উল্লেখ করেছেন সামান্তা শারমিন। এর প্রথমটি হচ্ছে নিজস্ব রাজনৈতিক ‘লাইন’ স্পষ্ট না থাকায় এনসিপিকে জামায়াতের মধ্যে হারিয়ে যেতে হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের এই দলটিকে এখন জামায়াতের জন্য নানা ইস্যুতে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের ‘লেজুড়’ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি ও অভ্যুত্থানোত্তর নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে।
সামান্তা শারমিনের তৃতীয় অভিযোগ হচ্ছে এনসিপির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। নারীদের রাজনৈতিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে জামায়াত ও অতি ডানপন্থী শক্তিগুলোর রক্ষণশীল ও অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে এনসিপি। আর চতুর্থ কারণ হিসেবে কাউন্সিল এড়িয়ে এনসিপির কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে নিজের অসন্তোষের কথা পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন সামান্তা। এর মধ্য দিয়ে দলের অভ্যন্তরের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সামান্তা শারমিনসামান্তা বলেছেন, ‘এসব বিষয়ে (চার কারণ) বারবার পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানোর পরেও এনসিপি তার গতিপথ পরিবর্তন করতে আগ্রহী হয়নি। সে জন্য আমি দল থেকে পদত্যাগ করছি।’
তবে সামান্তার অভিযোগগুলোর কিছু ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি আর কিছু তথ্যগতভাবে সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের অন্যতম সদস্য সারোয়ার তুষার। সামান্তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে দলের অনেকের সঙ্গে কথা বললেও দলীয় ফোরামে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁকে সেভাবে আলোচনা করতে দেখা যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সামান্তা শারমিন তখন এনসিপি ছেড়ে না গেলেও দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হলেও সামান্তা ফেরেননি। তাঁর জবাব ছিল, এনসিপি জামায়াত জোট না ছাড়লে তিনি দলের রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরবেন না। পরে সামান্তার স্থলে অন্য একজন নেত্রীকে পর্ষদে যুক্ত করে এনসিপি।সম্প্রতি এনসিপির কমিটি পুনর্গঠনের আগে যোগাযোগ করা হলে সামান্তা কমিটিতে থাকতে অনাগ্রহ দেখাননি, তবে প্রত্যাশিত পদ নিয়ে কিছু বলেননি বলে জানান সারোয়ার তুষার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাইনি তিনি (সামান্তা) দল ছেড়ে যান। আমাদের আহ্বায়কও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ভিন্ন অবস্থানের কারণে যেন তাঁরা দলে কোনো অস্বস্তি বা চাপে না থাকেন।’
এনসিপিতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ আছেন উল্লেখ করে সারোয়ার তুষার বলেছেন, ‘তিনি (সামান্তা শারমিন) জামায়াতবিরোধী ব্লকের নেতৃত্ব দিতে পারতেন।’
সামান্তার দলত্যাগে এনসিপির লাভ বা ক্ষতি কোনোটিই দেখছেন না সারোয়ার তুষার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সামান্তা অনেক দিন ধরেই দলে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই নিষ্ক্রিয়তাটাকেই তিনি একটা আনুষ্ঠানিক রূপ দিলেন। এর ফলে নতুন করে দলের কোনো লাভ বা ক্ষতি আমরা দেখছি না।’
ফেসবুকে দুই নেত্রীর ‘খোঁচা’
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগকে ইঙ্গিত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনামূলক পোস্ট দিয়েছেন এনসিপির কেউ কেউ। তবে তাঁরা সামান্তার নাম উল্লেখ করেননি।
গতকাল রাতে এনসিপির দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কেবল মিডিয়া ফেস (মুখ) অথবা লাখ লাখ ফলোয়ারধারী নারীরাই গোটা নারীসমাজের এজেন্সির দাবিদার নন।...দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে—শুরু থেকেই এনসিপির নারী হিসেবে দু–একজনকে উপস্থাপন করা হয়েছে, দলের অন্য নারীদের রাজনৈতিক ফেস হয়ে ওঠা ঠেকানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে মাইনাস করায় যাঁদের সর্বোচ্চ ভূমিকা ছিল। দলের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ফেস হয়ে সুযোগ মতো দলের বুকে ছুরিকাঘাত করা সৎ নেতৃত্বের কাজ হতে পারে না।’
