Bangladesh · 2026-11-08 09:14:39

পর্যটন বাড়াতে গিয়ে দ্বীপের সর্বনাশ নয়

পর্যটন বাড়াতে গিয়ে দ্বীপের সর্বনাশ নয়
বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে পরিবেশ সুরক্ষায় অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। ইতিমধ্যে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দৃশ্যমান হলেও পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি হয়, এমন কিছু সিদ্ধান্তও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সেন্ট মার্টিনে পর্যটক প্রবেশের সংখ্যা ও সময়সীমা বৃদ্ধির যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ এই দ্বীপের প্রাণপ্রকৃতি ও সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যে ৫ নভেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সরকার সেন্ট মার্টিনে প্রতিদিনের পর্যটক যাতায়াতের সীমা ২ হাজার থেকে একলাফে ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ হাজার ৫০০ জনে উন্নীত করেছে এবং রাতযাপনের সুযোগ দুই মাস থেকে বাড়িয়ে সাড়ে চার মাস নির্ধারণ করেছে। যেখানে আগের সীমিতসংখ্যক পর্যটক সামলাতেই নানা চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি হতো, সেখানে বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা ছাড়াই গৃহীত এই সিদ্ধান্ত দ্বীপটির নাজুক পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।
প্রতিবেশগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই দ্বীপকে ১৯৯৯ সালে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। একসময় এখানে বহু প্রজাতির উদ্ভিদ ও সামুদ্রিক প্রাণীর নিরাপদ আবাস ছিল, যার মধ্যে রয়েছে বিরল প্রজাতির প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শৈবাল ও পরিযায়ী পাখি। কিন্তু বিগত কয়েক দশকের অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, যত্রতত্র হোটেল-রিসোর্ট গড়ে তোলা এবং পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত আনাগোনা ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে অনেক প্রজাতি ইতিমধ্যে বিলুপ্তির পথে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পর্যটকের সংখ্যা দৈনিক ২ হাজারে সীমিত রাখা এবং বছরের একটি দীর্ঘ সময় পর্যটন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর ইতিবাচক সুফলও প্রত্যক্ষ করা গেছে। ২০২৫ সালে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের ফলে সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। পর্যটকের আনাগোনা কমায় সৈকতে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা কমে গিয়েছিল। এই সাময়িক স্বস্তি প্রমাণ করে যে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত চাপ কমালে সেন্ট মার্টিনের সামুদ্রিক প্রতিবেশ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পায়। অন্যভাবে বলা যায়, বাড়তি পর্যটক সামগ্রিক সুফল হারিয়ে ফেলার শঙ্কা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা যেখানে বলছেন দ্বীপের সুপেয় পানি, বর্জ্য শোধন অবকাঠামো ও পরিবেশগত সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দিনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ জন পর্যটক যাতায়াতই যুক্তিযুক্ত, সেখানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা ছাড়াই পর্যটকের সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ জনে উন্নীত করা এবং সাড়ে চার মাস রাতযাপনের অনুমতি দেওয়া রীতিমতো আত্মঘাতী পদক্ষেপ।
দেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, দ্বীপে স্বাভাবিক সংখ্যক পর্যটকদের জন্য প্রযোজ্য বিধিনিষেধের আদৌ কোনো কার্যকর নজরদারি সম্ভব কি না? পর্যটকের সংখ্যা ও রাতযাপনের সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি দুর্বল তদারকির কারণে যদি নিয়মকানুন শিথিল হয়ে পড়ে, তবে দ্বীপের প্রতিবেশব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সাধিত হবে।
গত দেড় যুগের অপরিকল্পিত উন্নয়ন সেন্ট মার্টিনের প্রতিবেশব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবেশবিদদের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ব্যতিরেকে কেবল ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও রিসোর্ট মালিকদের বাণিজ্যিক স্বার্থে সীমা বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত দ্বীপটির পরিবেশকে আরও বিপন্ন করবে। এতে প্রকারান্তরে দীর্ঘ মেয়াদে পর্যটনশিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে সরকারের উচিত গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আগের সীমা বহাল রাখা এবং স্থানীয় নিয়মকানুনের ওপর নজরদারি জোরদার করা। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার সুরক্ষায় বাণিজ্যিক মানসিকতার ঊর্ধ্বে উঠে বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করা দরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনব্যবস্থা বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক।

Source - www.prothomalo.com ↗