Bangladesh · 2026-11-07 22:21:45

কীভাবে চলে মারিয়া–রমেশের সংসার

কীভাবে চলে মারিয়া–রমেশের সংসার
রান্নার জ্বালানি জোগাতে গাছের ডালপালা থেকে খড়ি সংগ্রহ করছেন কৃষিশ্রমিক মারিয়া মর্মু। সম্প্রতি নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ফুরকুটিডাংগা এলাকায়সড়কের পাশের একটি আমগাছে উঠে ডাল কাটছিলেন রমেশ বাস্কী। বাগানমালিকের কাছ থেকে আগেই অনুমতি নেওয়া ছিল। নিচে দাঁড়িয়ে সেই ডালগুলো কেটে এক জায়গায় জড়ো করছিলেন তাঁর স্ত্রী মারিয়া মুর্মু। তাঁরা রান্নার লাকড়ি সংগ্রহ করছিলেন। একসময় তাঁরা যে মাঠে ধান রোপণ, কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, সেই মাঠের অনেকটাই এখন আমবাগান। ফলে কৃষিশ্রমিকের কাজ কমেছে। আমের মৌসুম শেষ হলে কাজের সন্ধানে অন্যের জমিতে ছুটতে হয়। সারা বছর কাজ মেলে না।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ফুরকুটিডাংগা গ্রামের বাসিন্দা মারিয়া (২৬) ও তাঁর স্বামী রমেশ (৩০) কৃষিশ্রমিক। তাঁরা সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ। বরেন্দ্র অঞ্চলের ধানখেতে বহু প্রজন্ম ধরে যাঁরা শ্রম দিয়ে আসছেন, তাঁদের বড় একটা অংশ সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। মারিয়া ও রমেশের আবাদি জমি নেই, আছে শুধু বসতভিটা। দুই মেয়েকে নিয়ে চার সদস্যের সংসার। বড় মেয়ের বয়স ছয় বছর, ছোটটির মাত্র তিন মাস। মারিয়ার উপার্জন বন্ধ থাকলে স্বামীর একার আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি ফুরকুটিডাংগায় কথা হয় এই দম্পতির সঙ্গে। সংসারের আয়-ব্যয়ের কথা বলতে গিয়ে মারিয়া বলেন, দিন যত যাচ্ছে, সংসার চালানো তত কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আগে দুজনের আয় দিয়ে কোনো রকমে চলে যেত। এখন তো এলাকায় কাজই নাই। তিন বেলা শাক-ভাত জোটানোর ব্যবস্থাও হয় না।
বিয়ের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জাতাহার গ্রামের বাবার বাড়ি থেকে সাপাহারে আসেন মারিয়া। তখন আশপাশের মাঠে আমন ও বোরো ধানের চাষ হতো। কৃষিশ্রমিকেরা ধান রোপণ, কাটা ও মাড়াইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য ফসলের আবাদেও কাজ পেতেন।
মারিয়া ও রমেশের জীবনে কাজের নিশ্চয়তার চেয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি। আমের মৌসুমে কিছু টাকা জমলেও তা দিয়ে সারা বছরের সংসার চালানো সম্ভব হয় না।মারিয়া বলেন, ‘যখন বিয়া হয়ে স্বামীর বাড়িত আসি, তখন গাঁয়ের আশপাশের মাঠত বর্ষালি ধান ও ইরি আবাদ হতো। তখন বছরের চার-পাঁচ মাস ধান লাগানো, কাটা-মাড়াইয়ের কাজ থাকত। আবার মাঠত সারা বছর অন্যান্য আবাদও হতো। কিন্তু দেখতে দেখতে এলাকার সব মাঠ আমবাগান হয়ে গেল। এখন আর মাঠত আবাদ তেমন নাই। লোকজন কামত নেয় না।’
আমের মৌসুমেই আয়ের ভরসা
এখন মারিয়া আম পাড়ার মৌসুমে এক-দুই মাস কাজ পান। সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ দিন। দৈনিক মজুরি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। সে হিসাবে আমের মৌসুমে আয় হয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অথচ আগে ধানের আবাদের সময় চার-পাঁচ মাসের কৃষিকাজ থেকে আয় হতো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
আম পাড়ার কাজ শেষ হলে উপার্জনের পথ সংকুচিত হয়ে আসে। তখন অন্যের ধানখেতে রোপণ, কাটা বা মাড়াইয়ের কাজ খোঁজেন। কিন্তু ধানের আবাদ কমে যাওয়ায় সেই কাজও আগের মতো মেলে না। তিন মাসের শিশুকে সামলে কাজ করা আরেক চ্যালেঞ্জ। সন্তান রেখে দূরে গিয়ে কাজের সুযোগ নেই, আবার কাজ না করলে সংসার চলে না। তাই স্থানীয়ভাবে কাজের অপেক্ষায় থাকতে হয় তাঁকে।
