Bangladesh · 2026-11-07 19:16:27

অদ্ভুত সব কীর্তিতে বাংলাদেশের যাঁরা গড়েছেন বিশ্বরেকর্ড

অদ্ভুত সব কীর্তিতে বাংলাদেশের যাঁরা গড়েছেন বিশ্বরেকর্ড
কেউ মাথায় ফুটবল নিয়ে সাইকেল চালিয়েছেন ২০ কিলোমিটার, কেউ কাগজের ক্লিপ জুড়ে বানিয়েছেন আড়াই কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ শিকল। আবার কেউ এক মিনিটে চপস্টিক দিয়ে খেয়েছেন ৩৭টি চালের দানা। অসাধারণ দক্ষতা, ধৈর্য আর ব্যতিক্রমী চিন্তাশক্তির জোরে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন বাংলাদেশের কয়েকজন মানুষ। তাঁদের কীর্তি শুধু বিস্ময় জাগায় না, পরিচয় করিয়ে দেয় মানুষের অসীম সম্ভাবনার সঙ্গেও।

বিশ্বরেকর্ডের কথা উঠলে অনেকের চোখে ভেসে ওঠে অলিম্পিক, বিশ্বকাপ কিংবা বড় কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ছবি। কিন্তু পৃথিবীতে এমন অনেক রেকর্ড রয়েছে, যেগুলোর জন্য প্রয়োজন হয় না বড় কোনো স্টেডিয়াম কিংবা ব্যয়বহুল আয়োজন। কখনো সামান্য একটি কাগজের ক্লিপ, কয়েকটি চালের দানা কিংবা একটি ফুটবলই হয়ে উঠতে পারে বিশ্বজয়ের উপকরণ।

বাংলাদেশের কয়েকজন মানুষ এমনই ব্যতিক্রমী সব কীর্তির মাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছেন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। তাঁদের কেউ ব্যক্তিগত দক্ষতায়, কেউ সৃজনশীলতায়, আবার কেউ দলগত উদ্যোগে অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

মাথায় ফুটবল নিয়ে সাইকেল চালিয়ে ২০ কিলোমিটার!

ফুটবল মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা কয়েক পা হাঁটা অনেকের কাছেই কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু মাথায় ফুটবল রেখেই সাইকেল চালিয়ে ২০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দেওয়ার ঘটনা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

বাংলাদেশের মাগুরার আবদুল হালিম ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এই অসাধারণ কীর্তি গড়েন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, মাথায় ফুটবল ভারসাম্য রেখে সাইকেলে সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রমের রেকর্ডটি তিনি গড়েন ২০ দশমিক ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে।

এ ধরনের কৃতিত্বের জন্য প্রয়োজন অসাধারণ ভারসাম্য, শারীরিক নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘ অনুশীলন। সামান্য অসতর্কতাতেই মাথা থেকে বল পড়ে যেতে পারে। অথচ সেই কঠিন কাজটিই করে দেখিয়েছেন বাংলাদেশের এই ক্রীড়াপ্রেমী।

কাগজের ক্লিপে আড়াই কিলোমিটারের শিকল!

যে কাগজের ক্লিপ দিয়ে আমরা সাধারণত কয়েকটি কাগজ একসঙ্গে আটকে রাখি, সেই ক্লিপ দিয়েই তৈরি করা যায় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ শিকল—এ কথা ভাবাও কঠিন।

বাংলাদেশের ইমরান শরিফ এমনই এক ব্যতিক্রমী কীর্তি গড়েছেন। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তিনি এককভাবে তৈরি করেন ২ দশমিক ৫২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ কাগজের ক্লিপের শিকল।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে এটি ‘Longest paperclip chain by an individual’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।

একটি একটি করে ক্লিপ জোড়া লাগিয়ে এত দীর্ঘ শিকল তৈরি করা নিঃসন্দেহে ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের কঠিন পরীক্ষা। সাধারণ একটি বস্তু দিয়েও যে অসাধারণ কিছু করা সম্ভব, ইমরান শরিফের এই অর্জন তারই উদাহরণ।

এক মিনিটে চপস্টিক দিয়ে ৩৭টি চালের দানা!

চপস্টিক দিয়ে খাবার খাওয়া অনেকের কাছে অভ্যাসের বিষয়। কিন্তু এক মিনিটে চপস্টিক ব্যবহার করে ৩৭টি চালের দানা খাওয়া মোটেও সহজ নয়।

বাংলাদেশের সুমাইয়া খান ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এই রেকর্ড গড়েন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, এক মিনিটে চপস্টিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি চালের দানা খাওয়ার রেকর্ডটি তাঁর দখলে যায়। আগের রেকর্ডের চেয়ে ১০টি বেশি চালের দানা খেয়ে তিনি নতুন রেকর্ড গড়েন।

এখানে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিটি চালের দানা নিখুঁতভাবে চপস্টিকে তুলে মুখে নেওয়া। কাজটি দেখতে সাধারণ মনে হলেও এর জন্য প্রয়োজন হাতের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ ও দ্রুততা।

২৯.৯৮ সেকেন্ডে পর্যায় সারণির সব মৌলের নাম!

বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের কাছে পর্যায় সারণির ১১৮টি মৌলের নাম মনে রাখা সহজ কাজ নয়। অথচ বাংলাদেশের কে এম ফাহাদ মাত্র ২৯ দশমিক ৯৮ সেকেন্ডে পর্যায় সারণির সব মৌলের নাম উচ্চারণ করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১১ জুন ঝিনাইদহে তিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। নিজের ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকদের উপস্থিতিতে তিনি রেকর্ডের প্রচেষ্টা সম্পন্ন করেন।

এটি শুধু দ্রুত মুখস্থ বলার বিষয় নয়; দীর্ঘ অনুশীলন, স্মৃতিশক্তি এবং নির্ভুল উচ্চারণের সমন্বয়েই এমন সাফল্য সম্ভব।

এক মিনিটে ৩৭টি চালের দানা, আরেকদিকে ২৯ সেকেন্ডে ১১৮টি মৌল—দক্ষতার বিচিত্র প্রকাশ!

বাংলাদেশিদের বিশ্বরেকর্ডের তালিকায় এমন আরও কিছু ব্যতিক্রমী অর্জন রয়েছে, যেগুলো আলাদা করে নজর কাড়ে।

২০২১ সালের ২৪ জুলাই ঢাকায় সিমন ইমরান হায়দার ও অগ্রহ অর্জন করেন বৃহত্তম খাম-নির্মিত মোজাইক পতাকার রেকর্ড। ২৪২ দশমিক ৭২৬ বর্গমিটার আয়তনের এই শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়েছিল খাম সাজিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এই উদ্যোগটি দেশের মানুষের প্রতি উৎসর্গ করা হয়।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর দিনাজপুরে এসিআই মোটরস লিমিটেড চার ঘণ্টার মধ্যে ৩৫০টি ট্রাক্টর গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করে বৃহত্তম ট্রাক্টর সরবরাহের রেকর্ড গড়ে। বিশেষভাবে সাজানো ট্রাক্টরগুলো ওপর থেকে দেখলে ‘Sonalika’ নামের আকৃতি তৈরি করেছিল।

শিল্প, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত দক্ষতা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই যে বিশ্বরেকর্ড গড়ার সুযোগ রয়েছে, এসব ঘটনা তা তুলে ধরে।

৫৪টি পতাকা নিয়ে আকাশে বাংলাদেশের বিশ্বজয়

শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, দলগত উদ্যোগেও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ।

২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে ঢাকায় ৫৪টি জাতীয় পতাকা নিয়ে একযোগে প্যারাস্যুট জাম্পের আয়োজন করে টিম বাংলাদেশ। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি অনুযায়ী, একসঙ্গে স্কাইডাইভিংয়ের সময় সবচেয়ে বেশি পতাকা ওড়ানোর রেকর্ড এটি।

২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি এই অর্জনের স্বীকৃতির খবর প্রকাশ্যে আসে। বাংলাদেশের ৫৪তম বিজয় দিবস স্মরণীয় করে রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

লাল-সবুজের ৫৪টি পতাকা নিয়ে আকাশে উড়ে যাওয়ার দৃশ্য শুধু একটি রেকর্ড নয়; এটি ছিল সম্মিলিত দক্ষতা, সমন্বয় ও জাতীয় গর্বের প্রতীক।

মানুষের সামর্থ্যের সীমা কোথায়?

বিশ্বরেকর্ডের এসব গল্পের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে—অসাধারণ কিছু করার ইচ্ছা। কারও কাছে সেটি ফুটবল নিয়ে সাইকেল চালানো, কারও কাছে কাগজের ক্লিপ দিয়ে দীর্ঘ শিকল তৈরি করা, আবার কারও কাছে কয়েক সেকেন্ডে বিজ্ঞানের কঠিন তথ্য স্মরণ করে বলা। এসব অর্জন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বজয়ের জন্য সব সময় বড় আয়োজন কিংবা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হতে পারে একটি ব্যতিক্রমী চিন্তা, নিয়মিত অনুশীলন, ধৈর্য এবং নিজের সামর্থ্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

বাংলাদেশের এই রেকর্ডধারীরা হয়তো প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন পথে এগিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সাফল্যের একটি জায়গায় মিল রয়েছে—নিজেদের বিশেষ দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।

আর সেই কারণেই তাঁদের গল্প কেবল বিশ্বরেকর্ডের তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো বাংলাদেশের মানুষের সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় ও সম্ভাবনারও পরিচয় বহন করে।

Source - www.bd24live.com ↗