Bangladesh · 2026-11-07 10:00:00

বাবা

বাবা
শামীম সারা দিন এত ব্যস্ত ছিল যে সে কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল। শায়ন্তীকে কবরে শোয়ানো হয়েছে আসরের নামাজের পর। তার পরেও অনেকক্ষণ তারা কবরস্থানে ছিল। রূপাকে সেখান থেকে বাড়িতে আনা যাচ্ছিল না। তারা অবশেষে বাড়ি ফিরেছে মাগরিবের পর। রাত নয়টার দিকে ড্রয়িংরুমে এশার নামাজে দাঁড়িয়ে শামীম আর কান্না ধরে রাখতে পারল না। রূপা তখনো বেডরুমে তসবিহ হাতে বসে কাঁদছে।
ঝাড়া কয়েক মিনিট কাঁদল শামীম। তার কান্নায় ব্যাঘাত ঘটাল একটা ফোনকল। সারা দিন অনেক ফোন এসেছে; সে কিছু কল ধরতে পেরেছে, কিছু পারেনি। এখন যে নম্বর থেকে কলটা এল, সেটা তার ফোনে সেভ করা নেই। সারা দিন সে অনেক আনসেভড নম্বর থেকে আসা কল রিসিভ করেছে। নম্বরটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সে কলটা ধরতে ধরতে জায়নামাজ ছেড়ে পাশে একটা সোফায় গিয়ে বসল।
‘আসসালামু আলাইকুম।’
‘এটা শামীমের ফোন?’ ওপাশ থেকে কেউ জানতে চায়।
‘জি, বলছি।’ শামীম চোখ মুছতে মুছতে বলে।
‘আমি এমদাদ।’
শামীম কণ্ঠটা চিনতে পারে। সে বুঝে যায় লোকটা এখন তাকে কী বলবে। সে বলল, ‘বলুন, এমদাদ সাহেব।’
‘আপনি আজ আমার মেয়েকে কবর দিয়ে এলেন, আর আমাকে কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন না!’ এমদাদের কণ্ঠে উত্তাপ। শামীম জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। পাশের বাড়ির রান্নাঘর দেখা যাচ্ছে; সেখানে ঘটর-ঘটর শব্দ হচ্ছে, কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না। মনে হয় কেউ মসলা পিষছে।
শামীম এখন আর কাঁদছে না। সে নির্লিপ্ত গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, জানাইনি।’
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। শামীমকে ফোন করার আগে এমদাদ অনেক বকাবকি করবে বলে তৈরি হয়ে ছিল। ঘরের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে কয়েকবার প্র্যাকটিসও করেছে। সে প্রচণ্ড রেগে আছে; মেয়ের মৃত্যুর খবর তাকে জানানো হয়নি বলে সে অপমানিত বোধ করেছে, তাকে বাবার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে শামীমকে তার গালি দিতে ইচ্ছা হয়েছে।
কিন্তু সে এ মুহূর্তে রাগ প্রকাশ করতে পারে না। বলে, ‘কেন জানালেন না?’
‘মেয়েটা আজ মারা গেছে, এমদাদ সাহেব, আমরা এই আলাপ আরেক দিন করি? আজ ওর জন্য দোয়া করার সময়।’
‘আমি জানি ও মারা গেছে।’ এমদাদের গলা চড়ে যায়।
‘তাহলে তো জানেন কেন কবর দিয়েছি।’
‘আপনি…আর ইউ জোকিং উইথ মি?’
‘না ভাই, একেবারেই না।’
‘মনে রাখবেন, আমি ওর বাবা।’
‘আমি জানি।’
‘তাহলে, ওর আসল বাবাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি আপনি?’
‘না।’ শামীম শান্ত গলায় বলে।
দুজন চুপ করে থাকে। শামীম এমদাদের নিশ্বাস–প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়। এবার সে জানতে চায়, ‘ওর ক্যানসারটা কবে ধরা পড়েছিল?’
‘এক বছর আগে।’
‘এক বছর!’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি আজ আমার মেয়েকে কবর দিয়ে এলেন, আর আমাকে কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন না!’ এমদাদের কণ্ঠে উত্তাপ। শামীম জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। পাশের বাড়ির রান্নাঘর দেখা যাচ্ছে; সেখানে ঘটর-ঘটর শব্দ হচ্ছে, কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না। মনে হয় কেউ মসলা পিষছে।‘আপনার একবারও মনে হলো না, আমাকে জানানো উচিত?’
শামীম চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, ‘জানা একটা অদ্ভুত ব্যাপার, এমদাদ সাহেব।’
‘মানে?’
‘অনেক সময় আমরা অনেক কিছু জানি, কিন্তু তাতে কিছু আসে-যায় না, কিছু বদলায় না, আমরা কিছুই করতে পারি না।’
‘আমার তো জানার অধিকার ছিল।’
‘ছিল।’
‘আপনি সেটা স্বীকার করছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে জানাননি কেন?’