এনসিপির স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মনজিলা ঝুমাও ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট দিয়েছেন। গত রাতে তিনি লেখেন, এনসিপি অনেককে অনেক কিছুই দিয়েছে। জুলাইয়ে ঘরে বা বিদেশে বসে থেকেও অনেকে “জুলাই কন্যা” হয়ে গেছে এনসিপির বদৌলতে। পেছন থেকে ছুরিকাঘাত তাঁরাই সবার আগে করেছে। এখনো তাদের মিডিয়া–পরিচয় সাবেক এনসিপি নেত্রী। এনসিপি না থাকলে যাঁদের দিকে কেউ ফিরেও তাকাত না, এনসিপিকে তাঁরা মই হিসেবে ব্যবহার করে নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাবা শুরু করেছে।
এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন, বললেন ‘জামায়াতে হারিয়ে যাচ্ছে’ দলটিসামান্তার পাশে তাঁরা
এনসিপির বাইরের অনেকে অবশ্য সামান্তা শারমিনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ কেউ সামান্তাকে নিয়ে ‘অপপ্রচার ও নোংরামির’ সমালোচনা করেছেন। কেউ তাঁকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন।
আজ শুক্রবার সকালে এক ফেসবুক পোস্টে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অলটারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম লিখেছেন, ছয় সদস্যের বৈষম্যবিরোধী লিয়াজোঁ কমিটি থেকে চার শতাধিক কমিটির জাতীয় নাগরিক কমিটিতে উত্তরণ ও বিস্তারে যাঁদের মুখ্য অবদান আছে, তাঁদের নিয়ে নোংরামি ও অপপ্রচার একটা বাজে নজির। দল গঠনের দিন থেকে এ নজির সেই দলের তৎকালীন নেতৃত্বই স্থাপন করেছিলেন। গতকালও সামান্তা শারমিনকে নিয়ে একই কাণ্ড হলো।
কারও নাম উল্লেখ না করেই মাহফুজ লেখেন, ‘যাঁরা ভিত গড়ে দিয়ে জোটের কারণে চলে গেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন। তাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন বলেই দলটাকে আপনারা একটা শেইপে (আকার) পেয়েছিলেন। আর কৃতজ্ঞতা না দেখাতে পারলে রাজনৈতিক সহাবস্থান ও ভালো চর্চার খাতিরে নীরব থাকুন।’
জামায়াত জোটে যোগদানকে কেন্দ্র করে গত বছরের ডিসেম্বরে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন চিকিৎসক তাসনিম জারা। গতকাল রাতে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি সামান্তাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। তাসনিম জারা লিখেছেন, সামান্তা শারমিন সেই অল্প মানুষদের একজন, যাঁরা মানুষের জীবনকে বুঝতে ও পাশে দাঁড়াতে তাঁদের কাছে যান। জারার ভাষায়, ‘ওনার (সামান্তা) রাজনৈতিক জার্নি এখনো অনেক বাকি। এমন মানুষের জায়গা আমাদের রাজনীতিতে আরও বড় হওয়া দরকার।’
সামান্তাকে সমর্থন করে গতকাল সন্ধ্যায় এক ফেসবুক পোস্টে বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম লিখেছেন, ‘সামান্তা শারমিনের প্রতিটি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত। এনসিপি জামায়াতের বি টিম হিসেবে কাজ করছে।’
তাঁর পদত্যাগে বিস্মিত নন বলে জানিয়েছেন এনসিপির নেতারা। তাঁরা বলছেন, সামান্তা শারমিন যেকোনো দিন এনসিপি ছেড়ে যাবেন, এ ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত ছিলেন। কারণ, এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকেই তিনি দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন। এখন তাঁর এই দল ত্যাগে এনসিপির লাভ বা ক্ষতি কোনোটিই হয়নি। কারণ, পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সামান্তা তাঁর ‘নিষ্ক্রিয়তাকেই একটি আনুষ্ঠানিক রূপ’ দিয়েছেন।
জামায়াত নিয়ে বিরোধ থেকে রাজনৈতিক পর্ষদ থেকে সরে যান সামান্তা
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতা হিসেবে একঝাঁক তরুণ মুখ জাতীয়ভাবে আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসেন। তাঁদের মধ্যে সামান্তা শারমিনের পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম ও নাজিফা জান্নাত, লন্ডনফেরত চিকিৎসক তাসনিম জারাসহ আরও বেশ কয়েকজন নারীনেত্রী ছিলেন।
