Bangladesh · 2026-11-07 14:38:52

কোয়ান্টাম জগৎ: কোয়ান্টাম কণারা কেন এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না

কোয়ান্টাম জগৎ: কোয়ান্টাম কণারা কেন এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না
আগের পর্বপরমাণু কেন ধসে পড়ে না—তা চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছিল বোরের পরমাণু মডেল। একই সঙ্গে মডেলটি ব্যাখ্যা করেছিল, হাইড্রোজেন পরমাণু কেন স্রেফ নির্দিষ্ট রঙের আলো শোষণ বা নিঃসরণ করে। তবে সেখানে ছোট্ট একটি সমস্যাও ছিল। মডেলটি কেবল হাইড্রোজেন পরমাণুর জন্যই খাটত! পর্যায় সারণির বাকি মৌলগুলোর বিশাল তালিকার ক্ষেত্রে মডেলটি ছিল পুরোপুরি ব্যর্থ। এসব মৌলের পরমাণু কোন রঙের আলো শোষণ করবে বা নিঃসরণ করবে, তা এই মডেল দিয়ে মোটেই বোঝা যেত না।
তাই বিশ শতকের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করলেন, একেবারে ক্ষুদ্র স্তরের বস্তুগুলো যেন চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মানতেই চাইছে না। কিন্তু সেই সময়ও ছবিটা পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না। আমরা আজ যে অর্থে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান চিনি, তা গড়ে উঠতে আরও কিছুটা সময় লেগেছিল। এর জন্ম মোটামুটি ১০০ বছর আগে। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের এই জন্মের পেছনে ছিল একটি ছোট্ট কণা। বলো তো, কণাটির নাম কী?
আসলে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের জন্মের পেছনে ছিল মানুষের একটি চুলের প্রস্থের কাছাকাছি আকারের, কাঁটাযুক্ত একটি কণা। সেটি হলো অতি সাধারণ ফুলের পরাগরেণু!
কোয়ান্টাম জগৎ: যেখানে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের চাবিকাঠিবিশ শতকের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করলেন, একেবারে ক্ষুদ্র স্তরের বস্তুগুলো যেন চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মানতেই চাইছে না। কিন্তু সেই সময়ও ছবিটা পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না।দৃশ্যটা একবার কল্পনা করার চেষ্টা করো। সময়টা ১৯২৫ সালের গ্রীষ্মকাল। জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গের বয়স মাত্র ২৩ বছর। কিন্তু বিরক্তিকর এই পরাগরেণুর কারণে তাঁর অ্যালার্জি বা হে ফিভার দেখা দিল। চোখমুখ ফুলে ঢোল। সঙ্গে অস্বস্তিকর হাঁচি-কাশি। মুখ ও চোখ এতই ফুলে গিয়েছিল যে তাঁর বাড়িওয়ালি পর্যন্ত মনে করেছিলেন তিনি কারোর সাথে হাতাহাতি বা মারামারি করে এসেছেন! শারীরিক কষ্ট থেকে একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্য হাইজেনবার্গ তখন মরিয়া। তিনি সবকিছুই চেষ্টা করে দেখেছেন—অ্যাসপিরিন থেকে শুরু করে কোকেন পর্যন্ত কোনো কিছুই বাদ দেননি! শুনতে অবাক লাগলেও, সে সময় কোকেনকে হে ফিভারের বা অ্যালার্জির এক ধরনের চিকিৎসা হিসেবে সুপারিশ করা হতো!
