Bangladesh · 2026-11-07 16:23:33

কৈশোরে আমি এবং সে

কৈশোরে আমি এবং সে
এসএসসি পরীক্ষার পর অপূর্ব নিজ বাড়িতে অলস সময় পার করছিল। সংসারের একমাত্র ছেলে। মা–বাবার অনেক আদরের। ছোট দুই বোন আছে, বয়সের ব্যবধান ১০–১২ বছর। বাবা হাইস্কুলশিক্ষক, অল্প বেতনের চাকরি, মা পরিবারের প্রধান; কারণ, সীমিত আয়ের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার মা-ই করতে পারেন। বাবা রশিদ সাহেব ছোট চাকরি করলেও সংসারে ততটা অভাব অভিযোগ নেই। রশিদ সাহেবের বাপ–দাদা প্রায় জমিদারের কাছাকাছি ছিলেন, জমিজমা ভালোই ছিল। বিভিন্ন উপলক্ষে জমি বিক্রির প্রয়োজন পড়ে, তারপরও যা আছে, তা দিয়ে সংসার ভালোই চলে যাচ্ছে।
রশিদ সাহেব চাকরি থেকে ঘরে ফিরে আসেন, কিন্তু অতটা বিশ্রামের প্রয়োজন বোধ করেন না। সামান্য নাশতা–পানি খেয়ে গেঞ্জি গায়ে বেরিয়ে পড়েন সবজিখেত পরিচর্যা করতে। কী নেই তাদের বাড়ির উর্বর জমিতে, কাঁচা মরিচ, শিম, টমেটো কোনো কিছুই কিনতে হয় না। বাড়িটিও অনেক বড়, বিশাল আকারের দুটি বড় পুকুর, মাছের পরিপূর্ণ জোগান আসে বাড়ির পুকুর থেকেই। মোটাদাগে শাকসবজি, তরিতরকারি পুরোটাই আবাদ হয়, ফলফলাদিরও কোনো অভাব হয় না। এত সব কাজ করে ও রশিদ সাহেব ক্লান্ত হন না, শরীর মাশা আল্লাহ ভালোই থাকে।
অপূর্ব দু–তিন মাস পর যখনই ঢাকা থেকে বাড়ি আসে, অবাক হয় বাবার অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে। বাবার মতো সে একদমই হয়নি, সে কিছুটা অলস প্রকৃতির, তবে মায়ের অনেক গুণ তার মধ্যে আছে। সে অতিশয় ভদ্র, ধৈর্যশীল।
একদিন সবজিখেতের আইলে বসে অপূর্ব দেখছিল কীভাবে তার বাবা এবং পাশের বাড়ির দেবাশীষ দাদা আগাছা পরিষ্কার করছিলেন। বলে রাখা ভালো, এই দেবাশীষ দাদা হচ্ছেন রশিদ সাহেবের ডান হাত। সব প্রয়োজনে দেবাশীষ দাদার ডাক পড়ে। মনেপ্রাণে একজন মাটির মানুষ দেবাশীষ দাদা, ভিন্ন ধর্মের হলেও এই পরিবারের সাথে তাঁর আত্মার সম্পর্ক। ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই দেবাশীষ দাদার। মূলত রশিদ সাহেবদের খেতখামার বর্গা করে দেবাশীষ দাদার আয়রোজগার যা হয়, তাতেই উনার সংসার চলে। তামাটে রঙের পোড়ানো শরীর দেখলেই বাংলাদেশের আপামর কৃষকের কথা মনে পড়ে যায়। শক্ত শরীর, অত্যন্ত পরিশ্রমী এই মানুষেরাই দেশের উৎপাদিত বেশির ভাগ খাবারের জোগানদাতা। দেবাশীষ দাদাকে জামাকাপড় পরা অবস্থায় খুব কমই দেখা যায়। একখানা লুঙ্গি সাথে খালি শরীর নিত্যদিনের চিত্র। সারা দিন রোদে পুড়ে বেলা শেষে বাড়ি ফেরা। রাতে কখনো কখনো টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পানিতে শরীর ভিজে যায়। দরিদ্র কৃষকের অসহায় বাস্তবতা।
