Bangladesh · 2026-11-07 10:48:05

স্বপ্নের আমেরিকা: দূর থেকে যতটা মোহময়, বাস্তবে কি ততটাই সুখের

স্বপ্নের আমেরিকা: দূর থেকে যতটা মোহময়, বাস্তবে কি ততটাই সুখের
পৃথিবীর অনেক মানুষের কাছেই আমেরিকা একটি স্বপ্নের নাম। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা কিংবা ইংল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোর কথা বাদ দিলেও আমেরিকার প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেন একটু অন্য রকম। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা জীবনের সর্বস্ব ব্যয় করেও একবার আমেরিকায় যেতে চান। তাঁদের কাছে আমেরিকা মানেই উন্নত জীবন, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, নিরাপত্তা এবং নিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি।
বিশেষ করে তুলনামূলক দরিদ্র ও অনুন্নত দেশগুলোর মানুষ উন্নত জীবনযাপনের আশায় নিজের দেশ, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও চেনা পরিবেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। তাঁদের পছন্দের তালিকায় আমেরিকার অবস্থান থাকে অনেক ক্ষেত্রেই সবার ওপরে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে আমেরিকাকে ঘিরে এত স্বপ্ন, সেই আমেরিকায় পৌঁছাতে পারলেই কি সত্যিই জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়?
বাস্তবতা কিন্তু সব সময় স্বপ্নের মতো সুন্দর নয়।
অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে আমেরিকায় যাওয়া এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের পথ অনেকের জন্যই বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের প্রভাব থেকে উন্নত দেশগুলোও মুক্ত নয়। তাই আমেরিকায় পৌঁছাতে পারলেই জীবন রাতারাতি বদলে যাবে, কিংবা হাতে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ চলে আসবে—এমনটা ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
আমেরিকায় বহু বছর ধরে বসবাস করছেন, এমন অনেক অভিবাসীর জীবনও এখন নানা সংকটে জর্জরিত। নতুন করে যাঁরা সেখানে যাচ্ছেন, তাঁদেরও পড়তে হচ্ছে নানা বাস্তবতার মুখোমুখি। অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক নানা সীমাবদ্ধতা অনেকের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। এমনও অনেকে আছেন, যাঁরা চাইলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের সেখানে নিয়ে যেতে পারছেন না। আবার দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে না পেরে কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত নিজ দেশেই ফিরে আসছেন।
এবার আসা যাক পারিবারিক জীবনের বাস্তবতায়।
যুগের সঙ্গে তাল মেলানো, নাকি অন্ধকারের পথে এগিয়ে যাওয়া?আমাদের অনেকের ধারণা, আমেরিকায় গেলে পরিবারের সবাই মিলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটানো যায়। সেখানে বাতাসে যেন ডলার ওড়ে! কিন্তু বাস্তবে কি সব পরিবারই এমন সুখে আছে? বিশেষ করে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের জীবন কেমন কাটে?
অভিবাসী পরিবারগুলোর একটি বড় বাস্তবতা হলো, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে পরিবারের প্রায় সব কর্মক্ষম সদস্যকেই কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়। ফলে দিনের বড় একটি সময় তাঁদের ঘরের বাইরে কাটাতে হয়। এ পরিস্থিতিতে পরিবারের বৃদ্ধ মা-বাবা কিংবা অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের দেখাশোনা করার মতো কাউকে সব সময় পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যার কথা বিবেচনা করে নার্সিং হোম বা দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখতে হয়। এটি সব সময় অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার কারণে ঘটে না; অনেক সময় পরিস্থিতিই পরিবারকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
তবে এর পাশাপাশি বয়োজ্যেষ্ঠদের নিঃসঙ্গতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং যথাযথ পরিচর্যার অভাবে ঘটে যাওয়া কিছু হৃদয়বিদারক ঘটনাও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। কোথাও কোথাও বৃদ্ধ মা-বাবা দিনের পর দিন একাকী পড়ে থাকেন, এমনকি মৃত্যুর পরও দীর্ঘ সময় তাঁদের খোঁজ নেওয়ার কেউ থাকে না—এমন খবরও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে।