‘আমি জানি না, এমদাদ সাহেব।’
এমন উত্তর এমদাদ আশা করেনি। সে ভেবেছিল শামীম নানা যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করবে, নানা অজুহাত দেখাবে। সেসবের বিরুদ্ধে নানা কথা বলা যায়, ঝগড়া করা যায়, আক্রমণ করা যায়। কিন্তু কেউ যখন বলে ‘জানি না’, তখন তাকে আক্রমণ করার স্পৃহা কমে যায়।
‘কী ক্যানসার হয়েছিল ওর?’
‘হাড়ের, বোন ক্যানসার।’
‘অনেক কষ্ট হয়েছে মেয়েটার?’
‘হ্যাঁ, অনেক। আমি গত এক মাস দোয়া করেছি আল্লাহ যেন ওকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যান।’
‘অনেক কাঁদত নাকি?’ এমদাদ এবার নরম গলায় জানতে চায়।
‘মাঝে মাঝে। বেশির ভাগ সময় ব্যথার ইনজেকশন দেওয়া হতো।’
‘আমার কথা কি কখনো জানতে চেয়েছে?’
শামীম চুপ করে থাকে।
এমদাদ আবার জানতে চায়, ‘চেয়েছিল?’
‘হ্যাঁ, একবার।’
এমদাদের গলায় উৎকণ্ঠা, ‘কী বলেছিল? কী জানতে চেয়েছিল?’
‘জানতে চেয়েছিল আপনি কোথায় থাকেন, আর আপনার ফোন নম্বর।’
‘তারপর?’
‘আমি ওকে বলেছিলাম।’
এমদাদের কথাগুলো শুনে শামীম চোখ বন্ধ করল। কাল রাতের কথা মনে পড়ল তার। শায়ন্তী হাড্ডিসার হয়ে গিয়েছিল। কিছুই খেতে পারছিল না, একটা নল দিয়ে তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, সে হা-আ-হ হা-আ-হ করে শ্বাস নিচ্ছিল।‘ব্যস, এটুকুই?’
‘হ্যাঁ।’
‘ও কি কখনো আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল?’
‘না, তা কখনো চায়নি।’
‘আমার মনে হয়, ও চেয়েছে, আপনি ওকে বাধা দিয়েছেন।’
‘না।’
‘আপনিই কখনো ওকে ওর বাবার কাছে আসতে দেননি।’
শামীম জায়নামাজের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘শায়ন্তী আপনার নাম জানত।’
‘আমার নাম?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমি কি ওর কাছে শুধু একটা নাম ছিলাম?’
‘না।’
‘আমি ওর বাবা।’
‘হ্যাঁ।’
‘হ্যাঁ’ শব্দটা শুনতে শুনতে এমদাদের মনে হয়, শামীমকে হাতের কাছে পেলে তার গালে কষে চড় বসিয়ে দিত।
‘আপনি ওকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন।’ এমদাদ বলে।
‘নাহ্, এমদাদ সাহেব; আমি তা কখনোই করিনি।’
‘ওর মা, আমার স্ত্রী রূপাকেও ছিনিয়ে নিয়েছেন আপনি।’
‘না, রূপা আপনাকে ছেড়ে চলে এসেছিল।’
‘আপনিই ওকে আমার বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে গেছেন।’
‘না, ওদের বেরিয়ে আসা আপনার জীবনযাপনের এক লজিক্যাল কনসিকোয়েন্স।’
‘আমাদের বিয়ের আগে আপনি রূপাকে চিনতেন, আপনি ওর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।’
‘না।’
‘সব কথায় না না করছেন কেন?’
‘কারণ, কিছু কথা তো আসলেই না, আমি আপনার অনেক প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বলেও দিয়েছি।’
এমন উত্তর এমদাদ আশা করেনি। সে ভেবেছিল শামীম নানা যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করবে, নানা অজুহাত দেখাবে। সেসবের বিরুদ্ধে নানা কথা বলা যায়, ঝগড়া করা যায়, আক্রমণ করা যায়। কিন্তু কেউ যখন বলে ‘জানি না’, তখন তাকে আক্রমণ করার স্পৃহা কমে যায়।এমদাদ এবার বলল, ‘অন্যের মেয়েকে মানুষ করে খুব আনন্দ পেয়েছেন?’
‘না।’
‘তাহলে করলেন কেন?’
