মাছ চাষের পাশাপাশি ঘেরের পাড়ে কলা চাষ করে বাড়তি আয়ের মুখ দেখছেন নড়াইলের কৃষকরা। একসময় এই জেলার বিভিন্ন এলাকার ঘেরের পাড়ের জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকত। পড়ে থাকা ঘেরের পাড়ে কলাগাছ লাগিয়ে একই জমি থেকে মাছ ও কলা উৎপাদন করছেন তারা। মাছ চাষের পাশাপাশি বাড়তি আয় যোগাচ্ছে কলা চাষে। ঘেরের পাড়ে পতিত জমি ফেলে না রেখে সেখানে কলাগাছ লাগিয়ে একদিকে যেমন জমির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে, অন্যদিকে মাছ চাষের পাশাপাশি মিলছে বাড়তি আয়ের সুযোগ। কম খরচে তুলনামূলক ভালো লাভ হওয়ায় দিন দিন ঘেরের পাড়ে কলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, নড়াইল জেলার তিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাছের ঘেরের পাড়ে সারি সারি কলাগাছ লাগানো রয়েছে। এসব গাছে ঝুলছে কলার কাদি। ঘেরের পাড়ে কলা চাষ করায় আলাদা করে জমি ব্যবহারের প্রয়োজন হচ্ছে না। ঘেরের পাড় সাধারণত অনেক সময় অব্যবহৃত পড়ে থাকে। ফলে একই জমিতে মাছ চাষের পাশাপাশি কলা উৎপাদন করে বাড়তি আয় করছেন তারা। শুধু ঘেরের পাড়েই নয় জেলার বিভিন্ন সড়কের পাশের জমি, বাড়ির আশপাশে ফাঁকা জায়গায় কলার চারা রোপণ করছেন এলাকার মানুষ। এদিকে, ঘেরের পাড়ে উৎপাদিত কলার বড় একটি বাজার রয়েছে ঢাকায়।
ঘেরের পাড়ে কলার বাগান, লাভবান হচ্ছে নড়াইলের কৃষকরা

লোহাগড়া উপজেলার নলদী ইউনিয়নের ঘের মালিক মো. কামরুল মোল্যা বলেন, ‘তার সাড়ে ৯ একর মাছের ঘেরের পাড়ে কলা চাষ করেছেন। প্রথমে ৬০০টি কলার চারা দিয়ে চাষ শুরু করলেও বর্তমানে তার ঘেরের পাড়ে কলাগাছের সংখ্যা এক হাজারের বেশি। প্রতি ২০ থেকে ২৫ দিন পরপর তার ঘের থেকে কলা কেটে নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। প্রতিবার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কাদি কলা বিক্রি হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘একসময় ঘেরের পাড় এমনিতেই পড়ে থাকত। এখন সেই জায়গায় কলা চাষ করছি। প্রায় তিন বছর ধরে এভাবে চাষাবাদ করছি। কলা চাষে খরচ তুলনামূলক কম এবং এটি লাভজনক। অনেকের ঘেরের পাড়ে কলাগাছ রয়েছে, আবার অনেকে এখনো এ উদ্যোগ নেননি। পরিকল্পিতভাবে চাষ করলে ঘেরের পাড় থেকেও ভালো আয় করা সম্ভব।,
একই ইউনিয়নের মিঠাপুর এলাকার ঘের মালিক শাহিন শেখ বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে আমি আমার আড়াই একর মাছের ঘেরের পাড়ে কলার চাষ শুরু করি। প্রথমে অন্য একটি ঘেরের পাড়ে কলার চাষ দেখে অনুপ্রাণিত হই। সেখান থেকে কলার চারা সংগ্রহ করে নিজের ঘেরের পাড়ে রোপণ করি। মাত্র ৫০০টি কলার চারা দিয়ে চাষ শুরু করলেও বর্তমানে আমার ঘেরের পাড়ে প্রায় দুই হাজার কলাগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকেই নিয়মিত কলা সংগ্রহ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ঘেরের পাড়ে সাগর কলা, দেশি রুম্বি ও কাঁচকলা এই তিন জাতের কলার চাষ করছি। বরিশাল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে ঘের থেকেই কলার কাঁদি কেটে নিয়ে যান। প্রতি কাঁদি কলা ২০০ টাকা দরে বিক্রি করি। মাছ চাষের পাশাপাশি ঘেরের পাড়ে কলার চাষ করায় একই জমি থেকে বাড়তি আয় করতে পারছি। এতে আমার বেশ লাভ হচ্ছে। মাছ চাষের পাশাপাশি কলা চাষ আমার জন্য বাড়তি আয়ের একটি ভালো উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।,
পিরোজপুর জেলার কলা ব্যবসায়ী আব্দুর রহুফ বলেন, ‘১৯৮১ সাল থেকে তিনি কলার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন বাগান ও ঘেরের পাড় থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ২০০ কাদি কলা কেনেন তিনি। কলার আকার, কাদির পরিমাণ ও মান অনুযায়ী প্রতিটি কাদি ১শত ৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে কেনা হয়।,
তিনি আরও বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে কলা কিনে ভ্যানে করে লোহাগড়ায় নিয়ে আসেন। পরে সেখান থেকে পিকআপে করে কলাগুলো ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার আড়তে কমিশনের ভিত্তিতে এসব কলা বিক্রি করা হয়। বিক্রির পর আড়তদারের কমিশন, পরিবহন, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে লাভের হিসাব করা হয়। বর্তমানে সবরি কলার চাহিদা বেশি। ঘেরের পাড়ে উৎপাদিত কলা তুলনামূলক ভালো স্বাদ ও রঙের হওয়ায় ঢাকার বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় বাজারের তুলনায় ঢাকায় কলা বিক্রির সুযোগ বেশি। তবে কলার সরবরাহের ওপর বাজারদর অনেকটা নির্ভর করে। সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে যায়, আর সরবরাহ কম থাকলে দাম বেড়ে যায়।,
বিশেষ করে যেসব কৃষকের মাছের ঘের রয়েছে, তারা পরিকল্পিতভাবে ঘেরের পাড়ে কলাসহ বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
Source - www.bd24live.com ↗