ভাবতে অবাক লাগে! যে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য একসময় মা-বাবা নিজেদের জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মা-বাবারই কখনো কখনো ঠাঁই হয় একাকিত্বের মধ্যে। উন্নত জীবনযাপনের প্রতিযোগিতায় আমরা কি কোথাও মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতা হারিয়ে ফেলছি?
অবশ্যই আমেরিকায় সবাই খারাপ আছেন, এমনটা বলার সুযোগ নেই। অনেক অভিবাসী পরিবার অত্যন্ত সুন্দর, নিরাপদ ও সচ্ছল জীবনযাপন করছেন। তাঁদের সন্তানেরা ভালো শিক্ষা পাচ্ছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে। কিন্তু এটাও সত্য যে সবার ভাগ্যে একই রকম সাফল্য জোটে না। দূর থেকে যে জীবনকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হয়, কাছ থেকে দেখলে তার অনেক অপ্রকাশিত সংগ্রামও চোখে পড়ে।
এবার আসা যাক আমেরিকার আরেকটি বাস্তবতায়—গৃহহীন মানুষের জীবন।
আমেরিকায় জন্ম নেওয়া নাগরিক থেকে শুরু করে অভিবাসী—কেউই অর্থনৈতিক সংকট, কর্মহীনতা কিংবা পারিবারিক বিপর্যয়ের ঊর্ধ্বে নন। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ গৃহহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাঁদের অনেকেরই রাত কাটে ফুটপাত, পার্ক, সেতুর নিচে কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। কেউ কর্মহীনতা, কেউ মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা, কেউ পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, আবার কেউ মাদকাসক্তির কারণে স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়েছেন।
গৃহহীন মানুষের একটি অংশ মাদকাসক্তির ভয়াবহ চক্রে আটকে পড়েছেন। তাঁদের অনেকের জীবনচিত্র এতটাই করুণ যে তা দেখলে মনে হয়—শুধু অর্থ, সম্পদ কিংবা উন্নত অবকাঠামো থাকলেই মানুষের জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে না। প্রয়োজন মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিক মর্যাদা।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, আমরা যাঁরা দূর থেকে আমেরিকাকে স্বপ্নের দেশ হিসেবে দেখি, তাঁরা কি কখনো সেখানকার এই বাস্তবতাগুলো নিয়ে ভাবি? উন্নত রাষ্ট্র মানেই কি প্রত্যেক নাগরিকের সুখ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা? নিশ্চয়ই নয়। প্রতিটি দেশেরই কিছু অর্জন আছে, আবার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
আমার বক্তব্য কখনোই এই নয় যে বিদেশে যাওয়া উচিত নয় কিংবা আমেরিকায় ভালো থাকার কোনো সুযোগ নেই। বরং বলতে চাই, বিদেশে যাওয়ার আগে বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। শুধু অন্যের সাফল্যের গল্প শুনে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো-গোছানো জীবন দেখে নিজের জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ও সামর্থ্য নিয়ে অনিশ্চিত পথে পা বাড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.comবিশ্বমানের মেট্রোরেল, কিন্তু আমাদের নাগরিক আচরণ কি বিশ্বমানের?আমাদের মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর কোনো দেশই স্বর্গ নয়। প্রতিটি দেশেই জীবনের সংগ্রাম আছে, সুখ-দুঃখ আছে, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আছে। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, কিন্তু সেটিই জীবনের একমাত্র সাফল্য নয়।
আমরা যদি নিজের দেশেই সম্মানজনক কর্মসংস্থান, নিরাপদ জীবন, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের সঙ্গে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারি, তাহলে শুধু উন্নত জীবনের মোহে দেশ ছাড়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে আসবে।
পরিশেষে বলতে চাই, আমেরিকা স্বপ্নের দেশ হতে পারে, কিন্তু সুখের নিশ্চয়তা নয়। বিদেশের মাটিতে ডলার উপার্জনের চেয়ে নিজের মাটিতে প্রিয়জনদের নিয়ে শান্তিতে বেঁচে থাকার আনন্দ কোনো অংশেই কম নয়।
তাই অন্যের জীবনের চাকচিক্য দেখে নিজের জীবনকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের যে অবস্থানে রেখেছেন, সেখানে সম্মান, সততা ও প্রশান্তির সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারাটাও অনেক বড় প্রাপ্তি।
হায়রে স্বপ্নের আমেরিকা! আর হায়রে মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখের হিসাব!
* লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি ও লেখক

Source - nagorik.prothomalo.com ↗