দেবাশীষ দাদা কাজের পাশাপাশি অপূর্বর সাথে টুকটাক কথা বলছিলেন। হঠাৎ করে একটি মেয়ে দৌড়ে আসছিল, অপূর্ব যেখানে বসে ছিল, ঠিক তার পাশ দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। পিছে আরও একজন দৌড়ে আসছিল, এবার অপূর্ব বুঝতে পারল যে আগে দৌড়ে গেল, সে এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। পেছনে যাওয়া মেয়েটি ছিল অপূর্বর চাচাতো বোন। এবার অনুমান করা গেছে মেয়েটি কে ছিল? ছোটবেলায় দু–একবার হয়তো দেখেছে তাকে কিন্তু চেহারা অতটা মনে ছিল না। মেয়েটির নাম জানা ছিল, পরিচয় অতটা ছিল না। শাহনাজ এত বড় হয়ে গেছে, ভাবতেই অবাক লাগছে। শাহনাজ যেভাবে দৌড়ে গেল এবং সে উচ্চ স্বরে হাসছিল। তার এলোমেলো দৌড় আর হাসি অপূর্বর মনে এমন এক ধাক্কা দিল, যেন বারবার একই দৃশ্য চোখে ভাসতে লাগল। অদ্ভূত এক অনুভূতি, মনের মাঝেও কেমন একটা দাগ কেটে গেল। সন্ধ্যা নামল, সবাই ঘরে ফিরল; কিন্তু বিকেলের সেই দৃশ্য, শাহনাজকে দেখে যে ঝড় শুরু হয়েছে, অপূর্বর মনে তা থামছে না।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.comমনে হচ্ছে হঠাৎ সবকিছু অস্থির হয়ে গেছে, প্রাণের স্পন্দন বেড়ে গেছে। আশপাশের সবকিছুই ভালো লাগছে, অনেক ভেবেচিন্তে অপূর্ব বুঝতে পারল সে শাহনাজের প্রেমে পড়েছে। প্রথম প্রেম বোধ হয় এভাবেই জেগে ওঠে, আগেপিছে কোনো ভাবনাচিন্তা নেই। মেয়েটি এখনো কিছুই জানে না আর ছেলেটি মনে মনে বহুদূর যেতে থাকল। কল্পনায় বাধা দেওয়ার কেউ নেই, যত দূর ইচ্ছা মনের বাসনা পূরণ করা সম্ভব।
এক রাত এক দিন অপূর্ব শুধু শাহনাজকে নিয়েই ভাবতে লাগল। বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন, সামাজিক অবস্থান—কোনো কিছুই বাধা মনে হলো না, পৃথিবী যেন আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়ে গেছে, প্রকৃতি যেন নতুন রূপে সেজেছে, অপূর্বর কাছে জীবনটা বেশ রোমাঞ্চকর লাগছে। কোন কলেজে ভর্তি হবে, ঢাকায় কোথায় থেকে পড়বে—এসব একদমই মাথায় আসছে না এখন।
দুদিন পর চাচাতো বোনকে বাড়ির দক্ষিণ পাশে একা বসা অবস্থায় দেখে অপূর্ব এগিয়ে গেল, এ জায়গাটা বিকেলে বসার জন্য খুবই সুখকর। অপূর্ব গ্রামের বাড়িতে এখানটায় বিকেলটা কাটায়, দখিনা হাওয়া গায়ে পরশ বুলিয়ে যায়। শাহনাজদের বাড়ি এখান থেকে বরাবর তিন মিনিট হাঁটার রাস্তা। শাহনাজ ঘর থেকে বের হলে অপূর্বদের সীমানা থেকেই দেখা যায়। চাচাতো বোন মিলি বয়সে অপূর্বর চার–পাঁচ বছরের বড়। ইতস্তত করতে করতে অপূর্ব মিলিকে শাহনাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করা শুরু করল, মিলি এখন কোথায় পড়ে? পরিবারের অন্য সদস্যরা কেমন আছে, কী করে, অপূর্বর লজ্জা লজ্জা ভাব মুখখানা দেখে মিলি কিছুটা কৌতূহল অনুভব করল।
মিলি এমন করে হাসল যেন ও বুঝতে পারছে অপূর্বর মনের অবস্থা। কিছু সময় পর অপূর্ব বলেই ফেলল, শাহনাজকে দেখে তার মনের অবস্থা খারাপ, বন্ধুত্ব করতে চায়, মিলিকে অনুরোধ করল ছোট একটা চিঠি মিলি কি শাহনাজের কাছে পৌঁছে দেবে? মিলি একটু ভাবল, তারপর বলল, ঠিক আছে দেবে।
জীবনের প্রথম প্রেমপত্রে অপূর্ব লিখল:
শাহনাজ কেমন আছ?