পরাগরেণুর যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত জার্মানির উপকূলের কাছে হেলিগোল্যান্ড নামে একটি গাছপালাহীন দ্বীপে চলে গেলেন হাইজেনবার্গ। সেখানে গিয়ে প্রায় একা একা থাকতে শুরু করলেন। সেই নির্জন দ্বীপেই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী ধারণার জন্ম দিলেন তিনি।
হাইজেনবার্গ প্রস্তাব করলেন, ইলেকট্রনকে এমন কণা হিসেবে ভাবা যাবে না, যা চিরায়ত কণার মতো নিরবচ্ছিন্ন পথে নিউক্লিয়াসকে প্রদক্ষিণ করে। ইলেকট্রনের এমন কোনো নির্দিষ্ট, একটানা গতিপথের কথা বলার দরকার নেই। বরং একটি পরমাণু সম্পর্কে আমরা যেসব বিষয় সত্যিই পর্যবেক্ষণ করতে পারি, সেগুলোর ওপরই আমাদের নির্ভর করতে হবে। যেমন—ইলেকট্রনের শক্তি এবং এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শক্তিস্তরে কোয়ান্টাম লাফ দেওয়ার সম্ভাবনা। ইলেকট্রনের মতো কোয়ান্টাম কণারা সব সময় নিরবচ্ছিন্ন ও সুনির্দিষ্ট পথে চলে—এই পুরোনো ধারণাটিই ছুড়ে ফেলে দিলেন হাইজেনবার্গ। এর মাধ্যমেই তিনি চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান থেকে প্রথম স্পষ্ট বিচ্ছেদ ঘটালেন।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অদ্ভুত জগৎপরাগরেণুর যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত জার্মানির উপকূলের কাছে হেলিগোল্যান্ড নামে একটি গাছপালাহীন দ্বীপে চলে গেলেন হাইজেনবার্গ। সেখানে গিয়ে প্রায় একা একা থাকতে শুরু করলেন।১৯২৫ সালের এক গ্রীষ্মের রাত। নিজের ঘরের চেয়ার-টেবিলে বসে হাইজেনবার্গ তখন পাতার পাতা অঙ্ক কষে যাচ্ছেন। একসময় সমাধান মিলল। তখন ভোররাত তিনটা। হাত থেকে কলম নামিয়ে রাখলেন হাইজেনবার্গ। তারপর সামনে পড়ে থাকা নিজের গাণিতিক হিসাব-নিকেশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আবিষ্কার করে ফেলেছেন নতুন কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রূপ! সে তত্ত্ব বিজ্ঞানীদের এমন এক গাণিতিক কাঠামো দেবে, যা দিয়ে শুধু হাইড্রোজেন পরমাণুই নয়, অন্য সব পরমাণু, উপ-পরমাণবিক কণা এবং অণুর আচরণও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
স্বাভাবিকভাবেই হাইজেনবার্গ এতই উত্তেজিত ছিলেন যে আর সে রাতে ঘুমাতে পারেননি। তাই রাতের প্রায় অন্ধকারে দ্বীপের একটি পাথরের চূড়ায় উঠে গেলেন। সেখানে একা একা বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন—কখন ভোরের সূর্য উঠবে, আর সেই সঙ্গে সূচনা হবে নতুন এক বৈজ্ঞানিক যুগের। এর সঙ্গেই সূচনা হবে নতুন কোয়ান্টাম যুগের ভোর।
হাইজেনবার্গের নতুন কোয়ান্টাম তত্ত্বে আমাদের সেই কোয়ান্টাম স্কেটবোর্ডারকে আর স্কেটবোর্ডের বাটিতে বিভিন্ন উচ্চতায় চক্কর দিতে দেখা যাবে না। আসলে সে কীভাবে বাটির চারপাশে ঘুরছে, সে সম্পর্কেই আমরা কিছু বলতে পারি না। আমরা শুধু পর্যবেক্ষণ করতে পারি, বিভিন্ন শক্তিস্তরের মধ্যে কোয়ান্টাম লাফ দেওয়ার সময় সে তার বন্ধুর সঙ্গে বল ছোড়াছুড়ি করছে কী পরিমাণ শক্তি নিয়ে এবং সেই লাফ দেওয়ার সম্ভাবনা কতটা।
কোয়ান্টাম জগৎ কি আসলেই অদৃশ্যএকসময় সমাধান মিলল। তখন ভোররাত তিনটা। হাত থেকে কলম নামিয়ে রাখলেন হাইজেনবার্গ। তারপর সামনে পড়ে থাকা নিজের গাণিতিক হিসাব-নিকেশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।এভাবে ভাবলে হয়তো মনে খুব পরিষ্কার কোনো ছবি তৈরি হয় না। কিন্তু হাইজেনবার্গের মতো আমরাও শুধু সেই বিষয়গুলোর ওপর মন দিতে পারি, যেগুলো সত্যিই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। তারপর সেগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করতে পারি।
নতুন কোয়ান্টাম তত্ত্বের একটি বড় সাফল্য ছিল—সেটা কিছু গাণিতিক হাতিয়ারের যোগান দিয়েছিল। তার সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের পরমাণু কোন কোন নির্দিষ্ট রঙের আলো শোষণ ও নির্গত করবে, তা নির্ভুলভাবে অনুমান করা সম্ভব হয়েছিল। তবে এই গাণিতিক হাতিয়ারগুলো ছিল বিমূর্ত ম্যাট্রিক্স বা সংখ্যার জটিল সারণির আকারে। এগুলো কোয়ান্টাম জগতের কোনো সহজ, চোখে দেখা যায় এমন ছবি ফুটিয়ে তুলতে পারছিল না।
