Bangladesh · 2026-11-06 22:37:47

নিজের উপার্জনে নিজের জায়গা

নিজের উপার্জনে নিজের জায়গা
খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার ননতা ত্রিপুরা, রিপাই মারমা ও চেউং মারমা। এই তিন নারীর কাজ ও জীবনযাপনের ধরন আলাদা। তবে প্রতিদিনের শ্রম, জীবিকার অনিশ্চয়তা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের স্বপ্নে মিল রয়েছে। তাঁদের জীবন শুধু অভাবের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়, নিজের উপার্জনের পথ তৈরি করে পরিবার ও সমাজে নিজের অবস্থান গড়ে তোলারও গল্প।
জুমের কাজ করে তাঁত বোনেন ননতা
খাগড়াছড়ির পানছড়ির দুর্গম পদ্মিনীপাড়ার বাসিন্দা, ৫০ বছর বয়সী ননতা ত্রিপুরার দিন শুরু হয় ভোরের আলো ফোটার আগেই। চতুর্থ শ্রেণিপড়ুয়া ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় এক কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পানি আনতে যান। বাড়ি ফিরে রান্না ও ঘরের কাজ সেরে তাঁকে স্বামীর সঙ্গে ছুটতে হয় জুমে; স্বামী–স্ত্রী সেখানে সারা দিন কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকেন। জুমের লতাগুল্ম, ঝোপঝাড়, গাছপালা পোড়ানো থেকে শুরু করে বীজ বপন, ফসলের পরিচর্যা ও ফসল তোলা—সব কাজেই ননতা সমান অংশীদার। তাঁরা জুমে ধান, তিল, হলুদ, কুমড়া, আদা, মারফা, চিনাল, বেগুন এবং পাহাড়ি মসলা চাষ করেন।
ননতা কিছু বাড়তি আয়ের জন্য কোমরতাঁতে বোনেন ঐতিহ্যবাহী পোশাক রিনাই-রিসা। এই পোশাক তিনি শুধু বিক্রি করেন না, নিজেও পরেন। একটি রিনাই-রিসা তৈরি করতে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লাগে। এ ছাড়া তিনি শূকর, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন করেন। জঙ্গল থেকে ঢেঁকিশাক, কচু, বাঁশকোঁড়লসহ বিভিন্ন বনজ খাদ্য সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেন। এসব আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনেন।
‘আগে সংসারের সব সিদ্ধান্ত নিত আমার স্বামী। এখন দুজন মিলেই সিদ্ধান্ত নিই...নিজের মতটা স্পষ্ট করে বলি’ননতা ও তাঁর স্বামী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। তাই তাঁরা তিন ছেলেকে পড়াশোনা করাতে চান। বড় ছেলে আত্মীয় বাড়িতে থেকে খাগড়াছড়ি কলেজে, মেজ ছেলে গাজীপুরে একটি আশ্রম পরিচালিত হোস্টেলে থেকে দশম শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে গ্রামের বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে জুমচাষের পাশাপাশি বাড়তি কাজ করতে হয় ননতাকে। তিনি বলেন, ‘আমরা পড়াশোনা করতে পারিনি। তাই ছেলেদের পড়াশোনা করাতে চাই। ওরা যেন আমাদের মতো শুধু কষ্টের কাজ করে জীবন কাটাতে বাধ্য না হয়। তাদের পড়াশোনার খরচ চালানো সহজ নয়। তবু মনে হয়, এই কষ্ট একদিন সার্থক হবে।’
সবজি বিক্রির টাকায় চলে সংসার
৩৫ বছর বয়সী রিপাই মারমা ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম থেকে ওঠেন। রান্নাবান্না সেরে সকাল আটটার দিকে বের হন প্রায় চার কিলোমিটার দূরের পানছড়ি বাজারের উদ্দেশে। সেখানে তিনি সবজি বিক্রি করেন। দৈনিক আয় হয় ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা। কিন্তু এ আয় নিয়মিত নয়। বৃষ্টি হলে খোলা আকাশের নিচে বসে সবজি বিক্রি করা যায় না। সবজি পচনশীল, সময়মতো বিক্রি না হলে লোকসান গুনতে হয়।
রিপাই মারমার স্বামী স্বপন চাকমা করাতকলের অনিয়মিত শ্রমিক। তাঁদের বড় মেয়ে কলেজে পড়ে, ছোট ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে। নিজেদের আট শতক বসতভিটা থাকলেও সংসারের ব্যয় ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে দুজনকেই সংগ্রাম করতে হয়।
রিপাই আগে গরু-ছাগল পালন ও দিনমজুরি করতেন। পরে স্বামীর সঙ্গে পাড়ায় মুদিদোকান ও চায়ের দোকান খুলেছিলেন। কিন্তু বাকিতে পণ্য বিক্রি করতে করতে দেনা বেড়ে যায়; দোকানটা চালাতে পারেননি। তারপর তিনি সবজি বিক্রি শুরু করেন। প্রথম দিকে প্রতিবেশীদের বাড়িতে হওয়া সবজি বাজারে এনে বিক্রি করতেন, এখন নানা জায়গা থেকে কিনে এনে বিক্রি করেন। পাঁচ বছর ধরে তিনি এভাবেই সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন।
সবজি বিক্রি করেন রিপাই মারমা (বাঁয়ে), মোমবাতি তৈরি করে বিক্রি করেন চেউং মারমারিপাই নিজে উপার্জন শুরু করার পর জীবনে পরিবর্তন লক্ষ করেছেন। তিনি বললেন, ‘আগে সংসারের সব সিদ্ধান্ত নিত আমার স্বামী। এখন দুজন মিলেই সিদ্ধান্ত নিই। বাজার থেকে কী আনব, কত টাকা কোথায় খরচ করব, সন্তানদের পড়াশোনার জন্য কীভাবে টাকা রাখব—এসব বিষয়ে স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করি, নিজের মতটা স্পষ্ট করে বলি।’ তিনি স্বামীর সহযোগিতার কথাও বলেন, ‘অনেক সময় সবজি বিক্রি করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। তখন স্বামী বাড়িতে থাকলে রাতের রান্নাটা করে রাখে।’
