Bangladesh · 2026-11-07 22:33:18

রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতে জেডি ভ্যান্স!

রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতে জেডি ভ্যান্স!
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও জননিরাপত্তার মতো ইস্যুতে নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরছেন তিনি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ভ্যান্স নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতিগুলো, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ ও অভিবাসন ইস্যুতে সরাসরি অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। পরিবর্তে নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে গুরুত্ব দেন।

গত সেপ্টেম্বরে রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনের পর দেওয়া ভ্যান্সের ছয়টি বক্তৃতা পর্যালোচনা করে রয়টার্স জানিয়েছে, তিনি প্রচারে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, সংযত পররাষ্ট্রনীতি এবং জননিরাপত্তার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তার উপদেষ্টাদের ধারণা, এসব ইস্যুতে ভ্যান্সের অবস্থান ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।

৪২ বছর বয়সী ভ্যান্স এখনো ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেননি। ট্রাম্পও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানাননি। তবে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীকে নিজের পাশে রাখার পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের বিতর্কিত নীতি ও নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে নিজেকে আলাদা করাই এখন তার বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান্স রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের কারণ তুলে ধরেন। তিনি ইরান যুদ্ধকে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, পররাষ্ট্রনীতি পুনর্মূল্যায়ন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার পরামর্শ দেন।

ইরান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে প্রকাশ্যে এটাই ছিল ভ্যান্সের সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থান। যুদ্ধ শুরুর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। পরে ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দেন এবং ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানান।

তবে হোয়াইট হাউস ও ভ্যান্সের যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ভাইস প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিরোধের ইঙ্গিত নয়। এমনকি হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসও পোস্টটি প্রকাশের আগে এ বিষয়ে অবগত ছিলেন।

ট্রাম্প অবশ্য ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াকে নির্বাচনে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে স্বীকার করেছেন। তবে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্তের পক্ষে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি তিনি। বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ভিন্ন কিছু করতাম না।’

ভ্যান্সের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন ট্রাম্পের বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রসহ কয়েকজন রক্ষণশীল নেতা। রিপাবলিকান কৌশলবিদ মাইকেল রিচির মতে, ভ্যান্সের মন্তব্য রক্ষণশীলদের মধ্যে ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা এবং ২০২৮ সালের নির্বাচনে দলের নীতিগত অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

রিচি মনে করেন, ট্রাম্পের কাছ থেকে নিজেকে আলাদা করাই ভ্যান্সের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে রিপাবলিকান দলের নীতিগত বিতর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করতে চাইছেন তিনি।

তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ভ্যান্সের রাজনৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যেসব অঙ্গরাজ্যে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন, সেখানেও দলটি পরাজিত হয়েছে। তার সমর্থিত কিছু নির্বাচনী কৌশল উল্টো দলের ক্ষতির কারণ হয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।

এর মধ্যে ওহাইওর গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞাপনটিতে নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। এ ধরনের প্রচার ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ নিয়ে দলের অন্য সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরাও নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন। টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে রিপাবলিকানরা যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে পারেনি। অন্যদিকে ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের মতে, প্রার্থীরা ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব দেননি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে ভ্যান্স ভোটারদের কাছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচিতে জালিয়াতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। এসব বক্তব্যের সঙ্গে অভিবাসননীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ও যুক্ত করেন তিনি। তবে ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতিগুলো এড়িয়ে যান।

উত্তর ক্যারোলাইনায় এক নির্বাচনী জনসভায় ভ্যান্স বলেন, তিনি এমন একটি দেশ চান, যেখানে তার সন্তানেরা পরিবার গড়ে তুলতে পারবে এবং দেশটি হবে সমৃদ্ধ, স্বাধীন ও স্বচ্ছল। নিজের জন্য যে ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করেন, দেশের অন্য নাগরিকদের জন্যও তেমন ভবিষ্যৎ চান বলে জানান তিনি।

ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ ইগর ভলস্কির মতে, ২০২৮ সালের নির্বাচনে ভ্যান্সের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ট্রাম্পের সমর্থকদের ধরে রেখেও সাধারণ নির্বাচনে বৃহত্তর ভোটারগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা। কারণ, ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনী প্রচারে ভ্যান্সকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে পারে।

সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর ভ্যান্সের সাম্প্রতিক অবস্থান শুধু রিপাবলিকানদের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান নয়; বরং ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে দলের নেতৃত্বে নিজের অবস্থান পোক্ত করার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

Source - www.bd24live.com ↗