এসএসসি পরীক্ষার পর বাড়িতে আছি
অবসর সময় কাটাচ্ছি
তুমি কি আমার বন্ধু হবে?
ভালো থেকো।
অপূর্ব।
চিঠিটা মিলির হাতে দিয়ে অপূর্ব কিছুটা নির্ভার হলো, মনের পুরো আবেগ চিঠিতে প্রকাশ পেল না। মিলি সবকিছু বুঝে গেল, চিঠিটা না পড়েই হাতে গুঁজে নিল। চিঠি শাহনাজের কাছে পৌঁছাল; কিন্তু কোনো উত্তর এল না। অপূর্ব জানতে চাইলে মিলি বলল, শাহনাজ এসব বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক করতে চায় না, ওর বড় ভাইয়েরা জানলে সমস্যা হবে। মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো, দিনের সমস্ত আলো নিভে গেছে, চারদিকে শুধু অন্ধকার। প্রচণ্ড মন খারাপ হলো, মিলির সাথে বেশি কথা না বলে ঘরে ফিরে গেল। ঘরে ঢুকতেই মায়ের চোখে অপূর্বর মলিন মুখটা চোখ পড়ল, মা জানতে
চাইলেন:
মা: কী সমস্যা?
অপূর্ব: কিছু না।
মা: আসো, খাবে।
অপূর্ব: খিদা নাই, খাবো না।
মা: রাতে অল্প হলেও খেতে হয়, আসো।
অপূর্ব আর কথা না বাড়িয়ে শোবার ঘরে চলে গেল। শাহনাজ যা বলেছে, তাতে অপূর্বর রাগ হলেও সে আশা ছাড়েনি, পরদিন আবার সেই দখিনা বাতাসের আশায় বাড়ির শেষ প্রান্তে বসা। যদি শাহনাজকে একটু দেখা যায়। সেদিন শাহনাজকে দেখা গেল না ঘরের বাইরে। দিনে এখন দু–তিনবার ও দক্ষিণ সীমান্তে যাওয়া হয় অপূর্বর মনের অজান্তেই প্রচণ্ড সেই শিহরণ বারবার শাহনাজকে মনে করিয়ে দেয়, সেই দৌড়াতে দৌড়াতে চলে যাওয়া, উচ্চ স্বরে কোকিলকণ্ঠী হাসির আওয়াজ, অপূর্বর ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ঠিক তৃতীয় দিন শাহনাজকে তার সীমান্তে গাছতলায় বসে থাকতে দেখা গেল, অপূর্বকে অবাক করে সে হাতে ইশারা করল তাদের সীমানায় যেতে। শুরুতে একটু দ্বিধা থাকলেও অনবরত হাতের ইশারায় কাছে ডাকা, মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। অপূর্ব চারদিকে একটু দেখে নিল, কেউ তাকে ফলো করছে কিনা। গ্রামে এটা খুব সুখকর নয় যে দুজন কিশোর–কিশোরী পাড়া–প্রতিবেশীর সামনে দেখাসাক্ষাৎ করছে। সমস্যাটা দুজনের জন্যই সমান মনে হচ্ছে অপূর্বর কাছে।
অপূর্বর আর তর সইছে না, আশপাশে কে কী ভাবল, তার চেয়ে বড় এই বয়সের আবেগ, সে ছুটল শাহনাজের ডাকে।
শাহনাজ: তোমার চিঠি আমার ভালো লেগেছে।
অপূর্ব: তবে যে মিলিকে বললে তুমি চাও না।
শাহনাজ: আরে বোকা, মিলিকে বললে আমার পরিবারের সবাই জেনে যেত।
অপূর্ব: আমি তো একরকম নিরাশ হয়ে গেছিলাম।
শাহনাজ: তুমি যা ভাবছ তোমার পরিবার কি মানবে?