সুইয়ে সুতা, আর ফারজানার হাতে সংসারের হিসাব তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা রিপাইয়ের কাজের বড় বাধা। তাঁর হাতে বেশি পুঁজি থাকলে আরও বেশি সবজি কিনে আনতেন। এখন পুঁজি কম বলে অল্প পণ্য নিয়ে বসেন। লোকসান হলে পরের দিনের বাজারের টাকা জোগাড় করাই কঠিন হয়ে যায়।
নিজের খরচ নিজে চালিয়ে স্নাতকোত্তর
পানছড়ি সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে যৌথ খামার মারমা পাড়ায় চেউং মারমার (২৬) বাড়ি। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। বাবা মংথাক মারমা জুমচাষি। জুমের ফসল দিয়ে পরিবারের সবার খাবারের চাহিদা মেটানো কঠিন ছিল। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোও তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না। বড় চার ভাইবোন প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কমানোর পথ খুঁজতে থাকেন চেউং।
চেউং নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় টিউশনি শুরু করেন, ছোট শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে টিউশনি করে খুব বেশি টাকা পেতাম না। কিন্তু সেই সামান্য আয়ও আমার কাছে অনেক বড় ছিল। ওই টাকা দিয়ে বই কিনতে পারতাম, পরীক্ষার ফি দিতে পারতাম, নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারতাম।’
জয়ন্তী দেওয়ান, প্রতিনিধি, প্রথম আলো, খাগড়াছড়িচেউং ২০১৫ সালে এসএসসি পাস করে পানছড়ি কলেজে ভর্তি হন। এইচএসসি পাসের পর একই কলেজে স্নাতক শেষ করেন। যদিও স্নাতক সম্পন্ন করা তাঁর জন্য অনেক সংগ্রামের ছিল। সে সময় টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। তখন তিনি বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে মোমবাতি তৈরি শেখেন। তারপর এলাকার বিভিন্ন ছোট দোকানে মোমবাতি সরবরাহ শুরু করেন। তাঁর এলাকার অধিকাংশ মানুষ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। প্রতিদিন পূজা-অর্চনায় তাঁদের মোমবাতির প্রয়োজন হয়। কেউ ফোন করে অর্ডার দিলে চেউং মোমবাতি পৌঁছে দেন।
চেউং বলেন, ‘মোমবাতি তৈরির কাজ শেখার সময় অনেকেই বলেছিল, এই কাজ করে কী হবে। কিন্তু আমি মনে করি, কোনো কাজই ছোট নয়। নিজের হাতে কিছু তৈরি করে বিক্রি করতে পারলে অন্তত নিজের ওপর নির্ভর করা যায়।’
চেউং ২০২১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়ে দুই বছরে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এখনো তিনি মোমবাতি তৈরি ও বিক্রি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। একটি পুরোনো মোটরসাইকেল কিনেছেন। সেটি চালিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মোমবাতি পৌঁছে দেন। মোমবাতি বিক্রি ও টিউশনি মিলিয়ে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা আয় করেন।
কষ্টে কাটে জীবন, তবু হাসির মুখে হাসিচেউং নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানেন, আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়। তাই তিনি নিজের জীবিকা উপার্জনের পাশাপাশি স্থানীয় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে শিশুদের পড়ান। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় এখনো কুপি জ্বালিয়ে পড়তে হয়। এখানকার অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তাই আমি চাই গ্রামের শিশুরা যেন অভাবের কারণে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে না যায়।’
চেউং স্কুলজীবনে ফুটবল খেলে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কারাতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি তাঁর এলাকার নারী ও শিশুদের বিনা মূল্যে কারাতে শেখান। তিনি বলেন, ‘আমি চাই, তারা যেন নিজেদের দুর্বল মনে না করে। আত্মরক্ষার কৌশল শেখার পাশাপাশি নিজের কথা বলার সাহসও তাদের থাকতে হবে।’
পার্বত্য চট্টগ্রামের সব নারীর জীবন এক রকম নয়। জাতিগোষ্ঠী, পরিবার, বসতি ও জীবিকার ধরন অনুযায়ী তাঁদের বাস্তবতায় পার্থক্য রয়েছে। এই তিন নারীর অভিজ্ঞতা সেই বৈচিত্র্যের মধ্যে তাঁদের শ্রম ও স্বপ্নের কিছু দিক তুলে ধরে। l
জয়ন্তী দেওয়ান
প্রতিনিধি, প্রথম আলো, খাগড়াছড়ি

Source - www.prothomalo.com ↗