ধানখেতের জায়গায় আমবাগান
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় সাপাহার ও পোরশা উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠে ধানসহ নানা ফসলের চাষ হতো, শ্রমিকেরা কাজ পেতেন। দিনে দিনে অনেক জমিতে আমবাগান গড়ে উঠেছে। তাঁদের হিসাবে, দুই উপজেলার ফসলি মাঠের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এখন আমবাগান। কৃষি বিভাগের চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের হিসাবে, সাপাহার ও পোরশায় আমবাগান আছে প্রায় ২১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে, পুরো জেলায় ৩০ হাজার ৬০০ হেক্টরে।
ওমর ফারুক, প্রথম আলোর নওগাঁ প্রতিনিধিরমেশ বাস্কী বলেন, আমবাগানের শুরুতে পরিচর্যা আর সেচে শ্রমিক লাগে। গাছ বড় হলে কাজ কমে আসে; থাকে শুধু মুকুলের আগে-পরে কীটনাশক দেওয়া, গোড়ায় সার আর সেচের মতো কিছু কাজ। অথচ ধানের আবাদে জমি তৈরি থেকে মাড়াই পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে শ্রমিক লাগে। তাঁর হিসাবে, জমির ব্যবহার বদলে যাওয়ায় কৃষিশ্রমিকদের কাজ বছরে কয়েক মাস কমে গেছে।
কাজের খোঁজে দূরের জেলায়
নিজের এলাকায় কাজ না পেলে রমেশকে জীবিকার সন্ধানে দূরে যেতে হয়। কখনো রাজশাহী গিয়ে পানের বরজে কাজ করেন, কখনো পঞ্চগড়ে পাথর তোলার কাজে যান। এসব কাজের সুযোগ কখন আসবে, কত দিন চলবে, তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাঁর দৈনিক মজুরি প্রায় ৬০০ টাকা। তবে প্রতিদিন কাজ না মেলে না।
ফলের বাগান বেড়েছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষিশ্রমিকদের সারা বছরের কাজের নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। তাই আমের মৌসুম শেষ হলেই মারিয়ার সামনে নতুন করে শুরু হয় কাজের সন্ধান।মারিয়া ও রমেশের জীবনে কাজের নিশ্চয়তার চেয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি। আমের মৌসুমে কিছু টাকা জমলেও তা দিয়ে সারা বছরের সংসার চালানো সম্ভব হয় না। অন্যদিকে কৃষিকাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় বিকল্প কাজের সন্ধানে তাঁদের ছুটতে হচ্ছে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়।
নিজেদের আবাদি জমি নেই, স্থায়ী কর্মসংস্থানও নেই। অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করেই চলে এই দম্পতির সংসার। ফলের বাগান বেড়েছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষিশ্রমিকদের সারা বছরের কাজের নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। তাই আমের মৌসুম শেষ হলেই মারিয়ার সামনে নতুন করে শুরু হয় কাজের সন্ধান।
সোহরাই আর কারামের অপেক্ষা
এত অনিশ্চয়তার মধ্যে আনন্দ কোথায় খুঁজে পান? মারিয়া বলেন, ‘সৎভাবে পরিশ্রম করে উপার্জন করে স্বামী-সন্তানের মুখেত দুবেলা খাবার জোটলেই হামরা অনেক খুশি। এর বাইরে বছরের বিভিন্ন সময় হামাগের পালাপার্বণে সবাই মিলে আনন্দ করি। বিশেষ করে অগ্রহায়ণ মাসে সোহরাই আর ভাদ্র মাসে ডালপূজা বা কারামপূজার সময় অনেক আনন্দ হয়। এই দুইটা উৎসবের জন্য হামাগের সম্প্রদায়ের মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে।’ সোহরাই সাঁওতালদের ফসল কাটার উৎসব।
বড় মেয়ে গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। দুই মেয়েকেই লেখাপড়া করাতে চান মারিয়া। তিনি বলেন, ‘হামাগের বাপ-দাদা, মা-চাচিরা অন্যের জমিত কৃষিকাজ করে খাইছে। এখন হামরাও সেটাই করোছি। এসব কাজ করে তো উন্নতি হছে না। সামর্থ্য থাকলে মেয়ে দুটাক লেখাপড়া করাতে চাই। লেখাপড়া করাতে পারলে ওরা হয়তো চাকরি-বাকরি করে নিজের জীবনে উন্নতি করতে পারবে।’

Source - www.prothomalo.com ↗