তবে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি যখন জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করতে আলোচনা চালাচ্ছিল, সেই সময় প্রথম দিকেই দলটি ছেড়ে যান তাসনিম জারা। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকার একটি আসনে নির্বাচন করে হেরে যান তিনি। জামায়াত বিরোধিতা থেকে পরে দলটি ছেড়ে গেছেন আলোচিত নারীনেত্রী তাজনূভা জাবীন, সৈয়দা নীলিমা দোলা। এনসিপির আরও বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা সে সময় দলটি ছেড়ে যান।
সামান্তা শারমিন সামান্তা শারমিন তখন এনসিপি ছেড়ে না গেলেও দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হলেও সামান্তা ফেরেননি। তাঁর জবাব ছিল, এনসিপি জামায়াত জোট না ছাড়লে তিনি দলের রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরবেন না। পরে সামান্তার স্থলে অন্য একজন নেত্রীকে পর্ষদে যুক্ত করে এনসিপি।
এর পর থেকে এনসিপির সাংগঠনিক কার্যক্রম বা কর্মসূচিতে সামান্তা শারমিনকে আর সেভাবে অংশ নিতে দেখা যায়নি। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠিত হলে সেখানে কার্যত সামান্তার ‘পদাবনতি’ হয়। পুনর্গঠিত কমিটিতে সামান্তা শারমিনকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
সামান্তার অভিযোগ, এনসিপির জবাব
নাহিদ ইসলামকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে দল ছেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে চারটি বিষয় উল্লেখ করেছেন সামান্তা শারমিন। এর প্রথমটি হচ্ছে নিজস্ব রাজনৈতিক ‘লাইন’ স্পষ্ট না থাকায় এনসিপিকে জামায়াতের মধ্যে হারিয়ে যেতে হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের এই দলটিকে এখন জামায়াতের জন্য নানা ইস্যুতে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের ‘লেজুড়’ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি ও অভ্যুত্থানোত্তর নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে।
সামান্তা শারমিনের তৃতীয় অভিযোগ হচ্ছে এনসিপির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। নারীদের রাজনৈতিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে জামায়াত ও অতি ডানপন্থী শক্তিগুলোর রক্ষণশীল ও অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে এনসিপি। আর চতুর্থ কারণ হিসেবে কাউন্সিল এড়িয়ে এনসিপির কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে নিজের অসন্তোষের কথা পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন সামান্তা। এর মধ্য দিয়ে দলের অভ্যন্তরের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সামান্তা শারমিনসামান্তা বলেছেন, ‘এসব বিষয়ে (চার কারণ) বারবার পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানোর পরেও এনসিপি তার গতিপথ পরিবর্তন করতে আগ্রহী হয়নি। সে জন্য আমি দল থেকে পদত্যাগ করছি।’
তবে সামান্তার অভিযোগগুলোর কিছু ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি আর কিছু তথ্যগতভাবে সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের অন্যতম সদস্য সারোয়ার তুষার। সামান্তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে দলের অনেকের সঙ্গে কথা বললেও দলীয় ফোরামে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁকে সেভাবে আলোচনা করতে দেখা যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সামান্তা শারমিন তখন এনসিপি ছেড়ে না গেলেও দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হলেও সামান্তা ফেরেননি। তাঁর জবাব ছিল, এনসিপি জামায়াত জোট না ছাড়লে তিনি দলের রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরবেন না। পরে সামান্তার স্থলে অন্য একজন নেত্রীকে পর্ষদে যুক্ত করে এনসিপি।সম্প্রতি এনসিপির কমিটি পুনর্গঠনের আগে যোগাযোগ করা হলে সামান্তা কমিটিতে থাকতে অনাগ্রহ দেখাননি, তবে প্রত্যাশিত পদ নিয়ে কিছু বলেননি বলে জানান সারোয়ার তুষার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাইনি তিনি (সামান্তা) দল ছেড়ে যান। আমাদের আহ্বায়কও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ভিন্ন অবস্থানের কারণে যেন তাঁরা দলে কোনো অস্বস্তি বা চাপে না থাকেন।’
এনসিপিতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ আছেন উল্লেখ করে সারোয়ার তুষার বলেছেন, ‘তিনি (সামান্তা শারমিন) জামায়াতবিরোধী ব্লকের নেতৃত্ব দিতে পারতেন।’