মাত্র এক বছর পর, হাইজেনবার্গের এই তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানালেন অস্ট্রিয়ান-আইরিশ পদার্থবিদ আরউইন শ্রোডিঙ্গার। তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি বিকল্প রূপ হাজির করলেন। মজার ব্যাপার হলো, শ্রোডিঙ্গারের তত্ত্ব এবং হাইজেনবার্গের তত্ত্ব গাণিতিকভাবে সমতুল্য ছিল। অর্থাৎ দুটির ভিত্তি একই মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়ানো এবং দুটি একই ফলাফল বা পূর্বাভাস দেয়। কিন্তু শ্রোডিঙ্গারের পদ্ধতিটি ছিল অনেক বেশি সুন্দর ও সহজবোধ্য। শ্রোডিঙ্গারের মতে, কোয়ান্টাম কণারা কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে থাকতে চায় না। বরং এদের ভাবতে হবে স্থানজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটি সম্ভাবনার মেঘ হিসেবে। কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে থাকা ছোট্ট কণার বদলে তারা যেন ঝাপসা একটি পিণ্ড—কোথাও স্পষ্টভাবে সীমাবদ্ধ নয়।
কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি কেন প্রয়োজনমাত্র এক বছর পর, হাইজেনবার্গের এই তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানালেন অস্ট্রিয়ান-আইরিশ পদার্থবিদ আরউইন শ্রোডিঙ্গার। তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি বিকল্প রূপ হাজির করলেন।এই ঝাপসা কোয়ান্টাম কণাকে বোঝানোর জন্য শ্রোডিঙ্গার ব্যবহার করলেন তাঁর বিখ্যাত তরঙ্গ ফাংশন বা ওয়েভ ফাংশন। সেটা ছিল কোয়ান্টাম কণার সম্ভাবনার বণ্টনের একটি চমৎকার গাণিতিক বিবরণ। একটি কোয়ান্টাম কণার তরঙ্গ ফাংশন বলে দেয় যে বিভিন্ন স্থানে খোঁজার সময় সেই নির্দিষ্ট কণাটি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা।
ছবি ১৪: শ্রোডিঙ্গারের বিখ্যাত তরঙ্গ সমীকরণ। ১৯২৫ সালে আবিষ্কৃত এই সমীকরণটি পুরো কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল। সমীকরণের ত্রিশূলের মতো দেখতে ψ চিহ্নটিকে বলা হয় সাই। একে বলা হয় ওয়েভফাংশন। এটি আসলে কোনো দৃশ্যমান তরঙ্গ নয়; এটি নির্দেশ করে কোনো মুহূর্তে একটি অতিপারমাণবিক কণা (যেমন ইলেকট্রন) মহাশূন্যের কোথায় থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি!ধরো, তুমি কোনো একটি নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম কণা খুঁজছ। বিভিন্ন জায়গায় খুঁজলে কোন জায়গায় তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, আর কোথায় কম—কণাটির তরঙ্গ ফাংশন সেটিই জানায়। একটি কণার তরঙ্গ ফাংশনে কিছু জায়গায় উঁচু চূড়া থাকে। সেসব অঞ্চলে কণাটি পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আবার এই চূড়াগুলোর চারপাশে লেজের মতো অংশ থাকে। সেখানে কণাটি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, কিন্তু একেবারে শূন্য নয়।
এই তরঙ্গ ফাংশনের কারণেই ইলেকট্রন নিজের সঙ্গেও ব্যতিচার ঘটাতে পারে। একটু আগেই আমরা ডাবল-স্লিট পরীক্ষায় এর উদাহরণ দেখেছি। সেখানে ইলেকট্রনের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে, দুটি ভাগে ভাগ হয় এবং একই সময়ে দুটি ছিদ্র দিয়েই যেতে পারে। তারপর দুটি অংশ আবার নিজেদের মধ্যে ব্যতিচার ঘটায়।
