Bangladesh · 2026-11-08 18:43:24

ফ্ল্যাট কেনার আগে আইনের যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

ফ্ল্যাট কেনার আগে আইনের যে বিষয়গুলো জানা জরুরি
দীর্ঘদিনের সঞ্চয় দিয়ে ঢাকার উপকণ্ঠে একটি ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রবীণ মজুমদার। বিক্রেতার দেওয়া কাগজপত্র দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, সবকিছু ঠিকঠাকই আছে। চুক্তি ও রেজিস্ট্রেশনের পরও তিনি স্বস্তিতে ছিলেন; কিন্তু কয়েক মাস পর জানতে পারেন, ফ্ল্যাটের জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। যে সম্পত্তিকে নিজের স্থায়ী ঠিকানা ভেবেছিলেন, সেটিই তখন তাঁর জন্য হয়ে ওঠে আইনি অনিশ্চয়তার কারণ।
অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী প্রবীণ মজুমদারের মতো এমন ঘটনা যে কারও ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কেনার সময় শুধু বাড়ির নকশা, অবস্থান বা দাম দেখলেই হয় না; ফ্ল্যাটটির মালিকানা, দলিলপত্র, অনুমোদন, বন্ধক, রেজিস্ট্রেশন এবং চুক্তির শর্ত—সবকিছু ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।
কাগজপত্র যাচাইয়ে সতর্কতা
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলামের মতে, ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাকে কোনোভাবেই তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। বিক্রেতা ব্যক্তি হোন কিংবা আবাসন প্রতিষ্ঠান—তাঁর বা তাঁদের মালিকানার বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
ফ্ল্যাট যে জমির ওপর নির্মিত, সেই জমির মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্রও যাচাই করতে হবে। ভূমি অফিসে তল্লাশির মাধ্যমে জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত তথ্য জানা যেতে পারে। পাশাপাশি ফ্ল্যাটের জমির দলিল সঠিক কি না, বিক্রেতা বা আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা আছে কি না, এবং সম্পত্তিটি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে কি না, সেসব তথ্যও জানতে হবে। শুধু বিক্রেতার দেওয়া কাগজপত্র দেখেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে সেগুলো একজন আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়া নিরাপদ। কাগজে থাকা তথ্যের সঙ্গে সরকারি রেকর্ডের মিল আছে কি না, সেটিও দেখা প্রয়োজন।
আবাসন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন
কোনো আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফ্ল্যাট কিনলে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদন আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হতে হবে। রাজউক-অধিভুক্ত এলাকায় হলে অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তবে নির্মিত ভবনের মিল রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ করা হলে পরবর্তী সময়ে ফ্ল্যাটের মালিককে নানা ধরনের জটিলতায় পড়তে হতে পারে। এ ছাড়া যে প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্ল্যাট কিনছেন, তাদের পূর্ববর্তী প্রকল্প, সুনাম এবং গ্রাহকদের সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নের ইতিহাস সম্পর্কেও খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।
চুক্তিতে কী থাকবে
ফ্ল্যাট কেনার সময় চুক্তিপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ফ্ল্যাটের দাম ও আয়তন উল্লেখ করলেই চুক্তি সম্পূর্ণ হয় না। ফ্ল্যাটের অবস্থান, আয়তন, নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণ, অনুমোদিত নকশা, হস্তান্তরের সময়সীমা, পার্কিং, ইউটিলিটি সুবিধা এবং অন্যান্য শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত। ক্রেতা যদি কোনো উন্নত মানের সরঞ্জাম বা অতিরিক্ত সুবিধা চান, সেটিও দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে লিখিতভাবে চুক্তিতে উল্লেখ করা ভালো।
আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ফ্ল্যাট কেনার উদ্যোগ নেওয়ার সময়ই আইনি সহায়তা নিয়ে চুক্তি করা ভালো। চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার বিষয়ে ক্রেতাকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, একবার চুক্তি হয়ে গেলে, পরে সেখান থেকে বের হওয়া অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে।
রেজিস্ট্রেশনের আগে যা দেখবেন
রেজিস্ট্রেশনের আগে ফ্ল্যাটের সব তথ্য আরেকবার যাচাই করে নেওয়া উচিত। বিক্রেতার পরিচয়, মালিকানার কাগজপত্র, ফ্ল্যাটের আয়তন, অবস্থান, সংশ্লিষ্ট জমির দাগ ও খতিয়ান এবং অন্যান্য তথ্য দলিলে সঠিকভাবে উল্লেখ আছে কি না, তা মিলিয়ে দেখতে হবে। ফ্ল্যাটটি আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি করা হয়েছে কি না, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক আছে কি না, কিংবা কোনো মামলা বা বিরোধ রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও যাচাই করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ক্রেতা চাইলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র একজন আইনজীবীকে দিয়ে পরীক্ষা করাতে পারেন। এতে দলিলের কোনো অসংগতি বা মালিকানার জটিলতা আগে থেকেই শনাক্ত করার সুযোগ থাকে।
ব্যাংক কী দেখে
হোম লোন নিয়ে ফ্ল্যাট কিনতে গেলে সম্পত্তির কাগজপত্র যাচাইয়ের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, ঋণের বিপরীতে যে ফ্ল্যাট বন্ধক রাখা হবে, সেটির মালিকানা ও আইনগত অবস্থান সম্পর্কে ব্যাংককে নিশ্চিত হতে হয়।
এ বিষয়ে প্রাইম ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নাজিম এ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কোনো সম্পত্তির বিপরীতে ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংক জমি বা ফ্ল্যাটের মালিকানার ধারাবাহিকতা, দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের হালনাগাদ তথ্য এবং সম্পত্তির ওপর কোনো দায় বা মামলা রয়েছে কি না, তা যাচাই করে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির আইনি বৈধতা ও বাজারমূল্য নির্ধারণে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া হয়। তবে ক্রেতাদেরও শুধু ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
এম নাজিম এ চৌধুরী বলেন, সম্পত্তির মূল দলিল, বিক্রেতার মালিকানা, দখল, অনুমোদিত নকশা এবং কোনো বিরোধ বা দায় রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে ব্যাংক যথাযথ যাচাই-বাছাই, স্বচ্ছ ঋণপ্রক্রিয়া ও আইনি পরামর্শের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্যাংকের এই যাচাই প্রক্রিয়া ক্রেতার জন্যও একটি বাড়তি সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে ব্যাংকঋণ অনুমোদন করেছে বলেই সম্পত্তির সব ধরনের আইনি ঝুঁকি নেই—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। নিজের স্বার্থে ক্রেতাকেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা উচিত।
প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো বিক্রেতার কথায় অতিরিক্ত বিশ্বাস করে দ্রুত বুকিং বা বায়না করে ফেলা। আকর্ষণীয় দাম, সীমিত সময়ের অফার কিংবা দ্রুত বুকিংয়ের চাপ থাকলেও কাগজপত্র যাচাই না করে অর্থ দেওয়া উচিত নয়। প্রথমে সম্পত্তির মালিকানা ও দলিলপত্র যাচাই করতে হবে। এরপর প্রকল্পের অনুমোদন, ফ্ল্যাটের নকশা, নির্মাণের শর্ত এবং চুক্তিপত্র পরীক্ষা করে দেখতে হবে। সবশেষে রেজিস্ট্রেশনের আগে আবারও তথ্যগুলো মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
চুক্তি অনুযায়ী ফ্ল্যাট না পেলে
চুক্তি অনুযায়ী ফ্ল্যাট না পেলে আইন ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ফ্ল্যাট কেনাবেচা ও আবাসন ব্যবসাসংক্রান্ত বিষয়ে ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০’-এর বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। চুক্তিতে সালিসের ব্যবস্থা থাকলে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রযোজ্য আইনের অধীন সালিসের পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে উপযুক্ত আদালতেরও আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

Source - www.prothomalo.com ↗