Bangladesh · 2026-11-06 23:19:31

পোশাক শিল্পে সহিংসতা: কার স্বার্থসিদ্ধি ও রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ

পোশাক শিল্পে সহিংসতা: কার স্বার্থসিদ্ধি ও রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ
পোশাক শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে ধারাবাহিক সহিংসতার ঘটনায় রাজনৈতিক ইন্ধন ও অর্থায়নের অভিযোগ সামনে এসেছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে পুঁজি করে অস্থিতিশীলতা তৈরির পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

উসকানিদাতা ও অর্থদাতা হিসেবে সন্দেহভাজন দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনও পর্যবেক্ষণ করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। গত ১ থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মিরপুরে পাঁচটি, সাভারে দুটি, আশুলিয়ায় ছয়টি, গাজীপুরে চারটি এবং নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও রূপগঞ্জ থানায় একটি করে মামলা হয়েছে।

এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন দেড় শতাধিক। তবে এত বিপুলসংখ্যক আসামির মধ্যে প্রকৃত শ্রমিক, বহিরাগত ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের সংখ্যা কত, তা স্পষ্ট নয়। আন্দোলনে পুলিশের গাড়ি, কারখানা, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি পুলিশ সদস্য, শ্রমিক, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। গাজীপুরে মারধরের শিকার হয়ে এক পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুও হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নেড়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ শ্রমিকদের দাবির আড়ালে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কারখানার যন্ত্রপাতি, যানবাহন ও সরঞ্জাম ভাঙচুরের মাধ্যমে শিল্প খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগের পাশাপাশি শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি অসন্তোষ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং শিল্পাঞ্চলে স্থানীয় আধিপত্য ও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অসন্তোষকে কারা সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? এর মাধ্যমে কোন রাজনৈতিক বা ব্যাবসায়িক গোষ্ঠী স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করছে? রাজধানীর মিরপুরে গত ১ নভেম্বর শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের একপর্যায়ে মিরপুর-১১ মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশের একটি পিকআপে আগুন দেওয়া হয়। আগুন নেভাতে গেলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ধাওয়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

একই এলাকায় একটি পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। এর দুই দিন পর ৩ নভেম্বর কালশী সড়কে পুলিশ সদস্য সাইমনকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আহত করেন কয়েকজন। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অন্যদিকে পুলিশের পিকআপে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রাজিব চন্দ্র দাস নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মোট ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাভার-আশুলিয়াতেও কয়েক দফা সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। গত ২ নভেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের সময় একটি পোশাক কারখানার কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় এক পুলিশ সদস্য আহত হন।

৪ নভেম্বর সাভারের হেমায়েতপুরে সংঘর্ষের সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এতে সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম, পুলিশ সদস্য, সাংবাদিক ও শ্রমিকসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। পরে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। গাজীপুরে ১ নভেম্বর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, মৌচাক, সফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায়।

শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের মধ্যে কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। কালিয়াকৈরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের গাড়িসহ অন্তত ১৫টি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। একটি কারখানার ঝুট গোডাউনেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। গাজীপুরের সহিংসতার ঘটনায় চারটি মামলায় প্রায় চার হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। অন্যদিকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সাভার ও আশুলিয়ায় আটটি মামলায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে সাভার মডেল থানায় দুটি এবং আশুলিয়া থানায় ছয়টি মামলা হয়েছে। গাজীপুরে আন্দোলন চলাকালে তৌফিক হোসেন (২১) নামে এক পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ১ নভেম্বর বাংলাবাজার এলাকায় একটি কারখানা ভাঙচুরের ভিডিও ধারণ করছিলেন তিনি।

এ সময় মারধরের শিকার হয়ে আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ নভেম্বর তার মৃত্যু হয়। শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে আসছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সীমান্তের ওপার থেকে কিছু ব্যক্তি সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে মুখোশধারীদের অংশগ্রহণের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, তদন্তে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সাবেক জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং কিছু কারখানার মালিকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। তাদের ভাষ্য, নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পরও একটি পক্ষ শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের তথ্যও তাদের কাছে রয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার অভিযোগ করেছেন গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান। তার দাবি, আন্দোলনের নামে পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। এতে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কারা অর্থ জুগিয়েছে, কারা নির্দেশনা দিয়েছে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কীভাবে হয়েছে কিংবা তদন্তে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

সন্দেহভাজন দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখার বিষয়টিও এখনো তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। শিল্পাঞ্চলের সহিংসতার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারখানার ঝুট ব্যবসা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পর এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে— এমন অভিযোগ আছে। স্থানীয় আধিপত্য ও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধে কোনো কোনো পক্ষ শ্রমিকদের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া শ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের মজুরি অসন্তোষ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা।

বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি, তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। তাদের অভিযোগ, বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের লেখাপড়া ও যাতায়াত খরচ মেটাতে বর্তমান মজুরি যথেষ্ট নয়। অতিরিক্ত সময় কাজ করেও সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেককে। শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার।

৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম বৈঠকে নতুন মজুরি কাঠামো ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর এবং ডিসেম্বরের বেতন জানুয়ারিতে পরিশোধের বিষয়ে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা একমত হন। তবে নতুন মজুরির পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ডিসেম্বরের মধ্যেই মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে বোর্ডের। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন।

দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ফলে শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শ্রমিকদের জীবিকা, উৎপাদন ও রপ্তানির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

The post পোশাক শিল্পে সহিংসতা: কার স্বার্থসিদ্ধি ও রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ appeared first on Bangladesh Diplomat | বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাট.

Source - bangladeshdiplomat.com ↗