কোয়ান্টাম মেকানিকস কেন বলে অতীত সত্যি নয়একটি কণার তরঙ্গ ফাংশনে কিছু জায়গায় উঁচু চূড়া থাকে। সেসব অঞ্চলে কণাটি পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আবার এই চূড়াগুলোর চারপাশে লেজের মতো অংশ থাকে।শ্রোডিঙ্গার আমাদের উপহার দিয়েছেন তাঁর বিখ্যাত তরঙ্গ সমীকরণও। এই সমীকরণ বলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোয়ান্টাম কণার তরঙ্গ ফাংশন কীভাবে বদলায়। তরঙ্গ সমীকরণকে চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের গতির সমীকরণের সঙ্গে তুলনা করা যায়। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানে কোনো কণার শুরুর অবস্থান এবং তার ওপর ক্রিয়া করা সব বল যদি আমরা জানি, তাহলে গতির সমীকরণ ব্যবহার করে নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারি, শেষ পর্যন্ত কণাটি কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে। তেমনি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে আমরা শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ ব্যবহার করে অন্য একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে জানতে পারি।
কোনো কণার শুরুর তরঙ্গ ফাংশন এবং তার ওপর কাজ করা সব বাহ্যিক প্রভাব জানা থাকলে, সময়ের সঙ্গে সেই তরঙ্গ ফাংশন কীভাবে বদলাবে, তা নির্ভুলভাবে হিসাব করা যায়। তবে এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান মূলত নিশ্চিত বা নির্ধারিত, কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান মূলত সম্ভাবনাভিত্তিক। কারণ কোয়ান্টাম জগতে আমরা কোনো কণা ঠিক কোথায় থাকবে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কেবল বলতে পারি, তার সম্ভাবনার মেঘ বা তরঙ্গ ফাংশন সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলাবে।
ছবি ১৫: কোয়ান্টাম জগতে কণার অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং, কণাটিকে কোথায় পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা, তা ছড়িয়ে থাকে একটি বিস্তৃত অঞ্চলে। গ্রাফের চূড়াটি দেখায়, কোন অঞ্চলে কণাটিকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি—তবে তার উপস্থিতির সম্ভাবনা অন্য অঞ্চলগুলোতেও থাকেকোয়ান্টাম কণার এই ঝাপসা ও সম্ভাবনাভিত্তিক স্বভাবের পেছনে রয়েছে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি বা আনসার্টেনিটি প্রিন্সিপল। প্রায় এক শতাব্দী আগে হাঁচির চোটে ভুগতে ভুগতে যে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের জন্মের পথ খুলে দিয়েছিলেন, এই নীতির নামও এসেছে সেই হাইজেনবার্গের নাম থেকেই।
কোয়ান্টাম কণাদের পথ পাড়ি দিতে কি সময় লাগে নাকোয়ান্টাম জগতে আমরা কোনো কণা ঠিক কোথায় থাকবে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কেবল বলতে পারি, তার সম্ভাবনার মেঘ বা তরঙ্গ ফাংশন সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলাবে।১৯২৭ সালে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি প্রস্তাব করেন। এই নীতি বলে, কোনো কোয়ান্টাম কণার অবস্থান যত নিখুঁতভাবে জানা যাবে, তার ভরবেগ জানা যাবে তত কম নির্ভুলভাবে। আবার উল্টোটাও সত্যি। মানে, কোনো কোয়ান্টাম কণার ভরবেগ যত নিখুঁতভাবে জানা যাবে, তার অবস্থান তত অনিশ্চিত হয়ে যাবে। ভরবেগ থেকে আমরা কণাটি কত দ্রুত এবং কোন দিকে চলছে, সে সম্পর্কে জানতে পারি। এর মানে হলো, একই সময়ে কোনো কোয়ান্টাম কণার অবস্থান ও ভরবেগ—দুটিই ইচ্ছেমতো নির্ভুলভাবে জানার একটা সীমা আছে।
এখন একটা কথা বলে রাখি। এই বইজুড়ে গাদা গাদা গাণিতিক সমীকরণ থাকবে না। কারণ হাতে গোনা কিছু মানুষই সমীকরণ দেখে আনন্দ পান! তবে এখানে খুব ছোট্ট একটি সমীকরণ দেখাতে চাই। এর সাহায্যে বোঝা যাবে, কত সুন্দর ও সহজভাবে হাইজেনবার্গের নীতি এই নিশ্চয়তার সীমাকে ধরে ফেলতে পারে।
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতিকে এভাবে প্রকাশ করা যায়: Δx .Δp ≥ℏ/2। এখানে Δx হলো x-দিক বরাবর অবস্থানের অনিশ্চয়তা। আর Δp হলো x-দিক বরাবর ভরবেগের অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা দুটির গুণফল অবশ্যই ℏ/2-এর চেয়ে বড় বা সমান হতে হবে। এই ধ্রুবক ℏ হলো সংশোধিত প্লাঙ্ক ধ্রুবক৯। এটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার একটি মৌলিক ধ্রুবক। কোয়ান্টাম জগৎ বর্ণনা করা নানা সমীকরণে এই ধ্রুবকটি বারবার দেখা যায়—মনে হয় যেন সেটি সব জায়গাতেই লুকিয়ে আছে!
কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় সবকিছুই কি অনিশ্চিতহাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতিকে এভাবে প্রকাশ করা যায়: Δx .Δp ≥ℏ/2। এখানে Δx হলো x-দিক বরাবর অবস্থানের অনিশ্চয়তা। আর Δp হলো x-দিক বরাবর ভরবেগের অনিশ্চয়তা।তবে এই অনিশ্চয়তা আমাদের মাপজোখের সীমাবদ্ধতার কারণে তৈরি হয় না। আমাদের যন্ত্র যতই নিখুঁতই হোক না কেন, সমস্যাটা আসলে সেখানেই নয়। এটি কোয়ান্টাম জগতের একেবারে মৌলিক নিয়ম। কোয়ান্টাম কণাদের এই সীমা মেনেই চলতে হয়।
ধরা যাক, আমাদের লক্ষ্য হলো কোনো কোয়ান্টাম কণার অবস্থান ও ভরবেগ যতটা সম্ভব নির্ভুলভাবে জানা। সে ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ যা করতে পারি, তা হলো হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির অসমতাকে ঠিক সমতায় নিয়ে আসা। একে খুব সহজ একটি দাঁড়িপাল্লার মতো কল্পনা করা যায়। দাঁড়িপাল্লার এক পাশে থাকবে Δx . Δp, অর্থাৎ অবস্থান ও ভরবেগের অনিশ্চয়তার গুণফল। অন্য পাশে থাকবে ħ/2।
এখন আমরা যদি কণাটির অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চয়তা কমিয়ে দিই, তাহলে ভরবেগ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বাড়াতেই হবে। আবার ভরবেগের অনিশ্চয়তা কমাতে চাইলে অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বাড়বে। দুই পাশের পাল্লার ভারসাম্য ঠিক রাখতে হলে এভাবেই একটিকে কমালে অন্যটিকে বাড়াতে হবে। কোয়ান্টাম জগতে নিশ্চিতভাবে জানার সীমাটা অনেকটা এমনই—একদিকে যত বেশি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে ততটাই অনিশ্চয়তা এসে হাজির হবে।
কোয়ান্টাম মেকানিকস কেউ বোঝে না, বিজ্ঞানীরাও নয়!এখন আমরা যদি কণাটির অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চয়তা কমিয়ে দিই, তাহলে ভরবেগ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বাড়াতেই হবে। আবার ভরবেগের অনিশ্চয়তা কমাতে চাইলে অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বাড়বে।এই নীতির শেষ কথা হলো: কোনো কোয়ান্টাম কণাকে আমরা যদি একটি মাত্র বিন্দুর মধ্যে আটকে রাখতে চাই, মানে তার অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চয়তা কমাতে চাই, তাহলে তার ভরবেগ সম্পর্কে জানা আরও অনির্ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাবে। কারণ তখন কণাটির গতিও অনিশ্চিতভাবে বদলে যেতে পারে। ফলে কোনো কোয়ান্টাম কণাকে একটিমাত্র জায়গায় আটকে রাখা অসম্ভব। তাকে যতই একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বন্দী করার চেষ্টা করি না কেন, তা আবার ছড়িয়ে পড়বে। ফিরে যাবে সেই ঝাপসা সম্ভাবনার মেঘে, যা ছড়িয়ে থাকে গোটা স্থানজুড়ে। কোনো কোয়ান্টাম কণাকে যদি সত্যিই আটকে রাখা হয়—যেমন একটি পরমাণুর ভেতরে আটকে থাকা ইলেকট্রন, কিংবা মানুষের তৈরি কোনো সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রের মধ্যে বন্দী ইলেকট্রন—তবুও তার তরঙ্গ ফাংশন সব সময়ই শূন্যের চেয়ে বড় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থানজুড়ে ছড়িয়ে থাকবে।
সূত্র: ড্যানি হোমসের ওয়ান্ডার অব কোয়ান্টাম ওয়ার্ল্ডস অবলম্বনে
কোয়ান্টাম টানেলিং কীভাবে হয়?

Source - www.bigganchinta.com ↗