ময়মনসিংহের দক্ষিণ গফরগাঁওয়ে বীর নিবাস নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের প্রতিবাদ করায় বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে।
এমনকি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও প্রকৌশলীর নিষেধ উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ছাদ ঢালাই করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মিত অংশ ভেঙে নতুন করে ভবন নির্মাণ এবং হুমকির ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে মমতাজ বেগম। অভিযুক্ত ঠিকাদার মুক্তার হোসেন গফরগাঁও উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক।
তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকল্পের কাজ তদারকিতে অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান। তাঁর অভিযোগ, ঠিকাদার ১০ থেকে ১২টি মোটরসাইকেলে করে দলীয় লোকজন নিয়ে প্রকল্প এলাকায় যান। এ কারণে তাঁকে কিছু বলার সাহস পান না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এদিকে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মনিরুল হক ফারুক রেজার কাছে প্রকল্পের তথ্য জানতে চাইলে প্রথমে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
ময়মনসিংহে বীর নিবাস নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রীর ব্যবহার ও ঠিকাদারের হুমকির অভিযোগ
তবে দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল নাঈম বলেন, প্রকল্পের সব তথ্য পিআইওর কাছে রয়েছে। তিনি কেন তথ্য দিতে অস্বীকার করেছেন, তা তাঁর জানা নেই। সম্প্রতি দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার দত্তেরবাজার ইউনিয়নের বিরুই গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত ছোহরাব উদ্দিনের মেয়ে মমতাজ বেগম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগ দেওয়ার পরও ঠিকাদার মুক্তার হোসেন প্রকৌশলীর অনুমতি ছাড়াই পিআইওকে সঙ্গে নিয়ে ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার বাড়ির ছাদ ঢালাই করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে মমতাজ বেগমের দাবি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি করা ঘর তিনি গ্রহণ করবেন না। এটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গফরগাঁও উপজেলায় ১২০টি বীর নিবাস নির্মাণের অনুমোদন দেয় সরকার।
সম্প্রতি দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা ঘোষণার পর সেখানে ১০৬টি বীর নিবাস নির্মাণ করা হয়। এসব ১০৬টি বীর নিবাসের প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৮৬ হাজার ৫৬৩ টাকা। বাকি ১৪টির প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ লাখ টাকা। সূত্র জানায়, ১৪টি বীর নিবাসের নির্মাণকাজ শেষ হলেও ১০৬টির কাজ এখনো শেষ হয়নি। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে আবারও সময় বাড়ানো হতে পারে। এর আগেও ১২০টি বীর নিবাস নির্মাণে তিন দফা সময় বাড়ানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। মমতাজ বেগমের লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তাঁর বাবার বাড়িতে বীর নিবাস নির্মাণে অত্যন্ত নিম্নমানের, পুরোনো ও বাতিল ইটসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করছেন ঠিকাদার। কাজটিতে রডের পরিমাণ ও সিমেন্টের মিশ্রণেও ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে।
ব্যবহৃত ইট হাতে চাপ দিলেই মাটির মতো গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। দেয়ালে লাগানো ইটগুলো এমনিতেই খসে পড়ছে, হাত দিয়ে চাপ দিলেও ভেঙে যাচ্ছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, নিম্নমানের ও পুরোনো ইট ব্যবহারে বাধা দিয়ে প্রতিবাদ করায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দুর্ব্যবহার করেন এবং বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দেন। এতে তাঁদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত ছোহরাব উদ্দিনের মেয়ে মমতাজ বেগম বলেন, ‘প্রথমে এক ট্রাক এক নম্বর ইট এনেছিল। পরে যা এসেছে, সবই নিম্নমানের। আমি বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলে ঠিকাদার ১০ থেকে ১২টি মোটরসাইকেলে করে লোকজন নিয়ে এসে আমাকে হুমকি দেন। বলেন, ঘর তৈরি করছি, এই ঘর নিতে হবে। না হলে আপনার ঘর নির্মাণ করা হবে না। পরে আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করি।