সামান্তার দলত্যাগে এনসিপির লাভ বা ক্ষতি কোনোটিই দেখছেন না সারোয়ার তুষার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সামান্তা অনেক দিন ধরেই দলে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই নিষ্ক্রিয়তাটাকেই তিনি একটা আনুষ্ঠানিক রূপ দিলেন। এর ফলে নতুন করে দলের কোনো লাভ বা ক্ষতি আমরা দেখছি না।’
ফেসবুকে দুই নেত্রীর ‘খোঁচা’
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগকে ইঙ্গিত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনামূলক পোস্ট দিয়েছেন এনসিপির কেউ কেউ। তবে তাঁরা সামান্তার নাম উল্লেখ করেননি।
গতকাল রাতে এনসিপির দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কেবল মিডিয়া ফেস (মুখ) অথবা লাখ লাখ ফলোয়ারধারী নারীরাই গোটা নারীসমাজের এজেন্সির দাবিদার নন।...দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে—শুরু থেকেই এনসিপির নারী হিসেবে দু–একজনকে উপস্থাপন করা হয়েছে, দলের অন্য নারীদের রাজনৈতিক ফেস হয়ে ওঠা ঠেকানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে মাইনাস করায় যাঁদের সর্বোচ্চ ভূমিকা ছিল। দলের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ফেস হয়ে সুযোগ মতো দলের বুকে ছুরিকাঘাত করা সৎ নেতৃত্বের কাজ হতে পারে না।’
এনসিপির স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মনজিলা ঝুমাও ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট দিয়েছেন। গত রাতে তিনি লেখেন, এনসিপি অনেককে অনেক কিছুই দিয়েছে। জুলাইয়ে ঘরে বা বিদেশে বসে থেকেও অনেকে “জুলাই কন্যা” হয়ে গেছে এনসিপির বদৌলতে। পেছন থেকে ছুরিকাঘাত তাঁরাই সবার আগে করেছে। এখনো তাদের মিডিয়া–পরিচয় সাবেক এনসিপি নেত্রী। এনসিপি না থাকলে যাঁদের দিকে কেউ ফিরেও তাকাত না, এনসিপিকে তাঁরা মই হিসেবে ব্যবহার করে নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাবা শুরু করেছে।
এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন, বললেন ‘জামায়াতে হারিয়ে যাচ্ছে’ দলটিসামান্তার পাশে তাঁরা
এনসিপির বাইরের অনেকে অবশ্য সামান্তা শারমিনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ কেউ সামান্তাকে নিয়ে ‘অপপ্রচার ও নোংরামির’ সমালোচনা করেছেন। কেউ তাঁকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন।
আজ শুক্রবার সকালে এক ফেসবুক পোস্টে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অলটারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম লিখেছেন, ছয় সদস্যের বৈষম্যবিরোধী লিয়াজোঁ কমিটি থেকে চার শতাধিক কমিটির জাতীয় নাগরিক কমিটিতে উত্তরণ ও বিস্তারে যাঁদের মুখ্য অবদান আছে, তাঁদের নিয়ে নোংরামি ও অপপ্রচার একটা বাজে নজির। দল গঠনের দিন থেকে এ নজির সেই দলের তৎকালীন নেতৃত্বই স্থাপন করেছিলেন। গতকালও সামান্তা শারমিনকে নিয়ে একই কাণ্ড হলো।
কারও নাম উল্লেখ না করেই মাহফুজ লেখেন, ‘যাঁরা ভিত গড়ে দিয়ে জোটের কারণে চলে গেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন। তাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন বলেই দলটাকে আপনারা একটা শেইপে (আকার) পেয়েছিলেন। আর কৃতজ্ঞতা না দেখাতে পারলে রাজনৈতিক সহাবস্থান ও ভালো চর্চার খাতিরে নীরব থাকুন।’
জামায়াত জোটে যোগদানকে কেন্দ্র করে গত বছরের ডিসেম্বরে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন চিকিৎসক তাসনিম জারা। গতকাল রাতে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি সামান্তাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। তাসনিম জারা লিখেছেন, সামান্তা শারমিন সেই অল্প মানুষদের একজন, যাঁরা মানুষের জীবনকে বুঝতে ও পাশে দাঁড়াতে তাঁদের কাছে যান। জারার ভাষায়, ‘ওনার (সামান্তা) রাজনৈতিক জার্নি এখনো অনেক বাকি। এমন মানুষের জায়গা আমাদের রাজনীতিতে আরও বড় হওয়া দরকার।’
সামান্তাকে সমর্থন করে গতকাল সন্ধ্যায় এক ফেসবুক পোস্টে বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম লিখেছেন, ‘সামান্তা শারমিনের প্রতিটি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত। এনসিপি জামায়াতের বি টিম হিসেবে কাজ করছে।’
Source - www.prothomalo.com ↗