জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে ক্যানসার নিয়ে গবেষণা হয়। হাসপাতালের আইসিইউর জন্য ১৬ বছর আগে কেনা হয়েছিল আটটি অত্যাধুনিক আর্টিফিশিয়াল রেসপিরেটরি ভেন্টিলেটর (এআরভি) মেশিন।
৭০ লাখ টাকায় কেনা অত্যন্ত মূল্যবান এসব মেশিন একবারের জন্যও ব্যবহার হয়নি। হাসপাতালটিতে ২০১০ সালের পর থেকে এমআরআই বন্ধ রয়েছে, এক্স-রে বন্ধ পাঁচ বছর ধরে। সরকারি এই ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে ২০০৫ সালে কেনা হয় আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস অ্যানালাইজার মেশিন। কিন্তু প্রয়োজনীয় রিএজেন্টের অভাবে বছর পাঁচেক ধরে এর একটি অব্যবহৃত ও অচল অবস্থায় রয়েছে।
আর রিএজেন্টের জন্য ২০১৭ সাল থেকে হাসপাতালের পরিচালককে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। আরেকটি যন্ত্র লাগানোই হয়নি। দুটিই এখন আইসিইউর ভেতর একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রণযন্ত্রহীন কক্ষে পড়ে আছে। অন্যদিকে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে একটি এফেরেসিস মেশিন (রক্তকণিকা পৃথক করার যন্ত্র) মাঝেমধ্যেই প্রয়োজনীয় কিটের অভাবে বন্ধ থাকে।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অচল

আর ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তে ব্যবহৃত হয় এমন চারটি ব্রঙ্কস্কোপ যন্ত্র পড়ে রয়েছে হাসপাতালের গুদামে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতির কারণে ব্যবহার করা যায়নি এসব যন্ত্রপাতি। সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটে দেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে আধুনিক স্থাপনা হিসেবে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে।
জনবলের ঘাটতিতে ওই হাসপাতালে যন্ত্রপাতিতে জং তো ধরেছেই; ঘটেছে চুরির ঘটনাও। গত বছর হাসপাতালটির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কম্পিউটারসহ কমপক্ষে ২০ লাখ টাকার মালামাল চুরি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হলেও চলতি বছর শেষ হতে চললেও হাসপাতালটি এখনো ধুঁকছে জনবল ঘাটতিতে। শুধু এই দুটি হাসপাতাল নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হচ্ছে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম।
কিন্তু এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অনেক যন্ত্রই বছরের পর বছর পড়ে থাকছে অব্যবহৃত। কোথাও যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও তা চালানোর মতো প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট নেই, কোথাও আবার যন্ত্র চালু করার পর প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে একদিকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের হাজার কোটি টাকা।
চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে সাধারণত যন্ত্রের মূল্য, আমদানি ব্যয়, স্থাপন ও সরবরাহের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলেও যন্ত্রটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্ট, প্রশিক্ষিত অপারেটর এবং প্রকৌশলীর ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়েও রয়েছে সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ। ফলে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে পড়ে থাকছে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, অ্যানেসথেসিয়া, আইসিইউ ও অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম।
কোথাও যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি, কোথাও স্থাপন করা হলেও ব্যবহার হচ্ছে না, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার পর সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা না গেলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বদলে তা রাষ্ট্রের জন্য আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়। অথচ এসব যন্ত্রপাতি সচল থাকলে সরকারি হাসপাতালেই কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।
জনবল সংকটই এই অচলাবস্থার প্রধান কারণ হিসেবে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কর্মী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই হাসপাতালটিতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সংকট দীর্ঘদিনের আলোচিত সমস্যা; বিশেষ করে রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং, ল্যাবরেটরি মেডিসিন, অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ-সংশ্লিষ্ট বিভাগে দক্ষ জনবল না থাকলে আধুনিক যন্ত্রপাতি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
একটি সিটি স্ক্যান বা এমআরআই যন্ত্র স্থাপন করলেই রোগীদের পরীক্ষা করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট, চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও পরিবেশগত ব্যবস্থা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্রের ত্রুটি নির্ণয়ের সক্ষমতা। একইভাবে, আধুনিক ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল। জনবল না থাকলে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
আবার জনবল থাকলেও প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট, যন্ত্রাংশ বা রক্ষণাবেক্ষণ না থাকলে সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটি শুধু এই হাসপাতালের নয়, দেশের অন্যান্য হাসপাতালের চিত্রও একই বলেও মত তার। সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও তা ব্যবহার করা না গেলে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বাড়ে চিকিৎসার ব্যয়; বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত রোগীদের জন্য সরকারি হাসপাতালে কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অচল থাকলে তাদের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়। ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্নায়ুরোগ ও জটিল শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরীক্ষা সময়মতো করা না গেলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব হতে পারে। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি অচল থাকার কারণে রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে কি না, কোন কোন পরীক্ষা বাইরে করতে হচ্ছে এবং এতে রোগীদের অতিরিক্ত কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাবও অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার ভূমিকা রয়েছে। কোনো হাসপাতালের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার আগে সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল, বিদ্যুৎ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্র পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
কিন্তু এসব বিষয় নিশ্চিত না করে যন্ত্রপাতি কেনা হলে তা অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। অনেক যন্ত্রের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পরপর সার্ভিসিং, যন্ত্রাংশ পরিবর্তন এবং প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তা নিতে হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যন্ত্রপাতি কেনার পর কয়েক বছর ব্যবহার না করলে বা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে; বিশেষ করে সংবেদনশীল চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার কারণে যন্ত্রের কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে যন্ত্রপাতি কেনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় আরও বাড়ে। স্বাস্থ্য খাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার উদ্দেশ্য হলো চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু যন্ত্রপাতি কেনার পর সেগুলো সচল রাখা না গেলে সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এ ক্ষেত্রে শুধু জনবল সংকটকে দায়ী করে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। যন্ত্রপাতি কেনার পরিকল্পনা, ক্রয়প্রক্রিয়া, স্থাপন, প্রশিক্ষণ, ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ— প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মত তার।
তবে সরকার এ নিয়ে কাজ করছে জানিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আপনারা জানেন, বিগত সরকার স্বাস্থ্য খাতকে ভঙ্গুর করে রেখে গেছে। আমরা এই খাতটির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। জনবলের ঘাটতি পূরণে খোদ প্রধানমন্ত্রী লোক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রেও আমরা একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছি।
এর ফলাফল আপনারা কিছুদিনের মধ্যেই দেখতে পারবেন।
The post জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অচল appeared first on Bangladesh Diplomat | বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাট.
Source - bangladeshdiplomat.com ↗