অপূর্ব: এত কিছু ভেবে দেখিনি।
শাহনাজ: ভাবতে হবে।
দশ–পনেরো মিনিট কথা বলে অপূর্ব ফিরে এল। নিজেকে বেশ সফল ও যোগ্য মনে হচ্ছে, একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা গেল, শাহনাজ কোনো আবেগ নির্ভর সম্পর্কে জড়াতে চায় না, সে সম্পর্কের পূর্ণতা চায়। দুদিন আগে অপূর্ব যেভাবে ভাবত এখন শাহনাজের ভাবনা একই পথের হলো। এখন দুজনই যার যার সীমান্তে এসে অপেক্ষা করে শুধু একটু দেখার জন্য, অত দূর থেকে শুধু কিছুটা দেখাই সম্ভব, কথা বলার মতো দূরত্ব নয়। এখন বিষয়টি এমন হলো, আশপাশে কেউ বসে থাকলেও অপূর্ব বা শাহনাজের কোনো সমস্যা হচ্ছে না, এখানে নির্বাক প্রেম চলছে। শুধু দুজন জানে কী হচ্ছে, আর কেউ জানে না। তিন মিনিট হাঁটার দূরত্বে দুজন মানুষ থাকে, কথা বলা যায় না শুধু একটু দেখা যায়, তাতেই কি প্রচণ্ড টান, রোদ, বৃষ্টি, ঝড়—সবকিছুর মাঝে ও দুজনের দেখাদেখি চলতে থাকল।
কাছে গিয়ে কথা বলা হচ্ছে না, কোনো শারীরিক স্পর্শ নেই, মোবাইল ফোন তখনো সহজলভ্য ছিল না। মহা পবিত্র এই প্রেম আছে বলে অপূর্ব ভীষণ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল পৃথিবী জয় করা হয়ে গেছে, আর বাস্তবতা হচ্ছে এরা দুজন সদ্যোজাত মাত্র স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে।
একদিন এমন হলো, দুজনই যার যার সীমান্তে বসা ছিল, কিছুক্ষণ পর শাহনাজ কোনো কাজে ঘরে ফিরে গেল, অপূর্ব থাকল যথারীতি, ভাবছে শাহনাজ আবার আসবে, তারপর বৃষ্টি নামল, অপূর্ব ঘরে ফিরে যাওয়ার সময় পেল না, কাছেই একটি তালগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল যেন বৃষ্টি গায়ে কম পড়ে। অপূর্ব হঠাৎ দেখতে পেল শাহনাজ বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে এসে দেখছে অপূর্ব কি এখনো বৃষ্টিতে ভিজে ওখানেই আছে? গাছের আড়ালে থাকার কারণে শাহনাজ অপূর্বকে দেখতে না পেয়ে আবার দৌড়ে ঘরে ফিরে যায়।
অপূর্ব ভাবতে থাকে, শাহনাজ অপূর্বর চেয়ে বেশি প্রেমে পড়েছে। অপূর্ব এবার এ সম্পর্কের পরিণতি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ে। পরিবার কি এমন সম্পর্ক মেনে নেবে? পারিবারিক অবস্থান নিয়ে সমস্যা হতে পারে। অর্থবিত্ত ও পারিবারিক ঐতিহ্য তুলনা করলে অপূর্বর পরিবার অনেকখানি এগিয়ে। কিন্তু প্রেমে পড়ার সময় কজন আর এ বিষয়ে ভাবে? যেখানে দুজনের বয়স মাত্র ষোলো–সতেরো। এ বয়সে সবকিছুই রঙিন লাগে, প্রথম প্রেমে পড়ার অনুভূতি, কে না জানে কতটা বেহিসাবি হয়। যত দিন যাচ্ছে ভালোবাসা তত বাড়ছে, দূর থেকে শুধু দেখে আর ভালো লাগছে না, কাছে গিয়ে কথা বলতে মন চায়, লোকলজ্জার ভয় কাটিয়ে অপূর্ব আবার হাজির হলো শাহনাজদের বাড়িতে।
শাহনাজ: দেখো অপূর্ব আমার কিন্তু ভয় লাগছে, তোমার বাবা অনেক রাগী মানুষ।
অপূর্ব: আরে না, কোনো সমস্যা হবে না।
শাহনাজ: তুমি কেন আমাকে পছন্দ করলে?