‘শি ওয়াজ দেয়ার। শি ওয়াজ জাস্ট আ লজিক্যাল কনসিকোয়েন্স অব মাই ম্যারেজ উইথ রূপা।’
এমদাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। শামীম কথা চালিয়ে যায়: ‘সকালে ওকে ঘুম থেকে তুলতে হতো, নাশতা খেতে চাইত না, কিন্তু খাওয়াতে হতো, সময়মতো স্কুলের বেতন দিতে হতো, ওর পরীক্ষার দিন কাউকে না কাউকে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। ওকে রাস্তা পার হওয়া শেখাতে হয়েছে, ইউনিভার্সিটির জন্য তৈরি করতে হয়েছে...। তারপর গত এক বছর তো হাসপাতালেই কেটে গেল।’
‘বাহ্, টাকা দিলেই যদি বাবা হওয়া যায়! তাহলে তো…’
‘না, হওয়া যায় না।’ শামীম সুন্দর করে বলে।
‘তাহলে, এত বাবাগিরি দেখাচ্ছেন কেন?’
‘জানি না।’
শামীমের অনেক বছর আগেকার কথা মনে পড়ে। পাঁচ বছরের একটা মেয়ে ডাইনিং টেবিলে তার চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, স্কুলে যাবে। কিন্তু শুধু এক পায়ে জুতা পরেছে, আরেক পা খালি। জুতার কথা তার মনেই নেই; সে পাপার কাছে জানতে চাইছিল, পিঁপড়া রাতে ঘুমায় কি না। সে বলেছিল, ‘ঘুমায় তো।’ মেয়ে বলেছিল, ‘তাহলে, কাল রাতে আমার গায়ে কয়েকটা পিঁপড়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল কী করে; তুমি দেখোনি?’ শামীম বলেছিল, ‘না সোনা, আমি দেখিনি। কামড় দিয়েছে, পাপা?’ মেয়ে খুব বিরক্ত হয়ে বলেছিল, ‘তুমি কেমন পাপা? এসব খেয়াল রাখো না কেন? যদি কামড়ে দিত?’
এমদাদের গলা শোনা যায়, ‘আপনি তো দেখি কিছুই জানেন না।’
শামীম বলে, ‘না, আসলেই জানি না।’
কথাটা শুনে এমদাদ এবার হেসে উঠল। খুব আনন্দের হাসি নয়। গলায় জোর এনে বলল, ‘আমিই ওকে এই পৃথিবীতে এনেছি; ওর শরীরে আমার রক্ত ছিল।’
‘হ্যাঁ।’
এমদাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। শামীম কথা চালিয়ে যায়: ‘সকালে ওকে ঘুম থেকে তুলতে হতো, নাশতা খেতে চাইত না, কিন্তু খাওয়াতে হতো, সময়মতো স্কুলের বেতন দিতে হতো, ওর পরীক্ষার দিন কাউকে না কাউকে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। ওকে রাস্তা পার হওয়া শেখাতে হয়েছে, ইউনিভার্সিটির জন্য তৈরি করতে হয়েছে...। তারপর গত এক বছর তো হাসপাতালেই কেটে গেল।’‘ও আমার মতো দেখতে হয়েছিল।’
‘সামান্য। শায়ন্তী আসলে ওর মায়ের কপি ছিল।’
‘আপনি রক্ত বদলাতে পারবেন না, শামীম।’
‘আমি সেই চেষ্টা করিনি, এমদাদ সাহেব।’
‘আপনি কোটি টাকা খরচ করলেও ওর বায়োলজিক্যাল বাবা হতে পারতেন না।’
‘জানি।’
‘হাজার রাত হাসপাতালে বসে থাকলেও বাবা হতে পারতেন না।’
‘জানি।’
‘হাসপাতালের ফি দিলেও না, ওষুধপত্তর কিনলেও না, ওকে নিজ হাতে কবর দিলেও না। আপনি ওর আসল বাবা নন।’
এমদাদের কথাগুলো শুনে শামীম চোখ বন্ধ করল। কাল রাতের কথা মনে পড়ল তার। শায়ন্তী হাড্ডিসার হয়ে গিয়েছিল। কিছুই খেতে পারছিল না, একটা নল দিয়ে তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, সে হা-আ-হ হা-আ-হ করে শ্বাস নিচ্ছিল। মৃত্যুর সময় কেউ এত কঙ্কালসার হয়ে যায়, তা শামীম জানত না। বালিশটা ঠিক করে দেওয়ার জন্য সে মেয়ের মাথাটা একটু বুকের কাছে ঠেকিয়েছিল। শায়ন্তী তখন চোখ খুলে তাকিয়েছিল।
‘পা-পা?’
‘বলো, মা?’
‘আর ইউ উইথ মি?’
‘ইয়েস, পাপা, আমি আছি।’
‘আ-চ্ছা।’
ফোনের ওপাশে এমদাদ তখনো কথা বলে চলেছে, কিন্তু কোনো কথাই শামীমের কানে ঢুকছে না। সে ফোন রেখে দিল। জানালার দিকে তাকিয়ে দেখল পাশের বাড়ির রান্নাঘরের আলো আর জ্বলছে না। সে জায়নামাজের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে বলল, ‘আই অ্যাম উইথ ইউ, পাপা।’

Source - www.prothomalo.com ↗