Bangladesh · 2026-11-07 20:40:58

‘বাচ্চাকে সুস্থ করে তোলার বদলে তারা মৃত্যুমুখে ঠেলে দিল’

‘বাচ্চাকে সুস্থ করে তোলার বদলে তারা মৃত্যুমুখে ঠেলে দিল’
ভোর চারটার দিকে দ্বিতীয় ছেলেসন্তানের জন্ম হয় গোলাম রাব্বানীর ঘরে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। জন্মের পর নবজাতককে সুস্থ করে তুলতে নেওয়া হয়েছিল নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (এনআইসিইউ)। সেখানেই শিশুটির মাথা, পিঠ ও পায়ের বিভিন্ন অংশ দগ্ধ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এখন তার জীবন নিয়ে শঙ্কায় পরিবার।
রাজধানীর চানখাঁরপুলের বেসরকারি রয়েল কেয়ার হাসপাতালে শনিবার এ ঘটনা ঘটে। দগ্ধ নবজাতক এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন। শিশুটির বাবা গোলাম রাব্বানী জানান, চিকিৎসকেরা তাঁকে জানিয়েছেন, তাঁর সন্তানের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
গোলাম রাব্বানীর বাড়ি বগুড়ার কাহালু উপজেলার পলি বগুই গ্রামে। বর্তমানে পরিবার নিয়ে থাকেন গাজীপুরে। সেখানে তাঁর একটি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দোকান রয়েছে। স্ত্রী শাপলা বেগমকে নিয়ে শুক্রবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন তিনি। সন্তান প্রসবের জন্য শাপলাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শনিবার ভোর চারটার দিকে তাঁদের দ্বিতীয় ছেলেসন্তানের জন্ম হয়। তাঁদের আরও একটি ছেলে রয়েছে।
নবজাতকের জন্মের পর চিকিৎসকেরা তাকে এনআইসিইউতে রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনআইসিইউর কোনো শয্যা খালি ছিল না। এ অবস্থায় সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানকে কোথায় ভর্তি করবেন, তা নিয়ে বিপাকে পড়েন রাব্বানী।
তখন মতিউর নামের এক ব্যক্তি তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশের চানখাঁরপুলে বেসরকারি রয়েল কেয়ার হাসপাতালের ঠিকানা দেন। সেখানে এনআইসিইউর ব্যবস্থা আছে বলে জানতে পারেন তাঁরা। সন্তানকে সুস্থ করে তোলার আশায় রাব্বানী নবজাতককে নিয়ে যান ওই হাসপাতালে।
হাসপাতালটিতে নেওয়ার পর একজন চিকিৎসক শিশুটিকে এনআইসিইউতে রাখেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই ঘটে বিপত্তি। গোলাম রাব্বানী বলেন, এনআইসিইউতে শিশুটিকে রাখার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ চিৎকার শুনতে পান তাঁরা। কেউ একজন ‘আগুন আগুন’ বলে চিৎকার করছিলেন। ছুটে গিয়ে দেখেন, তাঁর নবজাতক সন্তানের শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গেছে।
সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে রাব্বানী বলেন, ‘হঠাৎ চিৎকার শুনতে পাই, আগুন। ততক্ষণে আমার সন্তানের শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গেছে।’
রাব্বানীর অভিযোগ, এনআইসিইউতে অতিরিক্ত তাপের কারণে তাঁর সন্তানের মাথা, পিঠ ও পায়ের বিভিন্ন অংশ দগ্ধ হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। তাঁর দাবি, মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে শিশুটির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনার পর হাসপাতালের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাব্বানী। তাঁর অভিযোগ, শিশুটি দগ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরিবর্তে হাসপাতালের লোকজন সেখান থেকে চলে যান। পরে তাঁদের আর পাওয়া যায়নি।
এমন পরিস্থিতিতে দগ্ধ নবজাতককে নিয়ে আবার হাসপাতালে ছুটতে হয় রাব্বানীকে। প্রথমে শিশুটিকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান তাঁরা। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেখানে এনআইসিইউতে তার চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান।
সন্তানের অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে রাব্বানী বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার জানিয়েছেন, আমার বাচ্চার বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ।’
রাব্বানীর অভিযোগ, রয়েল কেয়ার হাসপাতালে সন্তানের দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতেও বাধার মুখে পড়েন তিনি। হাসপাতালের মালিকের ভাই তাঁদের ওপর চড়াও হন। কোনো হইচই না করে সেখান থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দেন।
এ ঘটনায় আইনি প্রতিকার চেয়েছেন শিশুটির বাবা। তিনি জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করবেন তাঁরা।
তবে নবজাতক দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রয়েল কেয়ার হাসপাতালের মালিক অপর্ণা হালদার। অভিযোগের বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট সার্কিট হয়েছিল। এখানে আমাদের কোনো গাফিলতি নেই।’ তাঁর দাবি, শিশুটির চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর যে পরিবারে আনন্দের পরিবেশ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শিশুটির জীবন নিয়ে গভীর উদ্বেগ। ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব নিয়ে এই বাবা বলেন, ‘আমার বাচ্চাকে সুস্থ করে তোলার বদলে তারা মৃত্যুমুখে ঠেলে দিল।’

Source - www.prothomalo.com ↗