অপূর্ব: জানি না।
শাহনাজ: সেদিন তোমাদের বাড়িতে তুমি আমাকে অপলক দেখছিলে।
অপূর্ব: হুমম, আমার মনে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো কিছু ঘটেছিল।
শাহনাজ: হইছে, আর বলতে হবে না।
এভাবেই বেশ কিছুদিন অপূর্ব আর শাহনাজের আকাশ–কুসুম মধুচন্দ্রিমা চলছিল। এ বয়সে প্রেম করার বাস্তবতা, ভালোবাসার পরিণাম কী হতে পারে দুজনের কেউই পরিমাপ করেনি, করার কথাও না, প্রেম তো আর বলেকয়ে আসে না, আসে আচমকা, বিদ্যুৎ চমকানোর মতো। কিছুদিন গোপন থাকলেও আস্তে আস্তে প্রতিবেশীর কেউ কেউ টের পেল। তৃতীয় ব্যক্তিরা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিল না। এই কান ওই কান হতে হতে একদিন খবর পৌঁছে গেল শাহনাজের একসময়কার গৃহশিক্ষকের কানে। তিনিও শাহনাজকে পছন্দ করতেন; কিন্তু সিরিয়াসলি তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করেননি। হয়তো ভাবছিলেন, শাহনাজ আরও বড় হলে বা কলেজে পড়ার সময় বলবেন। এখন যখন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে শুনলেন, কালবিলম্ব না করে শাহনাজদের বাড়িতে গেলেন।
অপূর্বকে দেখানোর জন্য কিছু সময় ঘরের বাইরে এসে একই জায়গায় শাহনাজসহ বসে আড্ডা দিলেন। অপূর্ব এত দূর থেকে কিছু বুঝে উঠতে পারল না। হতে পারে কোনো কাজিন বা আশপাশের বাড়ির কেউ। কিছু সময় পর শাহনাজ ঘরে ফিরে গেল আর ভদ্রলোক সোজা অপূর্বদের বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। কাছে আসতেই অপূর্ব চিনতে পারল ইনি এই গ্রামের অন্য পাড়ার ৫–৭ বছরের এক বড় ভাই রবি।
রবি: কী খবর অপূর্ব?
অপূর্ব: জি, ভালো।
রবি: তুমি নাকি আজকাল ডুবে ডুবে পানি খাচ্ছ?
অপূর্ব : না মানে বুঝলাম না।
রবি: বেশি কিছু বোঝার দরকার নাই।
অপূর্ব: রবি ভাই, খুলে বলেন, কোনো সমস্যা?
রবি: হুমম, অনেক বড় সমস্যা।
রবি: তোমাকে যেন আর শাহনাজদের বাড়ির সীমানায় যেতে না দেখি।
অপূর্ব আর কথা বাড়াল না, ভেতরে–ভেতরে রাগ জন্মাল, শাহনাজ কেন বিষয়টি অপূর্বকে জানাল না। পরের দিন, শাহনাজদের বাড়িতে গেল, এবার ঘরের ভেতরে বসল। শাহনাজ অপূর্বর মলিন চেহারা দেখে বুঝল কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। অপূর্ব কিছু বলার আগেই শাহনাজ জানাল, উনি আমার প্রাইভেট শিক্ষক ছিলেন, কখনো কিছু বলেননি, আমাকে পছন্দ করেন বা এমন কিছু, এখন কেন গায়ে লাগছে বুঝতে পারছি না। যা বলার আমি বলেছি, তোমার টেনশনের কিছু নাই। অপূর্ব এবার স্বাভাবিক হয়ে বসল। শাহনাজের বড় বোন বিষয়টা জানত, মাঝেমধ্যে সে শাহনাজের সাথে বসে অপূর্বর সাথে কথা বলত। আজকে উনি পুরি, শিঙাড়া ভেজে অপূর্ব আর শাহনাজকে খেতে দিলেন। ভালোই সময় কাটছিল। অপূর্বর বাবা–মা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। পাশের বাড়ির এক ভদ্রলোক অপূর্বকে কীভাবে যেন শাহনাজদের বাসায় দেখেছেন, তিনি আবার অপূর্বর বাবার সাথে ঘনিষ্ঠ। কালবিলম্ব না করে অপূর্বর বাবার কানে খবরটা পৌঁছে দিল, সাথে শাহনাজের পরিবার সম্পর্কে যতসব নেগেটিভ তথ্য। কান ভারী করা বলে যাকে।
অপূর্বর বাবার মাথায় রক্ত ওঠার উপক্রম, প্রথমত ওই পরিবারের সাথে এই পরিবারের সম্পর্ক হতে পারে কি না, সেটা অনেক পরের বিষয়, ছেলে এই বয়সে কাউকে পছন্দ করছে, তার বাসায় দেখা করছে—এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অপূর্বর বাবা রশিদ সাহেব স্কুল থেকে এসে ঘরে ঢোকার আগেই এমন চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিয়েছে যেন সমস্যাটা বাড়ির সব মানুষের, সবাইকে শুনতে হবে।
রশিদ সাহেব: অপূর্বর মা? কোথায় তুমি?