’ তিনি বলেন, ‘লিখিত অভিযোগের পর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এসে পরিদর্শন করেন। তখন তিনি বলেন, দেয়ালে নিম্নমানের যেসব ইট ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো ড্রিল মেশিন দিয়ে কেটে প্রয়োজনে ঢালাই করে দেওয়া হবে। ’ মমতাজ বেগমের দাবি, ড্রিল মেশিন দিয়ে দেয়ালের ইট সরিয়ে ঢালাই করলে দেয়াল ও ঘরের ক্ষতি হবে এবং স্থায়িত্ব কমে যাবে।
এরপরও তাঁর কোনো কথা শোনা হয়নি। অভিযোগ দেওয়ার পরও ঠিকাদার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে লোকজন নিয়ে এসে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ছাদ ঢালাই করে ফেলেন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় আবারও লোকজন নিয়ে এসে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়, যাতে তিনি আর কোনো কথা না বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘ঘরের বরাদ্দ কত, কাজের সিডিউল কী, ঘরের পরিমাপ কত—এসব কিছুই আমাকে ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জানাননি।
আমার কথা একটাই, সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বীর নিবাস তৈরি করে দিচ্ছে। ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কেন নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করবেন? এটি ভেঙে নতুন করে ঘর তৈরি না করলে আমি এই ঘর নেব না। ’ অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মনিরুল হক ফারুক রেজা প্রথমে বলেন, বীর নিবাস নির্মাণের কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই।
পরে জানাবেন বলেও জানান তিনি। দুই দিন পর আবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওই ঘরে ব্যবহৃত নিম্নমানের ইট দেয়াল কেটে সরিয়ে ঢালাই করে দেওয়া হবে। অভিযোগ দেওয়ার পরও কেন ছাদ ঢালাই করা হলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছাদে ভালো মানের সামগ্রী ব্যবহার করে ঢালাই করা হয়েছে। তবে উপজেলায় কতটি বীর নিবাস নির্মাণ করা হচ্ছে কিংবা প্রকল্পের মোট বাজেট কত, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল নাঈম বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে পিআইও কেন তথ্য দিতে অস্বীকার করছেন, সে বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ও ঠিকাদার মুক্তার হোসেন বলেন, ওই নারীর লোকজন ইট চুরি করেছেন।
ইট চুরির ভিডিও তাঁর কাছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছেও রয়েছে। ইট চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতেই ওই নারী মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘ঠিকাদার সাবেক ছাত্রদল নেতা। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করছেন। তা ছাড়া আমি পুরো বিভাগের দায়িত্ব পালন করি।
প্রতিটি প্রকল্পে যেতে আমার অন্তত ১৫ দিন সময় লাগে। আমি যখনই ওই প্রকল্পে গিয়েছি, তখনই দেখেছি ঠিকাদার ১০ থেকে ১৫ জন দলীয় লোক নিয়ে কাজ করাচ্ছেন। আমি তো ওই এলাকার স্থানীয় নই। তিনি অনেক লোকজন নিয়ে আসেন, তাঁকে কিছু বলা যায় না। ’ তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি আমি শুনেছি। অভিযোগ দেওয়ার পর ছাদ ঢালাই হয়েছে। সেখানে আমার সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল।
আমি বলেছিলাম, আমি দেখার পর ছাদ ঢালাই হবে। কিন্তু ঠিকাদার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ছাদ ঢালাই করে ফেলেছেন। সেখানে তো আমার কিছু করার নেই। ’ আক্তারুজ্জামান জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নিয়ে তিনি মমতাজ বেগমের বাড়ি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তখন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বলেছিলেন, দেয়ালে যেখানে যেখানে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো সরিয়ে ঢালাই করে দেওয়া হবে।
দেয়াল থেকে ইট সরিয়ে ঢালাই করা কতটা যুক্তিসংগত, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো অনিয়ম। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এভাবে করে দিতে বলেছেন। তবে আমি এতে অস্বীকৃতি জানিয়েছি। ’ এ বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুদ প্রধান বলেন, বিষয়টি তিনি সাংবাদিকের কাছেই প্রথম শুনেছেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
The post ময়মনসিংহে বীর নিবাস নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রীর ব্যবহার ও ঠিকাদারের হুমকির অভিযোগ appeared first on Bangladesh Diplomat | বাংলাদেশ ডিপ্লোম্যাট.
Source - bangladeshdiplomat.com ↗