রশিদ সাহেব: তোমার ছেলে কোথায়?
অপূর্বর মা: কেন, কী হইছে?
রশিদ সাহেব: আমার মান–ইজ্জত সব গেছে।
কী ছেলে জন্ম দিলাম?
মা: একটু শান্ত হন, কী সমস্যা?
রশিদ: এমন ছেলে আমার দরকার নাই।
আমি তারে মেরে ফেলব।
মা: অপূর্ব আসুক ঘরে, আমরা কথা বলে দেখি।
রশিদ সাহেব: এই ঘরে তার জায়গা হবে না।
বাবার উচ্চ কণ্ঠ শুনে অপূর্ব ঘরে না এসে ঘরের পশ্চিম পাশের বাগানে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল। রাগের মাথায় কী করে বসে এই ভেবে আর ঘরে ঢুকল না, সন্ধ্যা নামল, অপূর্ব নিজের ঘরে না গিয়ে পাশের ঘরে এক চাচার বাসায় গিয়ে শুয়ে থাকল, মাথায় রাজ্যের চিন্তাভাবনা। মা অনেক খোঁজার পর যখন জানতে পারে অপূর্ব চাচার ঘরে আছে, প্লেটে রাতের খাবার নিয়ে হাজির হলো। অপূর্বর পাশে বসে মা মন খারাপ করে অপূর্বকে বোঝানোর চেষ্টা করল আর যেন দক্ষিণ সীমান্তে না যাওয়া হয়। অপূর্ব কিছু বলল না। মা, ভাত রেখে চলে গেলেন।
গত দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া প্রেম শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। অপূর্বর সমস্ত হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, কাউকে কিছু বোঝানো যাচ্ছে না। শাহনাজের সাথেও কথা বলার সুযোগ নেই। মনে হচ্ছে বেঁচে থেকে আর কী লাভ? জীবনের সবকিছু শেষ।
অবুঝ বয়সের ভালোবাসা এমনই হয়, আর সেটা যদি হয় প্রথম প্রেম, কখনোই ভোলা যায় না; কিন্তু ভুলে থাকতে হয়। শাহনাজের সাথে অপূর্বর আর দেখা হলো না। পরদিন লুকিয়ে অপূর্ব দেখল শাহনাজ তাদের বাড়ির সীমান্ত বসে অপেক্ষা করছে, অপূর্ব দেখা দিল না। বুকে কষ্ট চাপা রাখল, ঘরে এসে মাকে জানাল আজকেই সে ঢাকা চলে যাবে। ঢাকায় গিয়ে কলেজে ভর্তির কোচিং করতে হবে। বাবা বাড়ি ফেরার আগেই অপূর্ব ঢাকা রওনা দিল। মা চোখের জল মুছতে মুছতে অপূর্ব মাথায় হাত রেখে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বাস ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ল, বাসের সাথে শরীরটা যাচ্ছে, অনেক ভারী, মনটা যেন অন্য কোথাও রেখে যাচ্ছে, পৃথিবীর কোনো কিছুই আর সুন্দর লাগছে না, হৃদয়ে ফাঁকা হাহাকার। চোখে শুধু ভাসছে, একটি মেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হাসছে।

Source - nagorik.prothomalo.com ↗